প্রিয়তম শীতকাল চুরি হয়ে গেছে

লুৎফর হাসান

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

উঠোনের ঘাড়ের কাছে বারান্দা। সেখানে মাদুর। গরম ভাতের সঙ্গে লাউশাক ভর্তা। গতরাতের সর পড়ে থাকা রুইমাছের মুড়িঘণ্ট। মাসকলাইর ডাল। ঠাণ্ডা। হাত বরফ হয়ে আসে। চেটেপুটে অমৃত জীবন। ঘর ছেড়ে বেরুতেই নিশ্চুপ সকাল। কলাপাতা হতে ঝরে পড়ে সাদা সাদা শিশিরের দুধ। পশ্চিম পাড়াটা ঝিনাই নদীর কোলের মধ্যে। জল শুকিয়ে গেছে। পাড়ের দিকে ঢাল। সেখানে ধানের চারাগাছ। সবুজ। ভীষণ সবুজ। এত সবুজ, যেন টিয়ে পাখির ডানা পড়ে আছে খুব। কিছুটা উপরেই অবিরাম আলু ক্ষেত। সেদিকে কালচে সবুজ। ঘন সবুজ। সারি সারি। সুন্দরের মিছিল। আরও কিছুটা দূরে গহিন দেবদারুর জঙ্গলের ছায়ার তলে গমক্ষেতের আরও সবুজ। মায়াবী সবুজ। নবীন শস্যের সম্ভার। তারও দূরে জিরা ক্ষেত। সবুজের মাথায় মাথায় কিশোরীর ক্লিপ বাঁধা চুলের উপর যেন খইয়ের মতো ফুল। সাদা জিরা ফুল। ধনেপাতা হতে ছুটে আসে নেশা। নেশার মতন ঘ্রাণ। এ আমার ব্যাকুল শীতকাল। প্রিয়তম শীতকাল।

ঘরের সামনেই সরু রাস্তা। রাস্তার গলা ধরে যে মাঠটা ঝুলে আছে, সেটার বিস্তৃতি বহুদূর। সর্ষের ক্ষেত। হলুদের শ্রেষ্ঠ ছবিটি এইখানেই। এইসব ক্ষেতের আল জুড়ে দূর্বাঘাস। সেখানে বসে রোদের সঙ্গে বন্ধুতা। তখন দুপুর। ভরাট দুপুর। হাতে তখন গরম মুড়ি, সাথে খেজুরের গুড়। মচমচ মচমচ। পাশে ট্রানজিস্টার। সেখানে অনুরোধের আসর গানের ডালি। হেনা কবিরের উপস্থাপনা। বেজে ওঠেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। রুনা লায়লা। সাবিনা ইয়াসমিন। আব্দুল জব্বার। আব্দুল হাদী। অথবা মাজহারুল ইসলাম। সিনেমার ট্রেইলার। আসিতেছে আপনার প্রিয় প্রেক্ষাগৃহে। উসিলা। নসীব। পিতা মাতা সন্তান। বাংলার বধু। কেয়ামত থেকে কেয়ামত। আখেরি হামলা। সতর্ক শয়তান। ন্যায় অন্যায়। নাজমুল হোসাইন। সঙ্গীতমালা। এন্ড্রু কিশোর। কুমার বিশ্বজিৎ। সুবীর নন্দী। সামিনা চৌধুরী। গানের ভিড়ে হলুদ খাম। পলায়নপর চিঠি। তুমি + আমি। রোদ নেমে আসে। এ আমার ব্যাকুল শীতকাল। প্রিয়তম শীতকাল।

বিকেল থাকে না খুব বেশি। যেন দ্রুতগামী ট্রেনে চেপে সে যায় দূরে, বহুদূরে, ঘন হয়ে নেমে যায় সন্ধ্যা তখন। হ্যারিকেনের চিমনি হতে ছুটে আসে কুসুম কুসুম আলো। সেই আলোয় এক মাদুরে বসে আব্বা, সাথে ছোটভাই। সম্মুখে আম্মা পিড়িতে বসে কবুতর ভুনার আগে কৈ মাছ ভাজি আর লাবড়া লাউয়ের দিতে ব্যস্ত ভীষণ। তারপর কাসার বাটিতে ক্ষীর আর পায়েস অথবা জমাট সেই দুধপূলি পিঠা। তার পেটের ভাগে কবি আল মাহমুদ। সোনালি কাবিন শুনি আম্মার মুখে। আব্বার শাল ভরা ওম খুঁজে দেখি। উপরে টিনের চালে নারকেল আর বাঁশের পাতা হতে টুপটাপ চুপচাপ শিশিরের প্রেম। জানালার ফাঁকে দেখি কুয়াশা কত। তারপর লেপ জুড়ে আমাদের শীতকাল। এ আমার ব্যাকুল শীতকাল। প্রিয়তম শীতকাল।

এরকম সহস্র শীতের স্মৃতি। পাই না কিছুই। শুধু গলা ধরে আসে। বুক ভারী হয়। শুনেছি নবগ্রামেও ঢুকে গেছে আস্ত শহর। আর যাই না। হয় না যাওয়া। যাব না আর ঠিক করে রাখি। আর নেই সেই আমার ব্যাকুল শীতকাল। প্রিয়তম শীতকাল চুরি হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে জীবনের সব খাঁটি রঙ।

ছবি: লেখক