প্রেমে-অপ্রেমে ডিলান ও বায়েজ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ব্রিটেনে ১৯৬৫ সালে এক গানের মঞ্চ আলোয় ঝকঝক করছে। উত্তাল হয়ে উঠছে শ্রোতাদের আবেগ। একটু পরেই পাদপ্রদীপের আলোয় এই মঞ্চে উদ্ভাষিত হয়ে উঠবেন বব ডিলান আর জন বায়েজ। কিন্তু তখন মঞ্চের গ্রিনরুমে ভিন্ন নাটকের দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে। গ্রীনরুমে ছড়িয়ে আছে ড্রাগস আর সিগারেট। গানের দু’জন রাজা রাণী বসে আছেন। নেশার দাপট তখন রাজত্ব বিস্তার করেছে ডিলানের শরীর আর মনে।

মঞ্চে ওঠার ডাক এলো। স্ট্র্যপে ঝোলানো গিটার কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন ডিলান। তার সঙ্গে সেদিন গান গাইবার কথা বায়েজেরও। কিন্তু সেদিন সেই গ্রিনরুমে স্ক্রিপ্টটা ছিলো অন্যরকম। বব ডিলান বায়েজের সঙ্গে গান গাইতে রাজি হলেন না। দুজনের মাঝে গভীর ভালোবাসা টপকে সামনে এসে দাঁড়ালো ঈর্ষার ছুরি যা সবকিছু কেটে তছনছ করে, সামনে এসে দাঁড়ালো জনপ্রিয়তার লোভে অন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদয়, যা কেবলই ভেঙে ফেলে। এই শো তার একার, বায়েজের প্রয়োজন নেই তার সঙ্গে গান গাইবার, কথাটা খুব অনায়াশে বলে দিলেন ডিলান। সেদিন ডিলানের মুখে ‘গো হোম’ শুনে আর দাঁড়াননি ফোক গানের রানী জন বায়েজ। গ্রীনরুম থেকে তার আহত ছায়া ফিরে চলে গিয়েছিলো। তাদের ভালোবাসার ওপর পর্দা নেমে এসেছিলো। দুপুরেই তৈরি হলো অদ্ভুত আঁধারের গ্রাস। নিভলো প্রেমের মোমবাতি।

তারপর? তারপর জীবনের নানা আলোড়ন তোলাপাড় করেছিলো বব ডিলানকে। ভালোবাসার খোঁজে মনের ডুবুরি নেমেছিলো অতলান্তে। কিন্তু মিলেছিলো কি ভালোবাসা? সেই গানের কথায় ভালোবাসার সেই মানুষ বায়েজ মনের মধ্যে ঢেউ তুলে গেছে হয়তো অনেকটা সময়-‘‘ইফ ইউ মিস দিস ট্রেন আই অ্যাম অন, দেন ইউ উইল নো দ্যাট আই অ্যাম গন’’। মনের মধ্যে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া ডিলান হয়তো তাই ৪৪ বছর পর ২০০৯ সালে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন জোন বায়েজের কাছে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো বব ডিলান আর জন বায়েজের সেই ভালোবাসার গল্প ‘প্রেমে-অপ্রেমে ডিলান ও বায়েজ।’

১৯৬১ সালে জন বায়েজের গানে বুঁদ হয়ে আছে গোটা বিশ্বের শ্রোতারা। শান্ত চোখ তার দেখে ফেলছে শ্রোতাদের আত্মার গভীর তলদেশ। গিটার কাঁধে জন বায়েজ তখন নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলছেন ফোক গানকে। প্রতিবাদ মিশে যাচ্ছে তার গানে। শ্রোতারা অবগাহন করছেন সুরের নতুন এক সমুদ্রে।আফিমের মতো তীব্র নেশার টান ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

এক সন্ধ্যায় মঞ্চে উঠেছেন জন বায়েজ। তার কন্ঠ আর সুর অস্থির করে তুলছে জড়ো হওয়া মানুষদের। সেই ভিড়ের মধ্যেই মিশে আছে কুড়ি বছরের যুবক।সে-ও গান লিখতে চায়,আন্দোলিত করতে চায় শ্রোতার হৃদয়। গান লিখতে আত্মবিশ্বাসী সেই যুবককে টানে বায়েজের গান-‘কেয়ারলেস লাভ’। সে ঠিক করে একদিন কথা বলবে এই সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গে। সেই যুবকটির নাম বব ডিলান।

দু’জনের দেখা হওয়াটাও ঘটে গেলো খুব সহজেই। ডিলান বায়েজকে প্রস্তাব দিলেন তিনি গান লিখতে চান। রাজি হয়ে গেলেন ফোক গানের রানী জন বায়েজ। একের পর এক গান লিখে তাকে দিতে শুরু করলেন ডিলান। সুর আর গাওয়ার দায়িত্ব নিলেন বায়েজ। গড়ে উঠলো এক আশ্চর্য মেলবন্ধনের গল্প। সে সময়ে বব ডিলান নিজেও পথ হাঁটছিলেন ভাঙচুরের ভেতর দিয়ে। প্রেমিকা সুজি রটালো সদ্য তার জীবন থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে গেছেন ইতালিতে। আমেরিকায় ডিলানের জীবন নিঃসঙ্গ, ভালোবাসা ভেঙে যাওয়ার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত। প্রাণপনে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছিলেন বব ডিলান। ১৯৬৩ সালে তিনি লিখে ফেললেন সেই দুটি বিখ্যাত গান, ‘ডোন্ট থিংক টোয়াইস’ আর ‘আই শ্যাল বি ফ্রি’। শ্রোতাদের মন উন্মাতাল হয়ে উঠলো ডিলানের এই গান শুনে। কিন্তু ব্যক্তি জী্বনে কি মুক্ত হতে পারলেন তিনি? না, ততদিনে বাঁধা পড়ে গেছেন তিনি অন্য ভালোবাসায়। কষ্ট আর শূন্যতার অনুভূতি থেকে বের হয়ে আসতে গিয়ে তিনি তখন আঁকড়ে ধরেছেন বায়েজকে।

