প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

আদর করে ডাকে সবাই `ভালপো‘। চিলির ভালপারাইসো বন্দর। এ বন্দর জাহাজ নাবিকদের খুব প্রিয়।অতুলনীয় সুন্দর, কাব্যিক সুন্দর, জীবনের মতো সুন্দর এ বন্দর। সাধারনত সাউথ আমেরিকার এ বন্দরে খুব একটা আসা হয়না জাহাজ নাবিকের। তবুও অকস্মাৎ সিডিউল হয়ে গেলে তরুণ নাবিকদের হৈ হৈ রৈ রৈ অবস্থা। কে কার আগে যাবে বাইরে তার প্রতিযোগিতা। আগে থেকেই ঠিকঠাক দলবেঁধে সবাই যাবে, একদল ফিরলে আরেকদল।

আমার দু‘বার যাওয়া হয়েছে এ বন্দরে। রিফার শীপ নিয়ে চিলি থেকে গোল্ডেন কিউই আর গ্রেপস লোড করতে। জাহাজের নামটা আমার খুব ভালো লাগতো- ক্রাউন এমারাল্ড। ক্রাউন সিরিজের সাতটি জাহাজ ছিলো এনওয়াইকে লরিতজেন কুলের। লরিতজেন ইউরোপের সবচেয়ে নামডাকওয়ালা রিফার ক্যারিয়ার। দুনিয়ার বড় বড় চার্টারার ডোল, ডেল মন্টে, চিকিতা ওদের পিছু পিছু ঘুরতো।

গোল্ডেন কিউইর বিশেষত্ব হলো এটা পুরো সোনালী রঙের কিউই আর খেতে আমের মতো। কিউইর সবচেয়ে অভিজাত বংশীয়। হয় শুধু নিউজিল্যান্ড আর চিলিতে। চিলির আন্দিজের ঢালে খুব ভালো গোল্ডেন কিউই হয়। এই ভালপো আসার কারনও এই গোল্ডেন কিউই।

জাহাজ ভালপারাইসো আসা মানেই নো কাজকর্ম। সবাই সিডিউল মিলাতে ব্যস্ত। ভালপোর রমনীরা একটু বেশীই সুন্দরী। পানশালায় নাবিকদের ভীড়। সুন্দরীদের সান্নিধ্যে তরুণদের দল যেনো আত্মহারা। ফিলিপিনো ক্রুদের সামলানো মুশকিল। তারা একটুতেই প্রেমে পড়ে যায়। হয়তো কোন এক সুন্দরী একটু হেয়ালী হাসি দিলো, তো কুপোকাত। টুপটাপ প্রেমে পড়তে ফিলিপিনোদের জুড়ি নেই।

এমনও হয়ে যায়, জাহাজ ছেড়ে দেবার সময় পেরিয়ে যায়। ফিলিপিনো ফিটার ফারনান্দেজ ফিরে আসে না, তাকে ধরে নিয়ে আসতে হয়। শুনলাম, ওর মন ধার দিয়েছে ভালপো রমনীর কাছে। ফিরে আসতেই ওর চোখে জল। মন বলছে, এ এক নির্ভেজাল প্রেমকাহিনী। খাদ নেই, সন্দেহ নেই, স্বার্থ নেই। আমি ওর দিকে তাকাই, ফিলিপিনো বন্ধুর মুখখানা বড় নিষ্পাপ। আমি ওকে মনে করিয়ে দেই, জাহাজ ছাড়বে। ভুলে যাও এসব, পৃথিবী চলুক তার আপন কক্ষপথে।

আমার কাছে ভালপো প্রিয় অন্য একটি কারনে। বলতে গেলে চিলিই আমার প্রিয়। ছোটবেলায় চিলি দেশটা মানচিত্র ঘেটে বের করতাম, তারপর মনে হতো আসলেই মরিচের মতো দেখতে। লম্বা একটি দেশ, ইকুয়েডর থেকে শুরু হয়ে পৃথিবীর এক্কেরে দক্ষিণে চলে গেছে। পরে যখন একটু আধটু গল্প কবিতা পড়তে শুরু করলাম তখন আরো ভালো লাগে চিলি। পাবলো নেরুদার কবিতা কোট করতে শুরু করি একসময়। নেরুদা আমার অন্যতম প্রিয় এক কবি, দ্রোহ আর প্রেমের কবি।

