প্রাচীন উদ্ভিদ সংগ্রাহকগণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

পর্যটক ও ইউরোপিয়ান উদ্ভিদ-বিজ্ঞানীদের জন্য হিমালয় ভ্রমণ সর্বদা নিষিদ্ধ থাকায় এই এলাকায় অভিযানের বিষয়ে আগ্রহ আরো তীব্র হয়েছিলো। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে এই কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হয়ে আসে, এবং ১৭৭৪ সালে টমাস বোগলে ভুটানের ভিতর দিয়ে লাসা ভ্রমণ করতে পেরেছিলেন। ১৭৯৩ সালে উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিক এসেছিলেন নেপালের নয়াকট-এ। এরপর ১৭৯৬ সালে টমাস হার্ডউইক একটা রাজনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে শ্রীনগরে অলকানন্দা উপত্যকায় গাড়োয়ালের শাসনকর্তার কাছে আসেন।
টমাস হার্ডউইক (১৭৫৭-১৮৩৫) ছিলেন একজন সৈনিক। ইনি প্রথমদিকে ক্লদ মার্টিন (মার্টিনিয়ারি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা)-এর সঙ্গে লক্ষ্ণৌ ও কানপুরে উদ্ভিদ সংগ্রহ করে বেড়িয়েছেন।
তিনি ছিলেন প্রথম ইউরোপীয় যিনি উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে উদ্ভিদ সংগ্রহ করেছেন। গাড়োয়ালে আসার পথে তিনি এই কাজ করেছেন-এই ভ্রমণের কাহিনি বর্ণনা করেছেন ‘এসিয়াটিক রিসার্চেজ’ পত্রিকায় ১৭৯৯ সালে।
সমতলের চাষাবাসের জন্য পাহাড় থেকে বয়ে আসা নদীর পানি অত্যাবশ্যক। এই কারণে গঙ্গা ও যমুনা নদীর উৎস আনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। গাড়োয়ালের পাহাড়গুলোতে জরিপকারীদের পাঠাবার বন্দোবস্ত হয় এবং সেই মর্মে গুর্খাদের কাছ থেকে অনুমোদনও সংগ্রহ করা হয়। গুর্খারা তখন হিমালয়ের ওই অংশে ব্যাপকভাবে নিয়োজিত ছিলো। একজন প্রথম শ্রেণির জরিপকারী ও ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মকর্তা ও দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পান উইলিয়াম স্পেন্সার ওয়েব। দুজন সঙ্গী ছিলো তাঁর সঙ্গে-এ্যাংলো ইন্ডিয়ান সৈনিক হায়দার জং হিয়ারসে ও ফেলিক্স ভিনসেন্ট রেপার। যমুনার উৎস যমুনোত্রী-তে পৌঁছান তারা, এবং গঙ্গার উৎপত্তিস্থলও চিহ্নিত করেন; কিন্তু সহসাই তাদেরকে পাহাড় থেকে হটিয়ে দেয় গুর্খারা।
এই অভিযান থেকে তেমন কোনো উদ্ভিদ-বিজ্ঞান বিষয়ক সাফল্য আসেনি, তবে বঙ্গ-প্রশাসকের পশু-চিকিৎসা কর্মকর্তা উইলিয়াম মুরক্রাফ্ট (১৭৬৫-১৮২৫)-এর জন্য কিছু ইঙ্গিত সেখানে ছিলো। তিনি অভিযানপ্রিয় হিয়ারসে-কে সঙ্গী করে কোনো অনুমতির ধার না ধেরে বেরিয়ে পড়েছিলেন এবং গঙ্গার উৎসমুখের উপরে নিতি পাস্ পেরিয়ে মানসসরোবর হ্রদের সাতলেজ-এর উৎপত্তিস্থলে পৌঁছেছিলেন। তারা বেশ কিছু শুকনো উদ্ভিদ নিয়ে এসেছিলেন, যেগুলো লন্ডনে পাঠানো হয়েছিলো। পর্বতের এতটা অভ্যন্তরে গিয়ে এই প্রথম উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিলো। এর অল্পপরেই গুর্খাদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ বেধে যায়। একসময় বিরোধ মিটে গেলে (১৮১৬) গুর্খারা কুমায়ুন ওগাড়োয়াল থেকে তাদের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়।
এটা ছিলো এর পরে আরো অনেক উদ্ভিদ সংগ্রহের সূচনা মাত্র। রবার্ট ব্লিঙ্কওয়ার্থ এবং ভারত সিং নেপাল-ও উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে সংগ্রহ করেছেন। ১৮১৮ সালে প্রথম রডোডেনড্রন আরবোরিয়াম-এর বীজ ব্রিটেনে পাঠানো হয়। ব্লিঙ্কওয়ার্থ তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় হিমালয়ে কাটিয়েছেন।
উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে কোনো বানিজ্যপথ বের হলেই সেখানে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্থাপন করা হতো। সেরকম হয়েছিরো দেরাদুন-এ, নাহান-এ ও সাবাথু-তে। দেরাদুন স্টেশন থেকে জন্ম নিয়েছে বেশ উঁচুতে মুসৌরি স্টেশন, আর সাবাথু স্টেশন থেকে আরেকটু উঁচুতে সিমলা স্টেশন। ১৮২৭ সালে বড়োলাট (গভর্নর জেনারেল) এ্যামহার্স্ট গরমকালে সিমলায় অফিস করার চল্ করেন, পরে এক পর্যায়ে সিমলা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার গ্রীষ্মকালিন রাজধানীতে পরিণত হয়।
