প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

মনের রেডিও না কী একটা গান শুনে আজ মনের ক্যালকুলেটর নিয়েই বসলাম। হিসেব নিকেশ করে বের করলাম পৃথিবীটাকে ২০ বারেরও অধিক প্রদক্ষিণ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। মহাদেশের হিসেবে আ্যন্টার্কটিকা বাদে সবগুলি মহাদেশের  প্রায় ৮০ এরও অধিক দেশে পা পড়েছে। দেশের নাম লেখাতে লেটার মার্ক অলরেডি পেয়ে গেছি।  মহাসাগরের হিসেবে যাইনি শুধু আর্কটিকে। শুধু জাপানেরই ৫০ অধিক বন্দরে ঘুরেফিরে আসতে হয়েছে। ইউরোপে পোর্ট আছে অথচ যাওয়া হয়নি এমন দেশ নেই।

মানবজাতি ভাল খারাপ, দুষ্ট মিষ্টের এক চমৎকার মিশেল। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম বর্ণ, গোত্রের মানুষের সঙ্গে মেশার দারুণ এক অভিজ্ঞতা হয় চলতে চলতে। ইউরোপিয়ানদের মধ্যে উত্তরের মানুষেরা বেশি কর্মক্ষম আর শিষ্টাচরপ্রিয়। দক্ষিণের মানুষ আমোদপ্রিয়। আমেরিকানরা আবার যোদ্ধা জাতি। যদিও উত্তরের মানুষ কিছুটা শান্তিপ্রিয়। যত উত্তর তত শান্তি টাইপ। তবে আমেরিকার আর্ন্তজাতিক ভূমিকা নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলিনা। কারণ বিশ্ব রাজনীতির ওই মসনদে পুতিনের রাশিয়া, কিংবা ভারত/ বাংলাদেশকে একটু কল্পনা করুন। মানবজাতির বারোটা বেজে যেতো। আমেরিকানরা বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে যথেষ্টই সচেতন।

অনেকেই প্রশ্ন করেন কোন জায়গাটা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে। আমি বলি পৃথিবীটাই সুন্দর। প্রতিটি জায়গার রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য, আলাদা সত্ত্বা আমারতো জিব্রাল্টার, আলেকজান্দ্রিয়া, ইস্তানবুল, প্যারিস, রোম, লন্ডন, সিডনী,  মেলবোর্ণ, টোকিও, সাও পাওলো, কেপ টাউন সবই ভাল লাগে। জাহাজে জয়েন করতে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে বন্দরে ছুটে যেতে হয়। ঢাকা থেকে বিদায় দিতে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত চলে আসে আমার নান্না মুন্নারা।

তবে আমি একটি বিষয় খুব খেয়াল করেছি, যখনই আমি শীপে জয়েন করতে রওয়ানা হই বৃষ্টি হয় সাথী। বৃষ্টি আর মেঘমালার খেলা দেখতে দেখতেই মন কিছুটা খারাপ নিয়েই আকাশে উড়াল দেই আমি। একবার কি হলো যেতে হবে জিব্রাল্টার, আগে কয়েকবার এ পোর্টের বর্হি:নোঙরে বাংকার করেছি, কখনও পোর্টে যাওয়া হয়নি। দূর থেকে জিব্রাল্টার দেখতে খুব সুন্দর আলোকময় মনে হতো, মন চাইতো এমন সুন্দর সাজানো গোছানো ইতিহাসের জাবালুত তারেককে একটু ছুঁয়ে দেখি।

জিব্রাল্টার যাওয়ার কথা শুনে মনে বেশ একটা এডেভাঞ্চার এডভেঞ্চার ভাব চলে আসলো। যাওয়ার রুট দেখলাম আরও থ্রিলিং। ঢাকা থেকে হিথ্রো, এরপর টিকেটে লেখা গ্যাটউইক থেকে জিব্রাল্টার।  টিকেট দেখে কিছুটা তব্দা খেয়ে আছি, হিথ্রো থেকে গ্যাটউইক কই গেল?

ফোন দিলাম এজেন্ট বেবীকে, এই বেবী কিন্তু শিশু বেবী না, বেশ ভাবের বেবী, ভাব নিয়েই বললো সুজল ভাই কি যে চিন্তা করেন, এতোদিনের সী এক্সপেরিয়েন্স আপনার, বাসে উঠে চলে যাবেন গ্যাটউইক, আর আপনার লাইবেরিয়ান সিডিসি আছে আমি দেখেছি, আপনার ভিসাও লাগবে না। এই আপুনির কনফিডেন্স আর এক্সপেরিয়েন্সের কথা শুনে একটা গা ঝাড়া দিলাম। প্রেস্টিজের ইস্যু। তাও সাহস যোগাতে বৌ বাচ্চা সঙ্গে নিয়েই এয়ারপোর্ট গেলাম, এবার রওয়ানা হওয়ার সময়ে টেনশনে মন খারাপ হওয়ার সময় পেলো না।

বৃষ্টি সেদিনও হলো, যথারীতি লাগেজ চেকড ইন করে ইমিগ্রেশন পার হলাম, উল্টা ঘুরে হাত নাড়বো, হাত উঠাতে পারিনি এর আগেই আমার নান্না মুন্না দে দৌড়। আমি ভাবলাম ইমিগ্রেশন পুলিশ হয়তো আটকাবে ওদেরকে, কিন্তু একটা ভালোবাসার হাসি দিয়ে ওদের আসতে দিলো আমার কাছে। আমি বেশ কৃতজ্ঞচিত্তে তাকে মুচকি হাসি দিলাম আর বাবুদের বুকে নিলাম। আদর করে আবার ফিরিয়ে দিয়ে তবেই আবার যাত্রা হলো শুরু।

