প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

জিব্রাল্টারের বিমানবন্দরে পৌছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট থেকে যে পিচ্চি বিমানে করে এসেছি সেটা ছিলো বাজেট এয়ারওয়েজ। মানে যা-ই খাবো নগদ টাকা দিয়ে। পকেট তো ফাঁকা, হিথ্রো থেকে গ্যাটউইক বাসে এসেছি পকেটে থাকা বাংলা তিনহাজার টাকা বদলে যে পাউন্ড স্টার্লিং পেয়েছি তা দিয়ে। ভিসার প্রয়োজন পড়েনি যেহেতু লাইবেরিয়ার সিডিসি ছিলো। বুঝলাম না লাইবেরিয়ার সিডিসি থাকায় লন্ডনে ভিসার প্রয়োজন পড়েনা তাহলে বাংলাদেশী সিডিসির দোষটা কি? আমরা কি আফ্রিকার এ দেশ থেকেও পিছিয়ে!! না কী  সবই কপাল।

এয়ারপোর্টে নামতেই বুঝলাম এখানে তেমন নিয়মের বাড়াবাড়ি নেই, যা চেক করার অলরেডি লন্ডনেই সেরে দিয়েছে। ইমিগ্রেশন পেরোতেই দেখি প্লাকার্ডে সুন্দর হাতের লেখায় আমার নাম আর জাহাজের নাম লেখা। জাহাজের নাম সাউদার্ন হারভেস্ট। আমি কাছে গিয়ে বললাম গুড আফটারনুন, আমিই তোমার খুঁজতে থাকা মানুষ। সে হাসলো, বললো লাগেজ নিয়ে নাও, জার্নি কেমন ছিলো? আমি হেসে বললাম ঠিকঠাক যেমন তোমরা সাজিয়েছো

লাগেজ নিয়ে বেরুতেই সে তার গাড়ীতে লাগেজ উঠিয়ে নিয়ে বললো তাহলে হোটেলে চলো। তোমার জাহাজ সম্ভবত দু‘চারদিন ডিলে হবে।
স্পেনে কি একটা জটিলতায় শীপ ডিটেইনড। আমি তো পুরা হতবাক, কয়কি এগুলি। এতোদূর থেকে আসলাম জাহাজে জয়েন করতে আর সেই জাহাজ কিনা ডিটেইনড। কারবারটা দেখছো!!

মনে পড়লো ঢাকা এয়ারপোর্টের সুন্দরী ইমিগ্রশন পুলিশের আগ্রহভরা জিজ্ঞাসা, জিব্রাল্টারটা কোথায়? আমি বলেছিলাম ইউরোপের টিপে, সে হেসেছিলো খুব। এখন আমি ফাপরে, জিব্রাল্টার এসে শুনি জাহাজ ডিটেইনড, আসবে কবে তারও নাই ঠিক। তারমধ্যে পকেটে নাই টাকাপয়সা।

এমন পরিস্থিতি আমার পুরো সমুদ্রযাত্রায় কখনও হয়নি। যা হোক হোটেলে পৌছে এজেন্টকে বললাম আমার টাকা লাগবে কিছু, যদি কোম্পানিকে বলে অ্যারেঞ্জ করতে পারো ভালো হয়।  সে জিগ্যেস করে কি জন্য টাকা? — –ফোন করমু, যদি কিছু পছন্দ হয় কিনমু, খাওয়া দাওয়া করমু। ফোন হোটেলের থেকেই করো, নেটও এখানে ফ্রি, খাওয়া দাওয়া যা লাগবে অর্ডার করে খাও, কোন বিল দেয়ার দরকার নেই,
বলেই হাসিমুখে গুড বাই বলে চলে গেলো। বললো নিচে রিসেপশনে প্রতিদিন সকালে আপডেট পাবে জাহাজ কবে আসবে। গুড লাক, হ্যাপি স্টে ইন জিব্রাল্টার।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে যা বুঝার বুঝে নিলাম। এরপরে হোটেল রুমে গিয়ে ফোন ও সারলাম। পরেরদিন ইন্ডিয়া থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার আসলো, সেও আমার মতো আরেকটি শীপে জয়েন করবে। এজেন্ট বললো মে বি ইউর শীপ ডিলেইড ফর মোর কাপল অফ ডেইজ, এন্ড হাউ মাচ মানি ইউ নিড? আমি ২০০ বলতেই বললো, বিকেলে সে দিয়ে যাবে, পরে শীপ একাউন্ট থেকে কেটে নিবে।

