প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

এক.

আওমরি, সুগারু স্ট্রেইট, জাপান
ব্যাপারটা ঠিক এমন, শার্প মধ্যরাতে ১২ টার সময় আমার ঘড়ির কাটা খুব দ্রুত ঘুড়ে রাত একটা বেজে যাবে।
এবং নেক্সট সতেরো দিনের সমুদ্রযাত্রায় ঘড়ি মোট নয়বার এমন এগোবে।
ঘড়ির কাটা এই যে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোবে সেটার সঙ্গে শরীরের ঘড়িটা ঠিকঠাক তাল মেলাতে পারে না। তাই ঘুমের সময়টা উল্টেপাল্টে যায়।
ফলে যা হবার তাই, দিনদুপুরে ঘুম আসে, আর রাতে চোর পাহারা টাইপের রাতজাগা।

এরপরে আবার আরেকটা ধাক্কা থাকে বাকী, চারদিন কি পাঁচদিনের দিন রাতের বেলা ক্যালেন্ডারের দিনটাও পিছনে চলে আসে, মানে একই তারিখ দুইদিন পার করতে হবে।
মানে আটচল্লিশ ঘন্টায় একদিন হবে ক্যালেন্ডারে।
আন্তর্জাতিক দিনরেখা পার হওয়ার এই এক ঝামেলা।
মাস যদি হয় ৩১ দিনে তাহলে তো সেরেছে, পুরা ৩২ দিনে হবে এক মাস, বেতন কিন্তু একই।

জাপান থেকে পূর্বে যাওয়ার এই হলো বিশেষ ঝামেলা, ঘুম নাইতো নাই তার উপর দিন একটা ডাবল।
তবে জাহাজে চাকরি করি বলেই,
এই বিশেষ টাইম মেশিনে চড়ে একদিন পিছনে যাওয়ার মতো ঘটনা।
যদিও আবার ফিরে আসার সময় একটা দিন গায়েব আমার জীবন থেকে।
ওই তারিখটা জীবনে আর থাকবেই না।
এটা যদি আবার এমন হয় ফেব্রুয়ারী মাসে অ্যামেরিকা থেকে জাপান আসি, তাহলে ২৭ দিনে একমাস হয়ে যাবে।
মাঝে মাঝে মনে হবে টাইমমেশিনে একদিন সামনে চলে এলাম।

কোরিয়ার ইউসো থেকে জাপানের হনসু আর হোক্কাইডো দ্বীপের মাঝামাঝি চ্যানেলের দিকে রওয়ানা হলাম কাল সন্ধ্যায়।
আজকাল কোরিয়া উপদ্বীপ আর চীনের আশেপাশে কেমন কুয়াশা কুয়াশা একটা ভাব থাকে। আাকাশ কেমন মেঘলা থাকায় দৃষ্টিসীমাও অল্পতেই আটকে যায়।
তবে জাপান যতোই কাছে আসে ততো নীল হতে শুরু করে সাগর আর আকাশ।

এখানটায় টেম্পারেচার বেশ আরামপ্রদ, একটা শীতশীত ভাব আছে এখনও উত্তর গোলার্ধে।
ঠান্ডা হাওয়া বইছে দিনের বেলায়ও।
যতো উত্তরে যাচ্ছি এসি যেনো একটু বেশীই ঠান্ডা করে দিচ্ছে কেবিন আর অফিসরুমটাকে।

রাতের শুরুতে আকাশে শুধু তারাদের দেখা মিলছে।
রাত দশটার দিকে চাঁদ উঠছে,
দেখে মনে হয় যেনো সাগরের মাঝখানে ডুবে ছিলো, এখনই বের হওয়ার সময় হলো।
আমার আবার একটুআধটু জোসনাপ্রেম থাকায় চাঁদকে ফলো করি সবসময়। আজ চাঁদ বেশ লাল রক্তিম একটা আভা নিয়ে দেখা দিলো।
ক্যামেরা নিয়ে আসলাম, ছবি তুললাম, ব্লাডমুনের ছবি।
আমার ছেলে আমাকে শিখিয়েছে রক্তিম লাল চাঁদকে ব্লাডমুন আর নীল চাঁদকে ব্লুমুন বলে। সেও বিশাল চাঁদ বিশেষজ্ঞ

