প্রসঙ্গ: ‘করোনা’ এবং ‘করোনা’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী

‘করোনা’ অতিমারীর অন্ধকারে অবশেষে আলোর রেখা। ক্ষীণ নয়, বেশ উজ্জ্বলই। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে হয়তো চলতি বছরের শেষ নাগাদই ‘করোনা’র প্রতিষেধক টিকা জনসাধারণের উপরে প্রয়োগের জন্য তৈরি হয়ে যাবে। তার আগে পর্যন্ত অবশ্য এই সর্বগ্রাসী অতিমারীর আবহেই কালাতিপাত করতে বাধ্য থাকবো আমরা। এমত অবস্থায় শয়নে-স্বপনে-জাগরণে ‘করোনা’ ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসছে না। অতএব ‘করোনা’ নিয়েই হালকা দু-চার কথা।

আমাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রে ১৪ সংখ্যাটির পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করছিলাম।

যেমন, পৌরাণিক যুগ থেকে যদি শুরু করি, রামচন্দ্রের বনবাস হয়েছিলো ১৪ বছরের জন্য।

কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ অথবা কাশীরাম দাসের ‘মহাভারত’ রচিত ১৪ বা চতুর্দশ-পদী পয়ার ছন্দে। তুলনায় আরো সাম্প্রতিক কালে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতাও চতুর্দশপদী, যেমন সে সময়ের অন্যান্য আরো কবির রচনাও।

হিন্দু ধর্মে তর্পণের সময় ঊর্ধতন ১৪ বা চতুর্দশ পুরুষের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার বিধি।
কালী পূজায় ১৪ প্রদীপ জ্বালানো বা ১৪ শাক ভাজা খাওয়ার প্রথা।

খৃষ্টানদের বাইবেলেও ১৪ সংখ্যাটি মোক্ষ ও মুক্তির প্রতীক। প্রাচীন ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, জেরুজালেমের পুননির্মাণ এবং ‘পরিত্রাতা’র আগমনের মধ্যে কেটে যাবে ৪৯০ বছর। মানবজীবনের এক-এক পুরুষের মেয়াদ সে যুগে ধরা হতো ৩৫ বছর, অতএব সেই হিসেবে ৪৯০ বছর হলো ঠিক ১৪ পুরুষ।

পাশ্চাত্য জ্যোতিষশাস্ত্রেও ১৪ সংখ্যাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যেহেতু এটিকে জ্ঞান, ভ্রমণ ও অজানা এলাকায় অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়।

অতীত থেকে আধুনিক যুগে যদি ফিরে আসি, ওচঈ বা ভারতীয় দ-বিধি অনুসারে, গুরুতর অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদ- হলে ন্যূনতম ১৪ বছর সাজা ভোগ করার পরই বিবেচনা করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার মেয়াদে কিছুটা ছাড় পাওয়ার যোগ্য কি না।

সুন্দরী তরুণীর মুখশ্রীর তুলনা করা হয় চতুর্দশীর চাঁদের সঙ্গে উল্লেখ্য, গুরু দত্ত পরিচালিত চলচ্চিত্র চৌধ্বী কা চান্দ্।

কলহ-দ্বন্দ্বে গালাগালি দিয়ে ১৪ গুষ্টি উদ্ধার করে দেওয়া তো আছেই।

আর বর্তমানের এই ‘কোভিড ১৯’ অতিমারীর সময়ে, ‘কোয়ারান্টাইন’ বা নিভৃতাবাসের মেয়াদও ১৪ দিন!
কী বলা যাবে এটাকে? আশ্চর্য সমাপতন অথবা অন্য কিছু?

*
যে সুবৃহৎ আবাসনটিতে আমাদের বর্তমান নিবাস, সেখানে রয়েছেন নানা শ্রেণীর এবং নানা পেশার বাসিন্দারা। করোনা-ভাইরাস্ অতিমারীর প্রকোপে আমাদের সকলেরই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অল্পবিস্তর বিপর্যস্ত। আবাসনে প্রবেশ ও নির্গমনের প্রতিটি দ্বারেই কড়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যেমন শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা, জীবাণুনাশকের সাহায্যে হাত পরিষ্কার করা আর বাইরে বেরোনোর সময়ে নাকমুখ ঢাকা মুখোশ পরে থাকা তো বটেই। এইসব কারণে প্রথম প্রথম কিছুটা অসুবিধা বা অস্বস্তি বোধ হলেও এখন আমরা তামাম দুনিয়ার সকলের মতোই মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। আমাদের প্রতিবেশী একজন আবাসিক ডাক্তার তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্বখেদে বললেন, ‘কী দিনকাল পড়লো বলুন তো! ডাক্তার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় দারোয়ান টেম্পারেচার দেখছে, তারপর গম্ভীরভাবে বলছে, ডাক্তারবাবু, আপনি ভালোই আছেন। ভেতরে যেতে পারেন।’