নেরুদার জীবনী পড়ে আমি আরো মুগ্ধ হয়ে যাই। এক জীবনে কতোকিছুই না করেছেন এ কবি। আন্দিজে বসে বসে প্রেমের কবিতা লিখে পাল্টে দিয়েছেন মানুষের ভাবনার জগত। ভালপোতে পালিয়ে এসে বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন। পালিয়ে চলে গেছেন আর্জেন্টিনায়। একসময় সমাজবাদী আলেন্দোল প্রিয় মানুষ সিনেটর পাবলো নেরুদা। কখনও মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, আবার কখনও ফ্রান্স, স্পেনে রাজদূত হয়ে ঘুরে বেড়াতেন আর কবিতা লিখতেন এ চিলিয়ান। কবির সেই ভালপারাইসো গিয়ে আমি ঘুরতাম, হেঁটে বেড়াতাম রাস্তায়, অলিতে গলিতে। কতো রঙ, কতো ঢং, কতো আনন্দের এ শহর।

পৃথিবীর সবচেয়ে রঙীন শহর এই ভালপো। গরীবের ঘরেও সুন্দর পরিপাটি রঙ করা দেয়াল। চিলির ভালপোর এই রঙে রঙীন চকমকা রূপটি ইউনেস্কোরও অনেক পছন্দের। তাই এটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে লিস্টেড পৃথিবীর সবচেয়ে রঙে রঙীন শহর হিসেবে। শুধু রঙ দিয়ে রঙীন ঘরবাড়ী কতোটা মনকে নাচায় এখানে না এলে বুঝতাম না। গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র যে একটা দেশের ঐতিহ্য হতে পারে সেটা জানা হলো ভালপো গিয়ে। অসাধারণ কিছু দেয়ালচিত্র দেখেছি চিলিতে।  আসলে পুরো দক্ষিণ আমেরিকায়ই দেয়ালচিত্র খুব জনপ্রিয়। ভালোবাসা, প্রতিবাদ, ঐতিহ্য সব ফুটিয়ে তুলবে এরা গ্রাফিতিতে।

আটলান্টিক আর পানামা খাল পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ ঠেলে নিচের দিকে এসে এই চিলিয়ান বিউটি। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সবচেয়ে সুন্দর বন্দর ভালপো। পৃথিবীবিখ্যাত ওয়াইন দু‘চার বোতল না কিনলে নাবিকের মন ভরে না। আমার ইউক্রেনিয়ান সহকর্মীরা পারলে জাহাজ ভরে ফেলে চিলিয়ান ওয়াইন দিয়ে। আমিও দু‘বোতল কিনে দেশে নিয়ে এসেছি, রেখে দিয়েছি ভালপোর স্মৃতি।

অনেকদিন স্মৃতি জাগরুক হয়ে ছিলো ভালপো, আমার হাঁটাহাঁটিও চলছে চলবে নিরন্তর, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে আর রহমতে। জীবননান্দ হাঁটতেন  বরিশাল আর কলকাতার অলিগলিতে। তাঁর মতো নেরুদা হেঁটেছেন চিলির ভালপো, টিমুকো, সানতিয়াগো আর পৃথিবীর বুকে।

আজ পারস্য সাগরে বসে বসে বালুময় মরুভূমি দেখে ভাবছিলাম কতো অদ্ভূত এ পৃথিবী। কোথাও সবুজ সমতল, কোথাও পাহাড় আর আগ্নেয়গিরি, কোথাও রঙীন শহরের প্রাণোচ্ছল আনন্দ আবার কোথাও শুকনো মরুভূমি। এসব ভাবতেই ভালপোর কথা মনে হলো।

পৃথিবীর সবকিছুরই আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। সে হোক বরফের পাহাড় কিংবা বালুর মরুভূমি। মনটাকে শুধু একটু এডজাস্ট করে নিতে হয়। একটু ফাইন টিউনিং করে নিতে হয়। তাহলে কোন কবিতাই ছন্দহীন মনে হয় না, কোন গানই বেসুরো লাগে না।

পরে একদিন ফিলিপিনো সহকর্মীরে বুঝালাম, টুপটাপ প্রেমে পড়লে দোষের কিছু না, চিলির পাহাড়ে বসে প্রশান্ত মহাসাগর দেখলে,  পবিত্র শীতল সমুদ্র বাতাসে যে কেউ প্রেমে পড়তেই পারে। তবে তুমি এবারের মতো বাড়ী ফিরে যাও, ভালপোর ভালোবাসা জেগে থাকুক আজীবন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]