যদিও আজকাল ডিএসএলআরের যুগ, আমার এ পুরোনো ক্যামেরাটায় ঠিকঠাক দূরের ছবি আসে না।
আমিও আবার ডিএসএলআর কিনিনা, এতো ভারী যন্ত্রপাতি আমার পছন্দ না।

শিপে আমার সঙ্গে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ‘আন্তারিকস নেগি, জয়েন করেছে কেনিয়ার মোম্বাসায়।
ওর বয়সটা এমন যে প্রচুর উৎসাহ আর সবকিছুতেই অবাক হওয়ার একটা অভ্যাস।
চন্ডীগড়ের এই ছেলেটা কলকাতায় চার বছর ডিএমইটি তে পড়াশুনা করে এখন জাহাজে ট্রেইনিং পিরিয়ড পার করছে।
ওর কথা এতো বলছি কারন ও ফটোগ্রাফী এক্সপার্ট,
কলকাতায় এক মেয়ে পার্টনার ওকে বেশ কায়দা করে ফটোগ্রাফী শিখাতো।
এখন ও পাক্কা ফটোগ্রাফার।
যদিও একমাত্র ক্যামেরাটি ও ওর কলকাতার বন্ধুটিকে দিয়ে এসেছে, জাহাজে এসে আরেকটা কিনবে মনস্থির করেছে।

এরমাঝে আমি অবশ্য ভালোবাসা ভালোবাসা একটা কবিতার ঘ্রাণ পেয়ে যাই।
ও আমাকে দাওয়াত দিয়ে রেখেছে চন্ডীগড় দেখাবে। ওর শহর নাকি খুব সুন্দর আর সবুজ। ওকে বললাম আমার শহর বরিশালও অনেক সবুজ আর সুন্দর, তার সঙ্গে আছে নদী।
আমিও বরিশাল শহরটাকে খুব মিস করি।

তবে ও কলকাতার ব্যাপারে দেখলাম বেশ দুর্বল, আসল কাহিনী তো আমি বুঝি,
কলকাতায় ওর মনটা পরে আছে।
এমন প্রত্যেক মেরিনারেরই মনটা পরে থাকে কত দূরদূরান্তে তার প্রিয় কোন শহরে, প্রিয় কোন মানুষের কাছে।

তবে সাগরের টানটাও অদ্ভুত, খুব বেশীদিন সাগরের টানটা উপেক্ষা করা যায়না।
কেমন একটা বড়শির খোটের মতো।
বাড়ীতে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতেই একটা সময় মনে হবে আরে যাওয়া দরকার।
এই টানটা বেশ জোরালো, সাগরের টান বলে কথা।

সমুদ্রে জীবনটা পুরোই অন্যরকম, পলিউশনের কোন ব্যাপারস্যাপার নেই। নেই কোন ট্রাফিক জ্যাম, নেই বেশী মানুষের হৈ হুল্লোর। মানুষ মোটে গুনেগুনে ২০-২৫ জন।
তাও একেকজনের কাজের জায়গা একেকটা।

নীল আকাশ আর নীল সাগর দুটোই অসীম।
এর যেনো কোন শেষ নেই।
অধিকাংশ সময়েই মহাসাগর পাড়ি দিতে গেলে দৃষ্টিসীমায় কোনকিছুই থাকে না।
শুধু জল আর জল, উপরে নীল আকাশ।
রাতে আকাশভরা তারা, এমন তারাভরা রাত শুধু সাগরেই দেখা সম্ভব। সাগর জোসনা নিয়েতো আমি আগেই বলেছি।
অপরূপ জোসনা রাত সাগর জলে যখন আছড়ে পরে তখন পৃথিবীর কোন সৌন্দর্য তার সঙ্গে তুলনা করা চলেনা।

