প্রীতিলতা: আত্মবিসর্জনে মহিমান্বিত একটি নাম

সাগর লোহানী

১৯৩২ এ বাঙালী নারীর “অবলা” দুর্নাম ঘুঁচিয়েছিলেন যিনি তিনি চট্টগ্রামের মেয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার! বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখে চুনকালি লেপে পরিচালনা করেছিলেন একটি সফল গেরিলা আক্রমণ! আজ পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের ৮৫তম বার্ষিকী।
বৃটিশ বেণিয়াদের লুঠতরাজের আমলে, শোষকশ্রেণীর স্পর্ধিত দিনরাত্রিতে মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে দেশমাতৃকার কতিপয় অমিততেজ সন্তান যে অকুতোভয় লড়াইয়ের সূচনা ক’রে সেদিন বিদেশী সাম্রাজ্যলোভী পরাশক্তিকে ভীতসন্ত্রস্ত্র করে তুলেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জালিয়ানওয়ালাবাগ -এর নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতে আক্রমণ করেছিলেন চট্টগ্রাম শহরের “ইউরোপিয়ান ক্লাব”। সে ছিল ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর।

প্রীতিলতা

১৯১১ সালের ৫ মে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্মগ্রহণ করেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী পিতার মাতুলালয় ধলঘাটে। তার মায়ের নাম প্রতিভা দেবী আর পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার। পরবর্তীতে আসকার খানের দিঘীর দক্ষিন-পশ্চিম কোনের গলির শেষপ্রান্তে বাস করতেন। সম্ভবত ১৯১৮ সালে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম শহরের ডা: খাস্তগির উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯২৮ সালে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে আই এ তে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে মাসিক বিশ টাকা বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজে অনার্সে ভর্তি হন।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির পর বি এ পরীক্ষা না দেবার সিদ্ধান্ত নেন প্রীতিলতা। দেশের এ অবস্থায় বি এ পরীক্ষা মূল্যহীন মনে হয় তাঁর। কিন্তু সবার অনুরোধে তিনি বি এ পরীক্ষা দেন এবং অনার্স পরীক্ষা দেবেন না তা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন। পরীক্ষায় তিনি ডিসটিঙ্কশন পেয়ে পাশ করলে সবার চেয়ে তিনি নিজেই বেশি অবাক হন।

বি এ পরীক্ষার পর চট্টগ্রাম ফিরে এসে তিনি মাষ্টারদার সাথে দেখা করার উদ্যোগ নেন। তাকে জানানো হয় তিনি কিছুদিনের মধ্যেই তার সাথে সাক্ষাত করবেন। এর কিছুদিন পর একই উদ্দেশ্যে কল্পনা দত্ত বেথুন কলেজ থেকে বদলী পত্র নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় অর্পণাচরণ দে’র উদ্যোগে নতুন একটি ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে প্রীতিলতা এর প্রধান শিক্ষয়িত্রী পদে নিযুক্ত হন।

বোন পরিচয়ে রামকৃষ্ণের সাথে যে প্রীতিলতা দেখা করতেন তা চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতারা আগেই জানতেন। সেসব কথা শোনার জন্য সূর্যসেন উৎসুক ছিলেন। তাই চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ধলঘাটে এক গোপন আশ্রয় সাবিত্রী দেবীর বাসায় প্রীতিলতার সাথে সূর্য সেনের দেখা করার ব্যাবস্থা করা হলো। নেতাদের মধ্যে এসেছিলেন সূর্য সেন ও নির্মল সেন। ধলঘাটে একটি ব্রিটিশ পুলিশ-মিলিটারির ক্যাম্প ছিল। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের পর এই ক্যাম্প বসানো হয়। যেটা অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত ছিল। কিন্তু শত অত্যাচার করেও তারা কোন খবর বের করতে পারেনি বিপ্লবীদের।

সাবিত্রী দেবীর এক প্রতিবেশি বিপ্লবীদের আলাপ চলাকালে অর্থলোভে কাছেই অবস্থিত সেই ধলঘাট ক্যাম্পে খবর দেয়। সেখান থেকে পুলিশ এসে বাড়ী ঘিরে ফেললে নির্মল সেন তাদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মারা যান। তবে মৃত্যুর আগে তাঁর হাতে নিহত হয় ব্রিটিশ মিলিটারির ক্যাপটেন ক্যামেরন। অপূর্ব সেন, প্রীতিলতা ও সূর্য সেন পালাতে যেয়ে গুলি লেগে মারা যান অপূর্ব সেন। পানাপূর্ণ পুকুরে নাক ভাসিয়ে ডুবে থেকে বেঁচে যান প্রীতিলতা ও সূর্য সেন। বাড়ির কর্ত্রী গরিব বিধবা সাবিত্রী দেবী তার ছেলে রামকৃষ্ণ ও মেয়ে স্নেহলতাসহ ধরা পড়েন। সাবিত্রী দেবী ও তার ছেলের চার বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়, মেয়ে খালাস পান। জেলের ভেতর তার ছেলে রোগে ভুগে মারা যান।

ধলঘাট যুদ্ধের পরে প্রীতিলতা আবার পিত্রালয়ে ফিরে এসে স্কুলে শিক্ষাকতা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর মন হয়ে উঠেছিল মৃত্যুপাগল। বিপ্লবী দলের প্রচেষ্টা ১৯০৭-০৮ থেকে শুরু হয়ে ২৫ বছর পার হলেও তার মধ্যে কোন মেয়ে বিপ্লবী সাক্ষাত সংগ্রামে যোগ দিল না, ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করলো না, শহীদ হবার সৌভাগ্য লাভ করলো না এই বেদনায় তিনি অধীর হয়ে উঠলেন। ধলঘাট সংঘর্ষের দিন প্রীতিলতা বিপ্লবী নেতার সাথে খুব বেশী কথা বলার সুযোগ পান নি। কিন্তু এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ বিপ্লবের কাজে যোগ দেবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছিলেন বোঝা যায়। কারণ কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে সূর্য সেন আত্মগোপনে যাবার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মত প্রীতিলতা আত্মগোপনে চলে যান।

মাস্টার দা সূর্য্ সেন

১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম কার্যসূচি ছিল দামপাড়া ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেয়া। সেদিন গুড ফ্রাইডে হওয়ায় ক্লাব বন্ধ থাকায় তারা ব্যর্থ হন। এ কথা জেনে দামপাড়া ক্লাব বন্ধ করে পাহাড়তলীতে রেলকর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট ক্লাবকে নতুন ইউরোপীয়ান ক্লাব করা হয়। এই ক্লাবে বেশ কিছু পুলিশ পাহারা দিত। এই ক্লাব আক্রমণের জন্য বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পাঠানো হয়। কিন্তু এবারো তাঁরা ব্যর্থ হন। এতে দুঃখ পেয়ে ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে শৈলেশ্বর চক্রবর্তী কাট্টলীর সমুদ্র উপকূলে নিজের রিভলবরের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।

সমুদ্র উপকূলবর্তী কাট্টলী গ্রামে বিপ্লবী শান্তি চক্রবর্তীর প্রচেষ্টায় বিপ্লবীদের একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের আগে ও পরে বেলাভূমিতে বিপ্লবী দল পিস্তল চালানোর অভ্যাস করতো। ঐ গ্রামের অনেক মধ্যবিত্ত ও কৃষকের বাড়ি ছিল পলাতক বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পাহাড়তলী ক্লাব আক্রমণের জন্য মাস্টারদা সূর্য সেন নতুন ভাবে ভাবতে থাকেন। তিনি নতুন আরেক দলের উপর এই ভার দেবেন বলে স্থির করেন।

নারী বিপ্লবীরা যে অনেকদিন ধরে প্রত্যক্ষ কাজে যোগ দেবার দাবী জানিয়ে আসছে তা তাঁর প্রায়ই মনে পড়ে। এবার একজন নারীকেই ক্লাব আক্রমণের নেত্রী করবেন বলে তিনি ঠিক করেন। এই সিদ্ধান্তের পর কিছুদিনের মধ্যে আক্রমনের ব্যবস্থা নিখুঁত করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশ ও তদারকি করার উদ্দেশ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর মাষ্টারদা কাট্টলী চলে আসেন এবং প্রীতিলতাকেও সেখানে আনা হয়। তাকে জানিয়ে দেন পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করা হবে এবং এর নেতৃত্বভার তাঁকেই গ্রহণ করতে হবে। প্রীতিলতা ভেবেছিলেন দলগতভাবে অথবা অন্য কারো সাথে অভিযানে যাবেন কিন্তু তাঁর একটা অভিযানের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে তা তিনি কখন ভাবেননি। এত বড় দায়িত্ব কি সে পালন করতে পারবে- এমন দ্বিধা তাঁর মনেও এসেছিল, কিন্তু তাঁর দ্বিধা দূর হয়ে যায় যখন তিনি দেখেন প্রধান নেতা তার দিকে গভীর বিশ্বাসে তাকিয়ে আছেন। তিনি তাঁকে প্রণাম করে বলেন যেন সে সফল হতে পারে।

আক্রমণের আগে প্রীতিলতা দেশের মানুষের কাছে একটি আবেদন রচনা করেন। নারী হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাবার কৈফিয়ত দিতেই তাঁর এ রচনা। মাষ্টারদাকে সে লেখা দেখালে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি ঠিক করেন প্রীতিলতার আবক্ষ ফটো দিয়ে ভারতীয় রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার পক্ষ থেকে একটি ইস্তেহার হিসেবে লাল কাগজে ছাপিয়ে ঘটনার দিন সারা জেলায় বিলি করা হবে।

“আমি বিধিপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে, প্রতিষ্ঠানের উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া অত্যাচারীর স্বার্থ সাধনের প্রয়োগকারী সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের উচ্ছেদ সাধন করিয়া আমার মাতৃভূমি ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করিতে ইচ্ছুক আমি সেই ভারতীয় রিপাবলিক আর্মির চট্টগ্রাম শাখার একজন সদস্য।

এই বিখ্যাত “চট্টগ্রাম শাখা” দেশের যুবকদের দেশপ্রেমকে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করিয়াছে।স্মরণীয় ১৯৩০-এর ১৮ই এপ্রিল এবং উহার পরর্বতী পবিত্র জালালাবাদ ও পরে কালারপোলা,ফেনী, ঢাকা, কুমিল্লা, চন্দননগর ও ধলঘাটের বীরোচিত ভারতীয় মুক্তকামী, বিদ্রোহীদের মনে এক নূতন প্রেরণা জাগাইয়া তুলিয়াছে।

আমি এইরূপ গৌরবমন্ডিত একটি সঙ্গের সদস্যা হইতে পারিয়া নিজেকে সৌভাগ্যবতী অনুভব করিতেছি।

আমার দেশের মুক্তির জন্যই এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ।

বিপ্লবীদের হত্যা করা হচ্ছে

বৃটিশ জোরপূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। ভারতের কোটি কোটি রক্তশোষণ করিয়া তাহারা দেশে নিদারুন দুর্দশার সৃষ্টি করিয়াছে। তাহারাই আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের এবং সফল অধঃপতনের একমাত্র কারণ। সুতরাং তাহারাই আমাদের একমাত্র শত্রু। স্বাধীনতা লাভ করার পথে তাহারাই আমাদের একমাত্র অন্তরায়। যদিও মানুষের জীবন সংহার করা অন্যায়, তবুও বাধ্য হইয়া বড় বড় সরকারী কর্মচারী ও ইংরেজদের জীবন সংহার করিতে আমরা অস্ত্রধারণ করিয়াছি। মুক্তিপথের যে-কোনও বাধা বা অন্তরায় যে-কোনও উপায়ে দূর করার জন্য আমরা সংগ্রাম করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আমাদের দলের মহামান্য ও পূজনীয় নেতা মাষ্টারদা অদ্যকার এই সশস্ত্র অভিযানে যোগ দিবার জন্য যখন আমাকে ডাক দিলেন, তখন আমি নিজেকে যথেষ্ট সৌভাগ্যবতী মনে করেছিলাম। মনে হইল, এতদিনে আমার বহু প্রত্যাশিত অভীষ্ট সিদ্ধ হইল এবং সম্পূর্ণ দায়িত্ব লইয়া আমি এই কর্তব্যভার গ্রহণ করিলাম। এই উন্নত ব্যক্তিত্ববিশিষ্ট নেতৃত্ব যখন আমার মত একটি মেয়েকে এই গুরুভার অর্পণ করেন তখন এতগুলি কর্মঠ ও যোগ্যতর ভাইয়েরা বর্তমান থাকিতে অভিযানে নেতৃত্বের ব্যাপার একজন ভগিনীর কেন ন্যস্ত হইবে, এই বলিয়া আমি আপত্তি জানাইলাম এবং একজন সাধারণ কর্মী হিসাবে ঐ কাজে যাইতে চাহিলাম।

কিন্তু পরে আমি পূজ্য নেতার আদেশ শিরোধার্য করিয়া লইলাম।…

আমি মনে করি যে আমি দেশবাসীর নিকট আমার কাজের কৈফিয়ত দিতে বাধ্য। দুর্ভাগ্যবশত এখনও হয়ত আমার প্রিয় দেশবাসীর মধ্যে এমনও অনেক আছেন,যাঁহারা বলিবেন যে-ভারতীয় নারীত্বের ঊর্ধ্বতন আদর্শে লালিত একটি নারী কি করিয়া নরহত্যার মত এই ভীষণ হিংস্র কাজে লিপ্ত হইল।

দেশের মুক্তি সংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না? ইতিহাসে অনেক উদাহরণ আছে,রাজপুত রমণীরা সাহসের সহিত রণাঙ্গনে যুদ্ধ করিতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করিতেন না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা এইরূপ আরও কত নারীর বীরত্বগাথায় পূর্ণ। তবে কেন আমরা আজিকার ভারতীয় নারীরা বিদেশী দাসতব-শৃঙ্খল হইতে নিজের দেশকে পুনরুদ্ধার করিবার জন্য এই মহান যুদ্ধে যোগদান করিব না? যদি বোনেরা ভাইদের সঙ্গে কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দিতে পারে, তবে সশস্ত্র বিদ্রোহে যোগদানে তাহাদের বাধা কি? সশস্ত্র বিদ্রোহে অন্য দেশে বহু নারী যোগদান করিয়াছে, তবে কেন ভারতীয় নারীরা বিপ্লবের এই পন্থাকে অন্যায় বলিয়া মনে করিবে?

পত্রিকায় চট্টগ্রাম বিদ্রোহের খবর

নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে তাহারা আর পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না। নিজ মাতৃভূমির মুক্তির জন্য যে কোনও দুরূহ বা ভয়াবহ ব্যাপারে ভাইদের পাশাপাশি দাঁড়াইয়া সংগ্রাম করিতে তাহারা ইচ্ছুক-ইহা প্রমাণ করিবার জন্যই আজিকার এই অভিযানের নেতৃত্ব আমি গ্রহণ করিতেছি।

আমি ঐকান্তিকভাবে আশা করি যে, আমার দেশের ভগিনীরা আর নিজেকে দুর্বল মনে করিবে না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহে ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন-এই আশা লইয়া আমি আজ এই আত্মদানে অগ্রসর হইলাম”।

(স্বাক্ষর) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
২৩শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২

প্রীতিলতার নেতৃত্বে যে সব বিপ্লবীকে ঐ আক্রমণ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হয় তারা ছিলেন – শান্তি চক্রবর্তী, কালী দে, প্রফুল্ল দাস, সুশীল দে, মহেন্দ্র চৌধুরী, বীরেশ্বর রায় ও পান্না সেন। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা আক্রমণের সময় স্থির করা হয়েছিল। তারিখটি নিয়ে দ্বিমত দেখা যায় বিভিন্ন জনের লেখাতেই। কেউ বলেন “২৩ সেপ্টেম্বর” কেউ বলেন “২৪ সেপ্টেম্বর”। আমি আমার পূর্বের লেখাতেও ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের তারিখ “২৪ সেপ্টেম্বর” হিসেবেই লিখেছি। তার কারণ গবেষণায় দেখেছি যে বাংলার বিভিন্ন লেখকের লেখাতে ব্যবহৃত “২৩ সেপ্টেম্বর” দুটি কারণে আমার কাছে বিচ্যুতি বলে প্রতীয়মান হয়েছে, ১) সম্রাট বনাম সূর্যসেন মামলার বাদী পক্ষের ৩০ নং সাক্ষী ইন্সপেক্টর ম্যাকডোনাল্ড তার সাক্ষে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করেছেন “২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২”। এটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে তার কারণ একজন ইংরেজ ইংরেজী তারিখ ভুল বলবার কথা নয় যেখানে সে সময়ে বাঙালীর মাঝে বাংলা তারিখের চল ছিল বেশী। ২) ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় ক্লাবে বিশেষ তাস খেলার আয়োজন ছিল। সেদিনটি ছিল শনিবার। পাশ্চাত্যে “Saturday Night” সাপ্তাহিক আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবেই পালন করা হতো, এখনও হয়। তাই “২৪ সেপ্টেম্বর” আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেকে মনে করেন ২৩ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ হয়েছিল রাত দশটার পরে এবং অপারেশন শেষ করতে মধ্যরাত পেরিয়ে গিয়েছিল তাই প্রীতিলতা মৃত্যুবরণ করেন মধ্যরাতের পরে আর সে কারণে তাঁর মৃত্যু দিন ২৪ সেপ্টেম্বর। এই যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা আমি পাই না কারণ ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ ছিল ঝটিকা আক্রমণ, কয়েকজনের সাক্ষ থেকেই জানা যায় ঘটনা ঘটার সময় রাত ১০:৪৫ এর কাছাকাছি সময়। তাহলে গেরিলা কায়দায় ঘটনা তড়িৎ ঘটেছিল বলে সেখানে অন্তত দেড় ঘন্টা সময় নেবার প্রয়োজন পড়ে না আর পটাশিয়াম সায়ানাইডের বিষক্রিয়া তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটায় বলে প্রীতিলতার মৃত্যুও সাথে সাথে ঘটেছিল বলেই প্রতীয়মান হয়।)

যুদ্ধে শহীদ বিপ্লবীদের মরদেহ

ক্লাব আক্রমণে একজন মুসলিম বাবুর্চি সাহায্য করেন। বিপ্লবীদলের নির্দেশ মতো ক্লাবের দরজা, জানালার সংখ্যা, প্রবেশ ও বের হবার পথ, কখন ইংরেজ অফিসাররা মদ খেয়ে নাচতে নাচতে অসতর্ক থাকবে, ক্লাব পাহারায় নিযুক্ত সশস্ত্র পুলিশের সংখ্যা কত এসব খবর তিনি সঠিকভাবে দেন। আক্রমণের আগে তার রান্নাঘরের ছোট জানালা থেকে টর্চের আলো দিয়ে বিপ্লবীদের কেমন করে আক্রমণ শুরু করার সংকেত দেবেন তাও বলে দেন।

আক্রমণে যাবার জন্য প্রীতিলতা ও তার সাতজন সহযোগী তৈরি হলেন। খাকী সামরিক পোষাকে সজ্জিতা প্রীতিলতার কোমরে চামড়ার কটিবন্ধে গুলিভরা রিভলবার ও চামড়ার খাপে ভরা গোর্খা ভোজালী। পায়ে মোজা ও বাদামী রং এর ক্যানভাসের রাবার সোলের জুতা। মাথার লম্বা চুল বেঁধে তার উপরে বাঁধা হয়েছে সামরিক কায়দায় পাগড়ী। অনান্য বিপ্লবীদের হাতে রাইফেল, কোমরে রিভলবার, ভোজালী, কাঁধের ঝোলায় বোমা। সবার শেষে প্রীতিলতা সূর্য সেনকে প্রণাম করে রওয়ানা হলেন। তিনি তাদের বিজয়ী হবার জন্য আশীর্বাদ করলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লাবের কাছাকাছি পূর্ব নির্ধারিত স্থানে এসে দলটি অপেক্ষা করতে লাগলো টর্চলাইটের সংকেতের জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টর্চের আলোর তিনবার সংকেত পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিলতা ‘চার্জ’ বলে নির্দেশ দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে গেলেন। গুলি ও বোমার শব্দ পেয়ে এবং কারা এই আক্রমণ করেছে বুঝতে পেরে পাহারাদার পুলিশেরা ভয়ে পালিয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রীতিলতা তার দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে হুইশেল দিয়ে সকলকে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দিলেন।

সাময়িক নিয়মে আক্রমণের সময় নেতা থাকবে সবার আগে এবং ফিরবার সময় সাথীদের এগিয়ে দিয়ে নেতা যাবে সবার পেছনে এই নিয়ম মেনে বিপ্লবী সাথীদের পিছনে বিজয়িনী প্রীতিলতা ক্লাবের সামনে রেলের বড় সড়কে এসে উঠলেন। আক্রমণের সময় কিছু ইংরেজ অফিসার বিভিন্ন দরজা দিয়ে বাইরে পালিয়েছিল। তাদেরই একজন লুকিয়ে ছিল ক্লাবের পশ্চিম দিকের নালার মধ্যে। সে লক্ষ্য করলো বিপ্লবীরা কাজ শেষে ফিরে যাচ্ছে। সে গুলি করলো, তা প্রীতিলতার গায়ে লাগল। এই রকম অভিযানে বিপ্লবীদের সাথে দেয়া হতো পটাসিয়াম সায়ানাইডের ছোট ছোট প্যাকেট। বিশেষ করে মেয়েদের উপর নির্দেশ থাকতো ধরা পড়বার আগেই তা খেয়ে ফেলতে। গুলিতেই প্রীতিলতার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল কিন্তু আরো নিশ্চিত আরো দ্রুত সেটা করার জন্য তিনি পকেট থেকে বিষের মোড়ক খুলে খেয়ে ফেললেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদের দেহ রাস্তায় পড়ে রইলো।