*

নিচের কথোপকথনটি কিছুটা অতিরঞ্জিত হয়তো, কিন্তু নিছক কাল্পনিক সম্ভবত নয়।
হাসপাতালে করোনা-আক্রান্ত রোগীদের ওয়ার্ডে জনৈক ব্যক্তির অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ফোন:
: দয়া করে বলবেন কি, এই ওয়ার্ডে ক-বাবু নামে যে রোগী ভর্তি রয়েছে তার অবস্থা এখন কেমন?
যে নার্স ফোন ধরেছেন তাঁর উত্তর:
: এক মিনিট। (কম্পিউটারের কীবোর্ড টেপার অস্পষ্ট আওয়াজ) হ্যাঁ, ১০১ নং বেডে ভর্তি রোগী তো? উনি বেশ ভালো আছেন এখন। টেম্পারেচার নর্মাল, ব্লাডপ্রেশারও তাই। দুপুরে স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দু-তিন দিনের মধ্যেই ছুটি পেয়ে যাবেন।
:বাব্বাঃ, বাঁচা গেল! যা দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। অনেক ধন্যবাদ।
: আপনি কি ক-বাবুর পরিবারের কেউ, কিংবা ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু?
: না না, আমি নিজেই ক-বাবু। আসলে কেউ কিচ্ছু বলে না আমাকে। ডাক্তার-নার্সদের জিজ্ঞেস করলে কোন জবাব পাই না। তাই ভাবলাম একবার ফোন করলে যদি….

বাস্তব ক্ষেত্রেও, বেশির ভাগ হাসপাতালেরই পরিস্থিতি এ’রকমই, করোনা-রোগীদের চিকিৎসার বা যতœ নেওয়ার যেসব ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের ‘অব্যবস্থা’ বলাই ঠিক।

*

প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত ইংরেজি সাল নির্দিষ্টকরণের প্রথা হলো সালের আগে অথবা পরে BC, A_©vr Before Christ ev  বা খৃষ্ট-পূর্বাব্দ এবং AD, অর্থাৎ Anno Domini (In the Year of our Lord) বা ‘আমাদের প্রভূর জন্মবছরে’ ¬Ñ খৃষ্টাব্দ, এই দুটি সংকেত ব্যবহার করা। বর্তমান অতিমারী পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে, এই দুই সংকেতের অর্থের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আসন্ন। নিকট ভবিষ্যতে BC Avi Before Christ বোঝাবে না, তার বদলে বোঝাবে Before Corona বা ‘করোনা-পূর্ব’এবং AD হয়ে যাবে AC, A_©vr After Corona বা ‘করোনা-উত্তর’। ইংরেজি সাল এবার থেকে লেখা হবে, ধরা যাক, ২০১৯ ইঈ অথবা ২০২১ অঈ, এইভাবে।
এমন একটা সম্ভাবনা কী সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যায়?

*
সংবাদপত্রের ‘খেলা’র পাতায় ছাপা খবর ,“করোনার আতঙ্কে বন্ধ ক্রিকেট মরশুম। সমস্ত স্তরের ক্রিকেট লীগ বন্ধ করে দিয়েছে সিএবি। বন্ধ জেলা স্তরের সব প্রতিযোগিতাও।” ক্রিকেট অনুরাগীদের জন্য অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক খবর অবশ্যই। আমি নিজে অবশ্য ক্রিকেট অনুরাগী নই একেবারেই, তবে করোনার বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য যে বিধিটি মেনে চলা জরুরী, সেটা ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ততটা আবশ্যিক বোধহয় নয় যতটা অন্যান্য খেলাধুলার ক্ষেত্রে। আমি বলছি তথাকথিত ‘সামাজিক দূরত্ব’ (আমার মতে ‘শারীরিক দূরত্ব’) বজায় রাখার কথা। বিভিন্ন ক্রীড়ার মধ্যে ক্রিকেটই এই বিধি মেনে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। টেনিস্ বা ব্যাডমিন্টন হলো আরো দু’টি খেলা যেগুলোতেও এই বিধি মানাটা সহজ। এছাড়াও এই বিধিসম্মত আরেকটি খেলা হচ্ছে গলফ্, যদিও অনেকে হয়তো এটাকে প্রকৃত অর্থে খেলা বলে মানতে চাইবেন না।
তবে হ্যাঁ, খেলার সময় সুরক্ষাবিধি মেনে ‘মাস্ক’ বা মুখোশে যদি মুখ ঢেকে রাখতে হয় – যে খেলাই হোক – সেটা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত হবে তা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন।

*

অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজনে এক্ষুনি বাইরে বেরোতে হবে? বেশ কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি খালি পড়ে থাকবে, কিন্তু সদর দরজায় লাগানোর তালাটা খুঁজে পাচ্ছেন না কোত্থাও? দুশ্চিন্তা করবেন না, সমাধান আপনার হাতেই। এক পাতা ফুলস্ক্যাপ কাগজ নিয়ে তার ওপরে মার্কার পেন দিয়ে (লাল রঙের হলে ভালো হয়) বড় বড় অক্ষরে লিখুন:
সাবধান!

COVID 19 POSITIVE CASE!!

তারপর বাইরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে ঐ কাগজটা আঠা দিয়ে পাল্লার গায়ে ভালো করে সেঁটে দিন। ব্যস্, এবার নিশ্চিন্তে আপনার কাজে চলে যান। কাজ সেরে ফিরে এসে দেখবেন দরজার গায়ে সাঁটা কাগজ যথাস্থানেই রয়েছে আর বোঝাই যাচ্ছে সারা দিনে একবারও বাইরে থেকে দরজা খোলার চেষ্টাই করেনি কেউ। তবে হ্যাঁ, প্রতিবেশীদের প্রবোধ দেবেন কী বলে সেটাও কিন্তু আগেভাগেই ভেবে রাখবেন!

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]