তখন ঢাকায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ নিয়মিত আসা যাওয়া করতো, এরপরে কি এক কারণে সব্জী তরিতরকারির উপর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে রাজকীয় বিমান চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। যা হোক ব্রিটিশ আতিথেয়তায় রাজকীয় একটা ঘুম দিয়ে পৌঁছে গেলাম হিথ্রো। হিথ্রো পৌছতে সকাল হয়ে গেলো।

লন্ডনের এ বিমানবন্দরের একটা আজব বৈশিষ্ট্য আছে, বিমান যে সময়েই ল্যান্ড করুক গভীর রাতে এখান থেকে কোন বিমান উড়াল দেয় না সকাল সাতটা পর্যন্ত। এ নিয়েও আছে মজার অভিজ্ঞতা, সে গল্প অন্য কোনদিন। এবার ইমিগ্রেশন পার হলাম। আমি মুক্ত লন্ডনে, তাও আবার ভিসা ছাড়া লন্ডনে। সিলেটি এক ভাইয়ের কাছে জিগ্যেস করলাম গ্যাটউইক যাবো কেমনে? সে অতিশয় কিউরিসিটি নিয়েই বললো যাবা কিতা করতে, আমি বললাম ফ্লাইট টু জিব্রাল্টার।

আমারে আরো বড় জাতের পাগল মনে করে এয়ারপোর্ট শাটল বাস দেখিয়ে দিলো। উঠতে যাবো, এমন সময় বাসের পাইলট, পোশাক আশাকে সেই কেতাদুরস্ত ভাব তার, বললো টিকেট কই? আমি টিকেট দিতেই মনোযোগ দিয়ে দেখে বললো ২০ পাউন্ড লাগবে, এয়ারটিকেটে বাস টিকেট করা নাই। পেটে কামড় দিলো, হঠাৎ মনে পড়লো পয়সাপাতি কিচ্ছু তো আনিনি। মানিব্যাগ চেক করে পেলাম এইচএসবিসির কার্ড, ভাবলাম বেঁচে গেছি এ যাত্রা। এটিএমে গেলে যতোবার কার্ড ঢুকাই পিপপিপ বিপবিপ দিয়ে কার্ড ফেরত। রাগ হয়ে কি একটা চাপ দিছি তো কার্ডই আটকে গেছে। গভীর চিন্তায় পড়ে গেছি ততক্ষণে।

কি করবো, মনে মনে সিলেটি ভাই ব্রাদার খুঁজতেছি, পকেট হাতায়ে যা পেলাম তা হলো হাজার তিনেক বাংলা টাকা। বিপদে পড়লে আল্লাহ সাহায্য করেন এই ভেবে টাকা নিয়ে মানি এক্সচেঞ্জে গিয়ে ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলাম বাংলাদেশী টাকা চেঞ্জ হবে কিনা।

সুইট একটা হাসি দিয়ে ইয়েস বলতেই আমি প্রাণ ফিরে পেলাম, টাকা থেকে পাউন্ড বানায়ে কার্ড হারানোর দুঃখ নিয়ে বাসে উঠলাম। মনের দুঃখ আরো বাড়লো যখন দেখলাম গ্যাটউইক  থেকে জিব্রাল্টার বিমানে কোন ফ্রি খানাপিনা নাই। পাশের লোক পিজা খায় আর আমি বাঙ্গালী দেখি।
কিছুক্ষণ পরে সম্বিত ফিরে পাইলে মনে পড়ল পকেটে তো ৭ পাউন্ড আছে, লে হালুয়া। পিজা আর ড্রিংকস নিয়ে আমিও মিস্টার বিনের মতো তারে দেখিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। দুপুরের দিকে যখন পাইলট ল্যান্ডিং প্রিপারেশন নিচ্ছেন নিচে তাকিয়ে আমি ত থ, রানওয়ে কই, এতো পাথুরে পাহাড়, কেমনে কী!! একটু পরে নিচের দিকে নামতেই সমুদ্রের কোল ঘেষে রানওয়ের দেখা পেলাম।

একটু পরে যা দেখলাম তা বিস্ময়জাগানিয়া, রানওয়ে ধরে ল্যান্ডিং করে এগিয়ে চলছি আর দু‘পাশে ট্রাফিক সিগনালে অসংখ্য গাড়ী অপেক্ষায়।এয়ারপোর্ট রানওয়ের উপর দিয়ে চলে গেছে শহরের অন্যতম প্রধান সড়ক, বিমান নামার সময় সিগনাল দিয়ে আটকে দেয়া হয় গাড়ী, হয়ে যায় রানওয়ে। ভাবছি এমন এয়ারপোর্ট ঢাকায় হলে রিকশার লাইন লেগে যেতো এয়ারপোর্টের সিগনালে।

জিব্রাল্টার ছোট একটি কলোনী, ব্রিটিশরাজ এখনও ধরে রেখেছে ইউরোপ আর আফ্রিকার দুয়ার হিসেবে। ছোট এই জায়গাটি সমুদ্র চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ক্যাবল কার করে পাহাড়ে উঠে আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগর দেখার আনন্দ অন্যরকম। তবে ছ’দিন কুইনস হোটেলে থেকে খাওয়ার একটা কষ্টতো ছিলোই। অনেক পুরোনো মসজিদ মনে করিয়ে দেয় মুসলিমদের ইউরোপ জয়ের ইতিহাস।

এখন এটি পুরোপুরিই ইউরোপিয়ান সিটি। আফ্রিকার দিকে তাকালে দেখা যায় মরোক্কো, আলো কিছুটা কম, ইউরোপ আধুনিকতার আলো নিয়ে পার্থক্যটা বুঝিয়ে দেয়।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]