আজ রবিবার, আলসে দুপুর, জাহাজের বিরিয়ানি দিবস। সকালে একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলাম।
আমাদের ছুটি বলতে এই একটা দিন একটু আরামসে ঘুম দেয়া।
কিন্তু জাহাজ তো আর থেমে থাকে না, কিলোমিটারের হিসেবে ঘন্টায় প্রায় পয়ত্রিশ চল্লিশে সামনে এগিয়ে যায় কার ক্যারিয়ার।
হিসেবনিকেশও করতে হয়, রিপোর্টও বানাতে হয়, দু চারটা ছুটি দিবসেই মেইলও রিপ্লাই করি।
কার্গো না থাকলে বিকেলে আমরা নাম্বার সিক্স ডেকে গিয়ে ক্রিকেট খেলি, ব্যাট আর টেপ টেনিস সবই আছে।

ইয়ং ক্যাপ্টেন হলে সুবিধা, খেলাধূলায় ব্যাপক উৎসাহী হয়। বলার আগেই ব্যাট নিয়ে দাড়িয়ে পরে।
আজকাল অবশ্য বয়সে তরুণ কাপ্তানদের দেখা মিলছে না।
বেশীরভাগই কমিউনিকেশন কম্পিউটারের সামনে বসে ইমেইল চালাচালি করে জীবনটা পার করে দেয়।

কাল উইকলি ফায়ার এন্ড বোট ড্রিলের পরে ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সী নিয়ে একটা ছোট লেকচার দিলাম।
বললাম রোদে বের হতে, বিশেষ করে প্রকৌশলীদের।
এরা সাধারণত রোদ দেখলে ভয় পায়।
সারাক্ষণ কৃত্রিম আলোতে থাকায় অভ্যস্থ মেরিনাররা রোদের আলো সহ্য করতে পারে না।
সকাল সকাল যদি একটু মৃদু সূর্যালোক গায়ে না মাখায় তাহলে অবসাদ আর ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায় এটা বুঝালাম।

আজ আকাশে কোন মেঘ নেই, নীল আকাশের সৌন্দর্যটা বেশী ফুটে ওঠে মেঘে।
সেই মেঘই অনুপস্থিত।
জাপানের এ পাশটায় খুব বেশী জাহাজ আসে না।
সুগারু কাইকিও চ্যানেল পার হওয়ার সময় কিছু জাহাজের দেখা মেলে।
এর একপাশে হোক্কাইডো আরেক পাশে হনসু দ্বীপ।
হোক্কাইডোতে মোটামুটি সারাবছরই ঠান্ডা থাকে, বরফের দেখা মেলে সারাবছর।

একবার হোক্কাইডোতে গিয়েছিলাম কার্গো ডিসচার্জ করতে, মানুষগুলো কিছুটা আলাদা মূল জাপানিজদের থেকে।
লম্বা গড়ন চেহারাও লম্বাটে কিছুটা রাশান ভাব আছে এদের চলনে বলনে।
তবে অন্তরে এরা পুরোপুরি জাপানিজ।

ওপাশে গেলে কুরিল সাগর থেকে ভীষন ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে।
জানুয়ারী ফেব্রুয়ারীতে তো রীতিমত তুষারপাত হয় মাঝ সমুদ্রেও।
প্রায়ই জাহাজের ডেক পুরু বরফে ঢেকে যায়, জাহাজের ফরোয়ার্ডে যাওয়া মুশকিল হয়ে যায়।
মুরিং রোপ পর্যন্ত বরফে ঢেকে যায়।
আর তুষারপাত তো আছেই।
এসি বন্ধ করে তখন স্টীম হিটিং হিউমিডিফায়ার খুলতে হয়। এর আবার উল্টো ঝামেলা আছে।
হিউমিড এডজাস্ট না হলে গায়ের চামড়া ফেটে যায়, সাথে শুরু হয় চুলকানি।
সুতরাং বসে বসে এডজাস্ট করো।( চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]