প্রসঙ্গ খেলাধুলা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী

‘কোভিড-১৯’ অতিমারীর গুঁতোয় যাবতীয় ‘আউটডোর স্পোর্টস্’ বা খোলা ময়দানের খেলাধুলা তো এখন শিকেয় উঠেছে। এসব খেলাধুলার মধ্যে যেগুলির চর্চার জন্য প্রয়োজন শারীরিক শক্তির সঙ্গে দক্ষতা বা নৈপুণ্য, এবং ‘টিম’ বা দলবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ, সেগুলি হলো কাবাডি, ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট, হয়তো আরও দু-একটি। টেনিস্, টেবিল্ টেনিস্, ব্যাডমিন্টন-ও অবশ্য এই জাতীয় ক্রীড়ার অন্তর্গত হতে পারে, দু-জন বা চারজন খেলোয়াড়ের কথা মাথায় রাখলে। কুস্তি বা তিরন্দাজিকে স্বাভাবিকভাবেই এই গোত্রে ফেলা যাবে না। এইসব খেলার মধ্যে একমাত্র কাবাডি সম্পূর্ণভাবে দেশজ খেলা। কোথায় যেন পড়েছিলাম কাবাডির জন্ম প্রায় চার হাজার বছর আগে, তামিল নাড়ুতে। গৌতম বুদ্ধও নাকি কাবাডির ‘ফ্যান’ ছিলেন। অন্যগুলি সবই বিদেশীদের, প্রধানত ইংরেজদের, কাছ থেকে ধার করা। কাবাডিকে বাদ দিয়ে অন্য খেলাগুলির মধ্যে ফুটবলকেই বলা যেতে পারে ‘আমজনতার’ খেলা কারণ উপকরণ হিসেবে কোনমতে একটা ফুটবল যোগাড় করতে পারলেই খেলায় নেমে পড়া যায়। এমনকি সত্যিকারের বলের বদলে নেকড়ার বল, মায় বাতাবি লেবু বা জাম্বুরা দিয়েও কাজ চালানো যায়। ছেলেবেলায় অনেক সময়েই তেমনটা হয়তো করেছি কেউ কেউ। আর ফুটবল বুটও তো আবশ্যিক নয়, খালি পায়েই খেলা যায়। ১৯১১ সালের ২৯শে জুলাই ঈস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট টিমকে হারিয়ে আইএফ্এ শীল্ড জিতে নিয়েছিলো আমাদের ঘরের টিম মোহন বাগানের ‘খালিপদ’ খেলোয়াড়রাই। পেশাদার ফুটবলে আজকাল অবশ্য বুট না পরে খেলার কথা চিন্তা করা যায় না, তবে শিশু-কিশোররা এখনও পাড়ার মাঠে খালি পায়েই দিব্যি খেলে। হকি, ক্রিকেট, টেনিস্, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি অন্য খেলাগুলিতে উপকরণের বাহুল্য , স্টিক্, ব্যাট, প্যাড, র‌্যাকেট, নেট, খেলার জুতো, আরো কত কী। সুতরাং এইসব খেলা ব্যয়সাধ্য তো বটেই, সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের নাগালের বাইরেও। অবশ্য শুনেছি সে-যুগে আমাদের দেশি হকি খেলোয়াড়রাও খালি পায়েই খেলেছেন।
হকির কথা বলতে গেলে একটা বিষয়ের উল্লেখ করতেই হয় , সেটা হলো, এই খেলাটিতে এক সময়ে ভারত কিন্তু বিশ্বসেরা ছিলো। জার্মানীতে যখন অ্যাডলফ্ হিটলার-এর জমানা, তখন ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিকস্-এ হকি প্রতিযোগিতায় জার্মানীকে হারিয়ে ভারত স্বর্ণপদক জিতে নেয়। ফাইন্যাল ম্যাচে কিংবদন্তী হকি খেলোয়াড় ধ্যান চাঁদ হ্যাট্ট্রিক্ করেছিলেন। কথিত আছে, খেলার পরে ধ্যান চাঁদকে ডেকে পাঠিয়ে হিটলার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হকি খেলা ছাড়া তুমি আর কী করো?’ ধ্যান চাঁদ বলেছিলেন যে তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে একজন ল্যান্সনায়েক। হিটলার নাকি বলেছিলেন, ‘তুমি ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে জার্মানীতে চলে এসো, আমি তোমাকে ফিল্ড মার্শাল করে দেবো।’ উত্তরে ধ্যান চাঁদ সবিনয়ে বলেছিলেন, ‘ভারত আমার দেশ, স্বদেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।’ হিটলার অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন নিশ্চয়ই, কারণ তাঁর কথা কেউ অগ্রাহ্য করবে সেটা তাঁর কাছে অকল্পনীয় ছিলো। তবে ধ্যান চাঁদের প্রত্যাখ্যান তিনি মেনেও নিয়েছিলেন। পরিতাপের বিষয়, হকি খেলায় ভারতের গরিমা এখন অস্তমিত।
যাই হোক, এই খেলাগুলিকে আমরা, অর্থাৎ উপমহাদেশীয় লোকজনরা, যথেষ্ট আপন করে নিতে পেরেছি। কাবাডি যেমন ভারতের জাতীয় খেলা, হকিও তাই, এবং এই মর্যাদার অংশীদার ক্রিকেট আর ফুটবলও। ভারতীয় ক্রিকেট দল বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর এই খেলাটিকে ঘিরে ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমিকদের উন্মাদনা তো প্রায় পাগলামির পর্যায়ে পড়ে। তাদের কাছে ক্রিকেট খেলোয়াড়রা যেন সাধারণ মানুষ নয়, এক-একজন দেবতাবিশেষ। খেলোয়াড়দেরও দু-চারজনের হাবভাব দেখলে মনে হয় তারাও নিজেদের দেবতা বা ‘সুপারম্যান’ ভাবে। যেমন, ‘আইপিএল’  ইন্ডিয়ান প্রীমিয়ার লীগ – খেলার আয়োজন এই মূহুর্তে ইন্ডিয়ার ভেতরে করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সেটাকে দেশের বাইরে দুবাই-এ সরিয়ে নিয়ে যেতে হলো, যেন এই ক্রীড়ানুষ্ঠান এক বছরের জন্য বাতিল করা হলে জগৎসংসার রসাতলে যাবে! এটাকে পাগলামি ছাড়া আর কী বলবো? অবশ্য নিছক ক্রীড়াপ্রেম ছাড়াও কয়েকশ’ কোটি টাকা লেনদেনের বাণিজ্যিক ব্যাপারটাও আছে। তবে একটা কথা মানতেই হয় যে আজকের অতিমারীর আবহে জনজীবনে তথাকথিত ‘সামাজিক দূরত্ব’ – আমার মতে ‘শারীরিক দূরত্ব’ -বজায় রেখে চলার প্রয়োজনীয়তা ক্রীড়াঙ্গনেও সার্থকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব ক্রিকেট খেলাতেই। এই মন্তব্যটি বোধহয় আমি আগেও একবার করেছি, অন্য একটি লেখায়।
প্রসঙ্গত, ক্রিকেট খেলাটি ১৭২৬-৬৩ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের জাতীয় খেলায় পরিণত হয়। ঐ সময়ে গোড়ার দিকে বোওলার বল করতো ‘আান্ডারআর্ম’ পদ্ধতিতে, অর্থাৎ হাত কোমরের নিচে ঝুলিয়ে ব্যাটিং উইকেটের দিকে বল ছুঁড়ে। এভাবে বেশ কিছুদিন খেলা চলার পর মহিলারাও ক্রিকেট খেলতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। কিন্তু খেলতে গিয়ে তাদের একটা সমস্যায় পড়তে হলো। তখনকার দিনে ইংরেজ মহিলাদের বাড়ির বাইরে পরার সাধারণ পোষাক ছিলো পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা স্কার্ট বা গাউন, দুই পা ঘিরে বেশ খানিকটা ছড়ানো। তাই আন্ডারআর্ম বল করতে গেলেই পোষাকে হাত আটকে যেতো। সুখের কথা, সে যুগের পুরুষ ক্রিকেট খেলোয়াড়রা মহিলাদের খেলা থেকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবলো না, বরং তারা যাতে খেলতে পারে সেজন্য বল করার নতুন নিয়ম প্রস্তাবিত হলো। তখন থেকে কোমরের নিচে হাত ঝুলিয়ে বল ছোঁড়ার বদলে ‘ওভারআর্ম’, অর্থাৎ কাঁধের ওপর দিয়ে হাত ঘুরিয়ে বল ছোঁড়ার রীতি প্রবর্তিত হলো। ব্যাটিং উইকেট লক্ষ্য করে বল ছোঁড়ায় মহিলাদের আর কোন সমস্যা রইলো না। এইভাবে বল করাই সেই থেকে ক্রিকেট খেলায় স্বীকৃত কৌশল।
এই ‘শারীরিক’ বা ‘সামাজিক’ দূরত্ব বজায় রাখা অবশ্যই সম্ভব আরেকটি খেলাতেও। এই খেলাটি হলো ‘গলফ্’, যদিও অনেকে হয়তো এটিকে প্রকৃত অর্থে ‘খেলা’ বলে মানতে চাইবেন না। ক্রিকেট খেলায় মহিলাদের অংশগ্রহণ সহজ করে তোলায় পুরুষরা যে উদারতার পরিচয় দিয়েছিলো, গলফ্ খেলায় কিন্তু পুরুষরা দীর্ঘদিন মহিলাদের প্রতি সেই ধরনের উদারতা দেখায়নি। গলফ্ খেলার সূচনা পঞ্চদশ শতকের স্কটল্যান্ড-এ। ঐ সময় থেকে শুরু করে প্রায় ১৮৬০ সাল পর্যন্ত একমাত্র পুরুষরাই গলফ্ খেলার অধিকারী ছিলো। খেলার নামটিও আজকের যুগ পর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্যের স্বাক্ষর বহন করছে। ইংরেজি Golf শব্দটি আসলে একটি acronym, অর্থাৎ কয়েকটি শব্দের বানানের আদ্যক্ষর দিয়ে তৈরি আরেকটি শব্দ। এই খেলাটির নামের পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো  Gentlemen Only Ladies Forbidden, অতএব নতুন তৈরি শব্দ হলো এ ঙ খ ঋ পুরুষ আধিপত্যের একটি চরম দৃষ্টান্ত। মহিলাদের যদিও এখন অনেক বছর ধরেই গলফ্ খেলায় অংশ নেওয়ায় কোন বাধা নেই, খেলার নামের পুরুষালি গন্ধ এখনও দূর হয়নি, কোনদিন হবেও না বোধহয়।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]