এরপর আমার আর ইলেকির জিব্রাল্টার দর্শন শুরু হলো। আমরা পাহাড়ে উঠি, আমরা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটি, টুরিস্টদের দেখি। ক্যাবল কারে উঠে দুইপাশের সমুদ্র দেখি, একপাশে আটলান্টিক আরেকপাশে মেডিটেরিনিয়ান। ভুমধ্যসাগরের মিষ্টি হাওয়া আরর আটলান্টিকের পাগলা হাওয়া দুইয়ে মিলে একাকার জিব্রাল্টারের এই পাহাড়চূড়ায়। অদ্ভুত ভালোলাগা দুইটি সাগরের মাঝখানে দাড়িয়ে।

যদিও ছোট্ট একটি জায়গা, অনেক ইতিহাস এ জায়গাটার। একটা বহু পুরোনো মসজিদ আছে পাহাড়ের অপর পাশে। একদিন হেঁটে হেঁটে সে মসজিদে গিয়ে নামাজও পড়লাম, মুসলিমও আছে, তবে সংখ্যায় খুব বেশী নয়। ইসলামের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ এ উপদ্বীপ। একদিকে তুর্কির ইস্তানবুল দিয়ে আর এদিকটায় জিব্রাল্টার দিয়ে ইসলাম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিলো। রাজত্বও করেছিলো বেশ কিছুদিন। গ্রানাডার মানে স্পেনে মুসলিম রাজত্ব সে এক বহুল আলোচিত উপ্যাখান। জিব্রাল্টার ছিলো যার দরজা।

একটা পাহাড়ের দু’পাশে হোটেল মোটেল আর কিছু আবাসিক মিলেই জিব্রাল্টার। শপিং স্ট্রিটগুলি খুব গোছানো, সবকিছু পাওয়া যায়,
কিন্তু দাম খুব চড়া। ব্রিটিশ পাউন্ড চলে এখানে। স্পেনের টিপে এই ছোট্ট অংশটুকু ব্রিটিশ শাসিত। এমন আরো একটি পোর্টে গিয়েছিলাম এর আগে। মরোক্কোর উত্তরে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে স্পেনের  মেলেইলা। দ্বীপরাষ্ট্রের মতো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মরোক্কো থেকে আইসোলেটেড।

তবে জিব্রাল্টারে এমন কিছুই নেই। ওরা আধুনিকতার আলো ভাগাভাগি করে নেয় বন্ধুর মতো। মজার হলো জিব্রাল্টারের দুপাশেই সমুদ্র, এটা এক ছোট্ট উপদ্বীপ, আর ওপারে মরোক্কো। একপাশে ইউরোপের আধুনিকতার আলো, অন্যপাশে আফ্রিকার ঐতিহ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে জিব্রাল্টার হয়ে অনেক ইউরোপিয়ান জীবন বাঁচাতে মাতৃভূমি ছেড়েছে। জিব্রাল্টার হয়ে কাসাব্লাঙ্কা। হাজার হাজার অসহায় মানুষ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ ছেড়ে কাসাব্লাঙ্কায় গিয়ে জাহাজে চড়েছে। জাহাজেই সেসময় পাড়ি দিয়েছে আটলান্টিক। কেউ গিয়েছে আর্জেন্টিনা, কেউ গিয়েছে আমেরিকা। এভাবেই জিব্রাল্টার তখন মানুষের মাইগ্রেশন ব্রীজ হয়ে গেছিলো।

এখন অবশ্য স্প্যানিশ টুরিস্টই এখানে বেশী, ভাষাও স্প্যানিশটাই বেশী চলে। তবে আমাদের হোটেল পুরোপুরি ইংলিশ। হোটেলে বেশীরভাগ বোর্ডারই ইংলিশ আমরা দুই মক্কেল ছাড়া।  হোটেলের নাম কুইনস হোটেল, স্টার যে কয়ডা তা অবশ্য বোঝা গেলোনা। আমাদের প্রতিদিনের খাবার বিফস্টেক, মিক্সড ভেজিটেবল আর স্যুপ, সঙ্গে ব্রেড। ব্রেকফাস্ট করে বেরুই ডিনারের সময় ফিরি, সারাদিন টইটই করে ঘুড়ে বেড়াই।
জাহাজ আসতে দেরী হওয়ায় এর থেকে উত্তম আর কি হতে পারে। এর আগে এতোদিন আর হোটেলে থাকা হয়নি জাহাজে জয়েন করতে। তবে আসার আগেই দেখেছি বোনাস দিয়েছে ২০ দিনের প্রি জয়েনিং বোনাস।

এমনি করে পাঁচদিন পরে খবর এলো জাহাজ বন্দর ছেড়েছে, কাল সকালেই বোর্ডিং, এবং সাইন অফ করবেন যিনি তিনিও এখানেই নেমে যাবেন। এখানে প্রয়োজনীয় বাংকারিং(জাহাজের জ্বালানী সংগ্রহ) করে আটলান্টিক পাড়ি দিতে হবে আমাদের। আমি ভাবলাম আহা সুখের দিনগুলি ফুরালো। এমন ফুরফুরে ঘুরে বেড়ানো, আর মিটার রিডিং চলতে থাকলে কার না ভালো লাগে। ট্যাক্সিওয়ালার মতো, পিক আওয়ারে মিটার অন, আপনি যেখানে খুশী সেখানে যান, ওর কি চিন্তা!!

শুরু হলো অতলান্তিকে যাত্রা, জিব্রাল্টার থেকে সান জুয়ান। পোর্টো রিকো দ্বীপের সান জুয়ান। এটা আমেরিকার একটি দ্বীপ কনস্টিটিউয়েন্সী।
আমরা যাবো পোর্টো রিকো, তারপর পানামা ক্যানেল পাড়ি দিয়ে সাউথ এমেরিকা। জিব্রাল্টারে জাহাজে উঠে পড়লাম,জাহাজ নোঙরে।
বাংকারিং হলো, ইউক্রেনিয়ান আলেকজান্ডার আমারে কিছু কাগজপত্র আর মেশিনপত্র বুঝিয়ে দিয়ে টাটা বাই বাই বলে বিদায় নিলো। এই ইউক্রেনিয়ানদের একটা জিনিস খুব মজার। এরা সবাই আলেকজান্ডার বলতে ফিদা। ছোটবড় অনেকের নামেই মিল খুজে পাওয়া যায়।

জাহাজে আমি একাই বাংলাদেশী,  বাকি লোকজন মোটামুটি ইউক্রেন, রাশিয়া, ফিলিপিন্স এ দেশগুলির। কমপ্লিট ব্লেন্ডেড একটা এটমোস্ফিয়ার, এটা আমি সবসময়েই এনজয় করি। ইস্ট ইউরোপিয়ানদের ত, থ আর দ দিয়ে ইংরেজী উচ্চারন, ফিলিপিনোদের ফুর্তিবাজি দু’টাই আমার ভালো লাগে। ফিলিপিনো ক্যারোওকে গান শুনলে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যাবে। দুনিয়ায় এমন কোন ফিলিপিনো নেই যে গান গাইতে মানে ক্যারোওকে গানে তাল মিলাইতে পারে না। সবাই এমনভাবে গান গাইবে মনে হবে এটা ওরই গাওয়া। আর জাহাজে একদল খাবে আলু, চিজ আর ব্রেড, আরেকদল ফিস স্যুপ, নুডুলস আর ভাত সঙ্গে পর্ক। আমি এদের চিপায় পড়ে দুইটার এক অদ্ভুত মিক্সচার করে দিনপার করি।

আটলান্টিক আর এদের নিয়ে গল্প হবে পরে অন্য কোনদিন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]