দু’জনে তখন একসঙ্গে তোলপাড় করে ফিরছেন আমেরিকা। সেখানে মঞ্চে, ক্যাফেতে শুধুই এই দু’জনের নাম। তরুণদের মনে ঝড় তুলে দিয়েছেন এই যুগল। গণমাধ্যমে আর খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় তখন এই দু’জনকে নিয়ে তোলপাড়। সবার মুখে একই গল্প, বায়েজ আর বব ডিলানের ভালোবাসা। কিন্তু সেই সম্পর্কের কথা তারা দু’জনেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।

ভালোবাসার সুগন্ধে ভরে ওঠা বায়েজ আর ডিলানের জীবনে ঠিক তখনই ফিরে এলেন সুজি। ইতালি থেকেই এই সম্পর্কের কথা জেনেছিলেন তিনি। আমেরিকায় ফিরে দেখলেন তাকে ছাড়াই জন বায়েজের সঙ্গে ঘর গুছিয়ে নিয়েছেন ডিলান। সুজি সোজা চলে গেলেন ডিলানের ফ্ল্যাটে। নিজের ছেড়ে যাওয়া জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠলেন নতুন বাড়িতে। তখন ডিলালেনর নতুন অ্যালবাম বের হয়েছে, ‘আই ডোন্ট বিলিভ ইউ’। একটা অ্যালবাম উড়িয়ে দিলো শ্রোতাদের ঘুম। সুজিও যেন তার উত্তর খুঁজে পেলেন ডিলানের গানে; তাদের ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে।

বায়েজের গান মানেই তখন প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়। তিনি গান গেয়ে ফেরেন প্রতিবাদ সমাবেশে, মিছিলে, জমায়েতে। ডিলান কিন্তু নিজেকে ধরে রাখলেন গান লেখায়। আর তাতে তার সুখ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকলো আরও দ্রুত। আর একটা সময়ে তা টপকে গেলো বায়েজের ছায়াকেও। বব ডিলানের সামনে একের পর এক খুলে যাচ্ছে খ্যাতির দরজাগুলো। আর তিনি উজ্জ্বল সোপান বেয়ে উঠে যাচ্ছেন উপরে। এই উত্থানের গল্পটাই আসলে কমিয়ে দিলো দু’জনের একসঙ্গে দাঁড়াবার জায়গা। খ্যাতির পাহাড় আড়াল ফেলে দেয় অনেক কিছুর মাঝে। ডিলান আর বায়েজের মাঝেও দুটি আলাদা পথের সুর বেজে উঠলো। একদিকে মানুষের অধিকার আদায়ের সরব দাবিকে নিজের গানে মেলাচ্ছেন বায়েজ আর অন্যদিকে একের পর এক মঞ্চ তোলপাড় করছেন বব ডিলান।বিচ্ছেদের বীজ তখনই বোনা হয়ে গেলো দু’জনের বোধের মধ্যে। আর তখনই ইংল্যান্ডে ঘটলো সেই ঘটনা। বায়েজ বুঝে নিলেন পথ আলাদা করে নিতে হবে। বব ডিলান সরে গেছেন তার কাছ থেকে। হয়তো তাই ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত অ্যালবামে গাইলেন তিনি, ‘‘লর্ড আই অ্যাম ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’’। আত্মার যন্ত্রণা ঝরে পড়ে তার গানে।

ব্যক্তিগত জীবনে এত ঝড়কে কিন্তু কোনোদিন মিডিয়ার সামনে আনেননি জন বায়েজ। আরও একার ভেতরে একা হয়ে গিয়ে সরিয়ে ফেলেন নিজেকে। বব ডিলানকে দোষারোপও করেননি কোনোদিন। আর ডিলান? নতুন করে সম্পর্ক, বিয়ে ঠিক সেই ঘটনার পরের বছরেই। সংসারও হলো। কিন্তু সেই খ্যাতির বিশাল মহলে আরও যেন একা হয়ে গেলেন। অবশেষে সঙ্গীতের দুনিয়া থেকে খানিকটা স্বেচ্ছাবসর। সেই বৈবাহিক জীবনও টেকেনি তার।ডিভোর্স চেয়েছিলেন তার অর্ধাঙ্গিনী সারা লাউন্ডস।

বেশ অনেক বছর পর নিভৃতবাস কাটিয়ে ফেরা ডিলানের সঙ্গে গান গেয়েছেন বায়েজ। একজন বন্ধু হিসাবেই সেখানে নির্দিষ্ট ছিলো তার ভূমিকা। তার বেশি কিছু না। তবে তাঁদের দু’জনের হাত ধরে আর জন্ম নেয়নি কোনো নতুন গান।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ প্রহর, কলকাতা
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments