প্রেমজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

উম্মে শায়লা রুমকী

এক.

সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রবিন  বললো,মা, ফোন করে ছিলো।তোমাকে ক’দিন বাড়ি গিয়ে থাকতে বললো।যাবে?

তিশার শ্বশুড় বাড়ি ফরিদপুর।বিয়ের পর থেকেই ঢাকা থাকে।খুব একটা যাওয়া হয় না।শ্বাশুড়ি মা তিশাকে খুব ভালোবাসেন,তাই অন্য দেবরের চাইতে ঢাকায় ওর বাড়িতেই বেশি থাকেন।শ্বশুড় মারা যাবার পর তিশার কাছেই থাকতো।ছেলে মেয়ে দু’টোকে উনিই বড় করে দিলেন।

তিশার বড় ছেলেটার বিশ বছর আর মেয়েটার আঠারো।পিঠাপিঠি দুই ভাইবোনকে মানুষ করতে শ্বাশুড়ি মায়ের অবদান অনেক বেশি।

আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগে এই সংসারের হাল ধরেছিলো তিশা।তখন তার বয়স মাত্র আঠারো।কলেজ পাশ করেছে কেবল, বাংলা সাহিত্য পড়ার ইচ্ছা।টুকটাক লিখতে শুরু করেছে,কবিতা,ছোট গল্প,মাঝে মাঝে নিজের লেখা গানে সুর দেবার চেষ্টা!বন্ধুরা খুব প্রশংসা করতো।মনে মনে লেখক হবার ইচ্ছেরা পাখা মেলতে লাগলো।

কিন্তু মানুষ যা চায়,সবসময়ই কি তা পাওয়া যায়?বাবা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। মা চলে গেছেন কর্কট রোগে অনেক আগেই।ফুফুদের কাছে মানুষ।তাই বাধ্য হয়ে বড় ফুফুর পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়েটা হয়ে গেলো ধুমধাম করে!

লোকে বলে কপালে সুখ থাকলে ঠেকাবে কে?তিশার তাই হলো।শ্বাশুড়ি মায়ের আদরে নিজের মায়ের কথা ওর তেমন মনে পড়তো না,বাবার শোকও কাটিয়ে উঠলো দ্রুত। ভালো ছেলে বলতে যা বোঝায়,রবিন সেরকমই একজন।

দু’জনের মধ্যে প্রেম হতে বেশি সময় লাগলো না। রবিনের অনুপ্রেরণায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে স্নাতক  পড়তে শুরু করলো বাড়ির কাছের এক কলেজে।

বিয়ের বছর দু’য়েকের মধ্যে বড় ছেলেটা পেটে এলো।

লেখাপড়া, সংসার আর নতুন মাতৃত্বের স্বাদ সব মিলিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলো তিশা।

সেই সময় থেকে হাল ধরলো শ্বাশুড়ি।

বড় ছেলে জন্মের বছর দু’য়েক পর মেয়েটার জন্ম।রবিনের উৎসাহে কোনো রকম পড়াটা শেষ করলো,কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল সেরকম আনন্দদায়ক হলো না।মাস্টার্স করার আগ্রহটা হারিয়ে ফেললো। স্বামী, সন্তান আর শ্বাশুড়ি মায়ের সেবা করে জীবনটা কেটে যাচ্ছিলো,কবিতা আর ছোট গল্পরা সব হারিয়ে গিয়ে হাওয়ায় মেলালো।

যাপিত জীবনে তিশা খুব সুখী। ছেলে মেয়ে দুটো লেখাপড়ায় বেশ ভালো,তাদের একাডেমিক ফলাফল আশানুরূপ।সবাই তিশার প্রশংসা করে।মায়ের দায়িত্ব,ছেলের বউর দায়িত্ব, স্ত্রী হিসাবে রবিনের দায়িত্ব সবই ঠিকঠাক মতন পালন করে তিশা।

আত্মীয় স্বজন প্রশংসায় পঞ্চমুখ সর্বদা।

রবিনও চমৎকার ছেলে। ‘বিবাহিত জীবনের স্বাদ,কোথাও রাখেনি কোনো খাঁদ’ কবিতার এই লাইনের মতো তাদের জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই।স্বামী হিসাবে সমাজের ছেলেরা যে দায়িত্ব পালন করে রবিন তার চাইতে অনেক বেশি করছে।

ছেলের কোচিং ক্লাসের বাইরে সব মায়েরা যখন গল্পের আসরে স্বামী,শ্বাশুড়ির বদনাম করতো,তিশা বলার মতো কিছুই খুঁজে পেতো না। তিশার সুখের সংসার দ্রুত অনেকের মর্মবেদনার কারন হয়ে গেলো।  তবু সে বদনাম করার মতন কোনো কারন পেলো না।

তাই ভাবী আপাদের গ্রুপটা ছেড়ে দিলো।

ছেলে মেয়ের যত্ন, তাদের নিত্যদিনের নিয়ম কানুনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তিশার তেমন কোনো অবসর মিলতো না। যেটুকু সময় পেতো,বই পড়ে আর ফেইসবুকের সাহিত্য গ্রুপে ঘোরাঘুরি করে কেটে যেতো।

গত মাসে শ্বাশুড়ি তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিজের বাড়ি চলে গেছেন। এখানে আর মন টিকছে না। নাতী দু’টো ছিলো তার কলিজা। গতমাসে দুজনই কানাডাতে ফুফুর কাছে চলে গেছে। একজন ওখানকার একটা হাইস্কুলে স্কলারশিপ পেয়ে পড়তে গেছে,আরেকজন পরীক্ষা শেষে তিন মাসের জন্য বেড়াতে।

রবিন নিজস্ব একটা কনসালট্যন্সি ফার্ম খুলেছে,ভীষন ব্যস্ত। আগে চাকুরী করতো, বাসায় সময় দিতে পারতো। এখন নিজের ব্যবসা,বাড়ি ফেরার টাইমটেবল নেই।ক্লায়েন্টদের খুশি করতে ব্যস্ত থাকতে হয়!বাড়িতে বুড়ো শ্বাশুড়ি আর মধ্যবয়স্কা বউর সময় কাটানো কঠিন হয়ে পড়লো।

শ্বাশুড়ি তল্পিতল্পা গুছিয়ে সকাল বেলাই ফরিদপুর চলে গেলেন।যাবার আগে বলে গেলেন, বউমা,এ পোড়া বাড়ি ছেড়ে দাও,আমার সঙ্গে চলো।ছেলেমেয়ে ছাড়া এ বাড়িতে থাকবে কি করে?

আপনার ছেলের খাবার কষ্ট হবে,একা থাকবে কি করে?

কি জানি বাপু! আমি পারবো না। আমায় যেতে দাও।

তিশা না করেনি। সারাদিন একা একা বাড়িতে থাকতে ওর একদম খারাপ লাগে না।বরং এ জীবনকে ওর নতুন আর আর্কষনীয় লাগে।অফুরন্ত অবসরে বসে বসে জীবনানন্দ আর রবী ঠাকুরকে আবিষ্কার করে।

ফেইসবুকে নানা সাহিত্য গ্রুপে নতুন নতুন কত লেখা পড়ে!নতুন লেখক,কবি ওকে চুম্বকের মতো টানে!কত মানুষের কত রকম প্রতিভা,কত কি জানে!!

টুকটাক দু একজন কবির সাথে মেসেন্জারে, হোয়াটস অ্যাপে কথা হয়,কত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়,নতুন নতুন কত বিষয় জানতে পারে!

তিশার ভালো লাগে!এ জীবন এতোদিন কোথায় ছিলো?তিশা লিখতে শুরু করে। একদিন একটা ছোট গল্প লিখে ফেললো। সংশয় আর লজ্জা নিয়ে রবিনকে দেখালো।রবিন পড়ে বললো,ভালোই তো লিখেছো! লিখতে থাকো।আসছে বইমেলায় তোমার বই বের হওয়া উচিত!

তিশার ভালো লাগলো না। প্রশংসা না টিপ্পনী বুঝতে পারলো না।

রবিন খুব ভালো ছেলে,বরাবরই ওকে উৎসাহ দিয়ে থাকে,রান্নার প্রশংসা করে, ছেলে মেয়েদের জন্য তিশার অবদানের কথা আত্মীয় আর বন্ধুমহলে  ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তিশাকেই মহান করে তোলে।

এই যে রাত জেগে লেখালেখি করে, মেসেন্জারে বন্ধুদের সাথে আলোচনা চলে,রবিন এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না।হেসে বলে,জীবনটা উপভোগ করো।।সংসারের জন্য তো অনেক কিছুই করলে।

নতুন এই প্রাণ ভরিয়ে দেয়া জীবনের হাতছানি তিশাকে আকুল করে। শ্বাশুড়ি মা ভাবে,হতভাগী!না জানি কেমনে একা একা থাকে!

তাই দু’দিন পর পর ফোনে একটাই আব্দার!এখানে এসে থাকো।

এবার ছেলেকে ধরেছে। বউমাকে রাজি করাতে!!

তিশা হেসে বললো, একটা নতুন গল্প লিখছি। ক’দিন পরে যাই?মা কে বুঝিয়ে বলো,আমি ভালো আছি।

ঠিক আছে।

আচ্ছা শোনো!তোমাকে তো বলতে ভুলে গেছি!একটা ক্লায়েন্ট আছে চট্রগ্রামে, আজ রাতের ফ্লাইটে যেতে হচ্ছে!দু তিন দিনের ব্যাপার! একা থাকতে পারবে?

হুম। পারবো।

আগে কখনো একা থাকতে হয়নি। রবিন অফিসের কাজে বাইরে গেলেও মা আর বাচ্চারা কাছেই থাকতো।

এই প্রথমবার একা থাকতে হবে!কি আশ্চর্য!!

একা থাকার স্বাধীনতায় হৃদয় যেনো অন্য আলোয় আলোকিত হয়ে গেলো। অরিত্র ধরকে মনে পড়ছে!!

মোবাইলের টুং শব্দে তাকিয়ে দেখলো,ম্যসেন্জারে অরিত্র।

কি লিখেছে? নতুন কোনো কবিতা?তর সইছে না যে! (চলবে)

ছবি: সজল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]