কিছু সময় পর সাহসে ভর করে পুলিশ, মিলিটারী, গোয়েন্দা কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে আসে। প্রথমে প্রীতিলতার পোষাক দেখে তারা ধারনা করতে পারে নি যে এটি কোন নারীর মৃতদেহ। সরকারী ভাবে তাকে মৃত বলে ঘোষনা করলে মৃতদেহ পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠান হলো।

ক্লাব আক্রমণের পরে কলকাতায় ইংরেজদের প্রধান দৈনিক “ইংলিশম্যানে” এই অভিযানের যে বিবরণ প্রকাশিত হয় তাতে বলা হয় এই অভিযানে ৫৩ জন ইংরেজ নরনারী হতাহত হয়। পত্রিকার সংবাদদাতা প্রীতিলতার সাহসকে প্রশংসা করে ‘অসম সাহসীকা’, ‘বীর নারী’ ইত্যাদি বিশেষণ প্রয়োগ করেছিলেন। এইসব দেখে কলকাতার বৃটিশ এসোসিয়েশন প্রবল প্রতিবাদ করায়, ওই সাপ্তাহিকের পরবর্তী সংখ্যায় দুঃখ প্রকাশ করে ঐ বিশেষণগুলো প্রত্যাহার করে নেয়।

প্রীতিলতা সনাক্ত হবার পর তাঁর পরিবার ও তাঁর কাকাদের পরিবারের উপর পুলিশ অত্যাচার করে। বিপ্লবী সন্দেহে শহর থেকে প্রায় ১০০ ছাত্র ও তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু তারা কিছু জানতে পারে না। প্রীতিলতার সাথী বিপ্লবীদের কারো নাম পর্যন্ত খুঁজে পায় না ব্রিটিশ পুলিশ। প্রতিহিংসায় তারা প্রীতিলতার বাবাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। তার ফলে বাকী জীবন তাকে গৃহ-শিক্ষাকতা করে জীবিকা অর্জন করতে হয়। তার মা সংসার চালাবার জন্য বাধ্য হয়ে পারিবারিক আভিজাত্য ত্যাগ করে ধাত্রীর কাজ করেন।

প্রীতিলতা সফল আক্রমণে শ্মশানে পরিণত করলেন ক্লাবঘরকে। কিন্তু ইংরেজদের গুলিতে তিনি আহত হলেন এবং দেশমাতৃকার মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করলেন। এই আত্মত্যাগ বছরের পর বছর ধরে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, আজও করছে। যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

স্বদেশমুক্তির দীক্ষায় দীক্ষিত এমন সাহসী লড়াকু নারী সংগ্রামী, যেমন কল্পনা দত্ত, তেভাগা সংগ্রামের ইলা মিত্র, অপর্ণা পাল রায়চৌধুরী, হেনা দাস, রাসিমনি, এমনি তেজস্বী বহু নারী জীবনসংসার বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের অধিকার আদায়ে। আজও যারা এই নারী প্রগতির কথা স্মরণ করে নিরন্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামিল এবং সারা দুনিয়ার মতন বাংলাদেশেও উচ্চকিত, এমনই সময়ে মৌলবাদী ধর্মান্ধ অপশক্তির চিহ্নিত মহল নতুন চক্রান্তে আগ্রাসী মতলব নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে এবং দেশের সরলপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় মত্ত। আজ প্রযুক্তি বিজ্ঞানের অভাবিতপূর্ব অগ্রগতির কালে পৃথিবী যখন এগিয়ে চলেছে, তখন মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বসে নেই, তারাও তৎপর। অথচ ঐ কপট গোষ্ঠীকে প্রতিরোধে আমরা নির্লিপ্ত। কিন্তু কেন?
এমন অবস্থায় আমরা যাঁদের অনুপ্রেরণা ও সাহসে বলীয়ান হ’য়ে লড়তে শিখেছি, তাঁদের স্মরণেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তাই বলে আজও কেন দেশমাতৃকার বিপন্নাবস্থায় নিষ্ক্রিয় থাকবো? আসুন, আমরা একত্রিত হই। নিজেদের সংগঠিত করি সেই পূর্বসুরীদের স্মরণের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির আদর্শে।

ছবি: গুগল