১৮২০ সালে লর্ড হেস্টিংস সাহারানপুর পরিদর্শন করেন। সেখানে তাঁকে একটা পুরনো, কিন্তু অবহেলিত বাগান দেখানো হয়। বাগানটি একসময় ছিলো যাবিতা খান-এর, ইনি ছিলেন অধিকতর প্রসিদ্ধ নাজিব-উদ-দৌলার পুত্র। হেস্টিংস বাগানটির সংস্কার সাধন করেন, ফলে সহসাই এটি পার্বত্যএলাকার উদ্ভিদসংক্রান্ত জ্ঞান বৃদ্ধির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রথমদিককার জরিপকারীরা সাহারানপুরকে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতেন। তখন এটি বেশ ছোটোই ছিলো, যার সম্পর্কে ১৮৩০ সালে জ্যাকমন্ট লিখেছিলেন-‘সত্যিই একটি মনোরম জায়গা…ভারতে সেরা সুন্দর ইংরেজ স্টেশনের একটি।’ তাঁর আত্মা ভ্রমণে এলে আজ আর এই গিজগিজে শহরটি চিনতেই পারবে না।
উইলিয়াম স্পেন্সার ওয়েব (১৭৮৪-১৮৬৫) এবং তাঁর ভাইয়েরা-আলেকজান্ডার জেরার্ড (১৭৯২-১৮৩৯), জেমস গিলবার্ট জেরার্ড (১৭৯৪-১৮২৮) ও প্যাট্রিক জেরার্ড (১৭৯৫-১৮৩৫)Ñ এরা অনেক কষ্টসাধ্য ভ্রমণ করেছেন দুর্গম এলাকায় এবং সাতলেজের অববাহিকার কাছ থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের নামের স্মারক হয়ে আছে পাইন জাতীয় গাছ-আবিয়েছ ওয়েবিয়ানা এবং পাইনাছ জেরারডিয়ানা।
ফ্রান্সে বিজ্ঞান-ভাবনার একজন পথিকৃত ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ব্যারন কুভিয়ার। তিনি তাঁর স্বদেশীদের দ্বারা ভারতে বৈজ্ঞানিক তথ্য-সংগ্রহ প্রচেষ্টায় সন্তষ্ট হতে পারেন নি। ভিকটর জ্যাকমনট্ (১৮০১-১৮৩২) নামে এক ‘প্রচ- উদ্যমী ও আকর্ষণীয়’ যুবককে এক লম্বা সময় ধরে অভিযানে প্ররোচিত করেন তিনি।
১৮২৯ সালের মে মাসে জ্যাকমনট্ কলকাতা পৌঁছান। তাঁকে কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনে (তখন এটি স্যার চার্লস মেটক্যাফে-এর তত্বাবধানে) পর্যবেক্ষণের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। ‘একটা চমৎকার জায়গা’ বলে অভিহিত করেন তিনি বোটানিক্যাল গার্ডেনটিকে। দেশে লিখে পাঠানো তাঁর চিঠি-পত্র (লেটার্স ফ্রম ইন্ডিয়া, ১৯৩৫ সালে ইংরেজিতে অনুদিত হয়) ও ডায়েরি, যা ফরাসি সরকার ১৮৪১ সালে মুদ্রণাকারে প্রকাশ করে, তাতে কলকাতার জীবনধারা সম্পর্কে সুন্দর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বর্ষা শেষে জ্যাকমনট্ উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে সাহারানপুর পৌঁছান, সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান ঔষধি গাছের বিশেষজ্ঞ জন্ ফোরবেস রয়েল। এই ভদ্রলোক তখন বোটানিক্যাল গার্ডেনের দায়িত্বে।
গ্রীষ্মকালটা পাহাড়ে কাটান জ্যাকমনট্। তিনি দেরাদুন এবং মুসৌরি হয়ে যমুনার উৎসমুখে, পরে টনস্ নদী; তারপর সিমলা ; স্পিতি, সেখান থেকে দিল্লি ফেরত আসেন। এটা তাঁর প্রথম কিস্তির লাগাতার সংগ্রহ অভিযান। পাঞ্জাবের শিখ শাসক রঞ্জিত সিং-এর ফরাসি কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন ছিলেন জেনারেল আলার্ড। এই জেনারেল জ্যাকমনট্কে কাশ্মীর প্রবেশের অনুমতির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কোনো উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর জন্য এই সুযোগ প্রথম। ১৮৩১ সালের গ্রীষ্মের পুরোটা তিনি কাশ্মির উপত্যকা ও তার আশেপাশের পাহাড়ে কাটান। তারপর তাঁর বিশাল সংগ্রহ নিয়ে দিল্লি ফেরেন। তবে জ্যাকমনটের শরীর এই কষ্টকর অভিযানের ধকল সইতে পারেনি, এবং ওই বছরেরই ডিসেম্বরে বোম্বেতে মারা যান তিনি মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে। তাঁর উদ্ভিদ সংগ্রহ অবশ্য পঠিয়ে দেয়া হয়েছিল প্যারিসে।
এইসব পুরনো সংগ্রহকারী সবাই কিন্তু উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ছিলেন না। তবে এই ধরনের অনুসন্ধানের তাৎপর্য সবার কাছেই একই রকম ছিলো- জ্ঞানানুসন্ধানী ছিলেন প্রত্যেকে। জ্যাকমনট্-এর মতো আরো অনেকেই এমনতর অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য ও জীবন বাজি রেখে অভিযান করেছেন। (চলবে) 

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]