প্রিয়জনেরা আমাকে ছেড়ে যেতে শুরু করেছে

ড.সেলিম জাহান

জীবনের একটা সময়ে ‘মৃত্যু’ ছিলো শুধু ‘একটা সংবাদ’। তখন তরুন বয়স। সামনে তাকানোর সময় – নিজের জীবনকে গড়ার প্রস্তুতি কাল। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত অহরহ, অন্যদিকে তাকানোর সময় কই? ‘মৃত্যু’ তখন বহুদূরের একটি ধারনা মাত্র, চেতনার করোটিতে তার কোন স্হান নেই। তখন কারো তিরোধান আমার কাছে শুধু একটা ‘খবর’ই ছিলো মাত্র।

মধ্য জীবনে ‘মৃত্যু’ ছিলো একটি ‘অনুভূতি’। তখন প্রিয়জনেরা আমাকে ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। প্রথমে বাবা গেলেন, তারপরে মা, এরপরে অন্যান্য প্রিয় মানুষেরা। প্রতিটি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি হারানোর ব্যথা, একটি বেদনার ভাব, একটি ‘শূন্যতার অনুভূতি’।

আর এখন জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় ‘মৃত্যু’ একটি ‘উদাস করা ভাবনা’। প্রায়শ:ই সংবাদ পাই, ‘অমুক বন্ধু গুরুতর অসুস্হ’, কিংবা ‘তমুক বন্ধু হাসপাতালে’। তারপর কোন অমোঘ মুহূর্তে খবর পাই, ‘সে চলে গেছে’। আজকাল মাঝে মাঝে এমন সংবাদ পাই। তখন একটা ‘উদাস ভাবনা’ আমাকে গ্রাস করে – চলে যাওয়া বান্ধবদের তরুন মুখগুলো মনে পড়ে, যৌবনের সময় গুলোর কথা ভাবি, নিজের ভাবনাও চেতনাকে আবিষ্ট করে রাখে। অশোকতরুর কণ্ঠ শুনতে পাই, ‘বনে যদি ফুটল কুসুম, নেই কেন সেই পাখি, নেইই কেন?’

মনে পড়ে দীর্ঘদিনের সে বন্ধুটির কথা – ৫০ বছরের সখ্য, সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম থেকেই। সে সময়ে আমাদের কথার কোন চিহ্নিত পরিধি ছিলো না – না বিষয়বস্তু সম্পর্কে, না সময়ের প্রেক্ষিতে। আলোচনা চলতো অনর্গল নানান বিষয়ে, তুঙ্গ বিতর্কে কেটে যেতো ঘন্টার পর ঘন্টা, তারুন্যের ঝাপটায় আমরা তখন উদ্দীপ্ত।

তারপর আমাদের দু’জনেই ব্যস্ত হয়ে গেলাম পেশাগত বলয়ে, পারিবারিক জীবন নিয়ে। যৌবনের সে বন্ধুর সঙ্গে নিত্য দেখা হয় না, সাক্ষাৎ পাই মাঝে মধ্যে। মুখোমুখি দেখায় কিংবা দূরালপনীতে খোঁজ-খবর নেই। আলোচনা আর যৌবনের বিষয়ে ফিরে যায় না, তারা এখন মোড় নেয় পেশাগত আশা-হতাশা বিষয়ে, ছেলে-মেয়েদের পড়া-শোনা সম্পর্কে। টের পাই পরবর্তনটি।

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কথা-বার্তার ছায়াও অন্যদিকে সরে যায়। আমাদের কথোপথনের আলো স্হির হয়ে থাকে ছেলে-মেয়েদের সাফল্য-ব্যর্থতার কাহিনীতে, নিজেদের শরীর-স্বাস্হ্য বিষয়ে। তারপর কেমন করে যেন কোন এক অমোঘ দিবসে আমরা আলোচনা শুরু করি কার কার শরীর ঠিক নেই, কে কে অসুস্হ, কে কে চলে গেল।

যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অবাক হয়ে ভাবি জীবনের বদলের সঙ্গে সঙ্গে অর্ধ শতাব্দীর বন্ধুত্বের মানুষটির সঙ্গে আমার কথোপকথন কেমন করে বদলে গেলো। যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত ঘুরে সেখানেই কথা বলা ফিরে এলো যেখানে চলে যাওয়াটাই মূখ্য আলোচনা বিষয় ওই লোপামুদ্রার গানের মতোই ‘যে যায়, সে যায়’।

বেশ কিছুদিন আগে সব কথা শেষ করে দিয়ে সেও চলে গেল। শেষ কথোপকথনের সময়ে কে জানে কেন সে আমাকে শঙ্খ ঘোষের ‘ছুটি’ কবিতাটি শুনিয়েছিল। এখনও মনে হলে তাঁর ভরাট গলা শুনতে পাই,

‘হয়তো এসেছিল। কিন্তু আমি দেখিনি।
এখন কি সে অনেক দূরে চলে গেছে?
যাব যাব। যাব।

সবই তো ঠিক করাই আছে।
এখন কেবল বিদায় নেওয়া,
সবার দিকে চোখ,
যাবার বেলায় প্রণাম, প্রণাম।

কী নাম?
আমার কোন নাম তো নেই,
নৌকো বাঁধা আছে দু’টে,
দূরে সবাই জাল ফেলেছে সমুদ্রে-

ছুটি, প্রভু, ছুটি!

কোন শান্ত বিকেলে তার কথা মনে হয়ে। মনে পড়ে যায় সে সব বন্ধুদের, যারা ছিলো একদিন, কিন্তু এখন নেই। কত আগে পড়েছিলাম বিমল করের ‘আমি ও আমার তরুন লেখক বন্ধুরা’ বইয়ে ‘কেন জন্ম, কেন নির্যাতন’ কবিতার (কবির নাম জানা নেই) ক’টা লাইন,

‘তোমার পূর্ণতা তুমি জেনে গেছো,
এবং ক্ষমতা
কার কাছে নিমন্ত্রণ, কে কে হবে শ্মশানবন্ধুও
তা’হলে উত্থান তবে
তোমার লাগে কি ভালো অবসান
চূড়ান্ত বিদায়’।

ছবি: গুগল