প্রেমে পড়েছিলেন উৎপল দত্ত ও জেনিফার কাপুর

উৎপল দত্ত

জেনিফার কিন্ডেল

যৌবনে প্রখ্যাত নাট্যকার উৎপল দত্ত ভালোবেসেছিলেন প্রয়াত শশী কাপুরের স্ত্রী জেনিফার কাপুরকে। তখনও জেনিফার শশীকে বিয়ে করেননি। তথ্যটি অনেকের কাছেই হয়তো অজানা। তবে উৎপল দত্তের একনিষ্ঠ পাঠকরা হয়তো জানেন পঞ্চাশের দশকে তরুণ উৎপল ও তরুণী জেনিফার কেন্ডালের সেই প্রণয়পর্বের কথা
১৯৯৩ সালে উৎপল দত্ত প্রয়াত হওয়ার পর দিল্লিতে তাঁর মেজদা অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার ব্রিগেডিয়ার মিহিররঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে যান উৎপলের স্ত্রী, বিশিষ্ট মঞ্চ অভিনেত্রী শোভা সেন। সেই সময় মিহিররঞ্জন শোভা সেনকে জানিয়েছিলেন উৎপল আর জেনিফারের ভালোবাসার কথা। ‘ওদের তখন প্রেম চলছিল। উৎপল জেনিফারকে ভালবাসত।’। তিনি শোভাকে জানিয়েছিলেন জেনিফারের অনেক চিঠিই তাদের মায়ের কাছে ছিল। তখন শ্রীমতী সেনের উত্তর ছিল, ‘সে সব কথা আমি সবই জানি। সেই সমস্ত চিঠিও আমি দেখেছি। অবশ্যই জেনিফারের সেই সব যৌবনের প্রেমপত্র তাঁর প্রেমিক উৎপলকে লেখা।’
উৎপল দত্ত একাধারে ছিলেন নাট্যকার, লেখক, কবি, ছোটগল্পকার, সমাজবিজ্ঞানী, বেশ কয়েকটি কালোত্তীর্ণ এবং বাণিজ্যিক সিনেমার অমর চরিত্র, বাগ্মী এবং ভারতের নকশাল আন্দোলনের এক অন্যতম পুরুষ। তাঁর রচিত মৌলিক, একাঙ্ক, অনুবাদ নাটক, যাত্রাপালা ও পথ নাটকের সংখ্যা সব মিলিয়ে ১০০-র বেশী। তাঁর রচিত ৯০টি নাটক গ্রন্থাকারে প্রকাশিত। বিশ্ববিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রিচার্ড শেখনার তাঁর ‘ড্রামা রিভিউ’ পত্রিকায় পৃথিবীর তিনজন শ্রেষ্ঠ নাট্যব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম বলে উৎপল দত্তকে সম্মান দিয়েছিলেন। এই চৌকষ মানুষটির প্রথম ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ইতিহাস তাই বলে।আর সেই বিচ্ছেদে কষ্ট পেয়েছিলেন উৎপল দত্ত।
উৎপল দত্ত ১৯৬১ সালের ২৯ মার্চ নিজের ৩২তম জন্মদিনে শোভা সেনকে বিয়ে করেন। আর তাদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ের ঘোষণা দেন বিশ্বখ্যাত পন্ডিত রবিশংকর। কয়েকজন বন্ধু এক বিকেলে জমা হয়েছিলেন রবিশংকরের ফ্ল্যাটে। উৎপল দত্তের সঙ্গে শোভা সেনের বিয়েও তখন যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিলো। ব্যক্তিজীবনের এক চরম সঙ্কটের মধ্যে শোভা সেন ১৯৬১ সালে যাবতীয় মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তাঁর পূর্বতন স্বামী দেবপ্রসাদ সেনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। তারপর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি লিটল থিয়েটার গ্রুপে যোগ দিয়ে নিজের চেয়ে ৬ বছরের ছোট প্রতিভাবান নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তকে বিয়ে করেন। কিন্তু জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের প্রণয়ের বীজ বৃক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে উঁকি দিয়েছিলো সেই ৫০ দশকেই।
উৎপল দত্তের সেই ভাঙ্গা ভালোবাসার সূত্র খুঁজতে আরো কয়েক বছর পিছিয়ে যাই আমরা।

শোভা সেন

১৯৪৭ সালে উৎপলের জীবনে তাঁর গুরু জেফ্রি কেন্ডালের আবির্ভাব। গত শতকের চল্লিশের দশকে ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক জেফ্রি কেন্ডাল একটি ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দল নিয়ে প্রধানত শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ করতে ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি ঘুরে ভারতে আসেন। কেন্ডালের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলে তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রী লরা, দুই কন্যা জেনিফার ও ফেলিসিটি এবং কয়েকজন কুশলী শিল্পী ছিলেন। এঁরা সবাই ছিলেন পেশাদার অভিনেতা–অভিনেত্রী— থিয়েটারই যাঁদের ধ্যানজ্ঞান। ১৯৪৭ সালে উৃৎপল দত্তের বয়স মাত্র ১৮ বছর। তখনই তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের সহপাঠীদের নিয়ে ‘দি অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ানস’ নামে নাট্যদল গঠন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র উৎপলের একটি শেক্সপিয়ার প্রযোজনা দেখে জেফ্রি কেন্ডাল তাঁকে আমন্ত্রণ জানান অভিনয় করতে। উৎপল দত্তের ভাষায়, ‘কলেজ, লেকচার, পরীক্ষা, পাঠ্যপুস্তক প্রভৃতির বিরক্তিকর মায়া’ কাটিয়ে তিনি কেন্ডালের ‘শেক্সপিয়ারিয়ানা’ নাট্যদলে যোগ দিয়েছিলেন। কেন্ডালের তীক্ষ্ণ জহুরির চোখ আসল সোনা চিনতে ভুল করেনি। কেন্ডালের শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণে উৎপল দত্ত কালক্রমে একজন আন্তর্জাতিকমানের পেশাদার অভিনেতা ও পরিচালক হয়ে ওঠেন। কেন্ডালের কন্যা জেনিফার তখন বাবার দলে অভিনয় করেন। হয়তো কাজের সূত্রে কলকাতায় তরুণ উৎপলের সঙ্গে তার চোখের মিলন হয়েছিল। তবে মনের মিলন ঘটতে সময় গড়িয়েছিল আরো কয়েক বছর।
১৯৫৩–৫৪ সালে জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর থিয়েটার দল নিয়ে আবার ভারত সফরে এলেন। উৎপল গুরুর ডাকে সাড়া দিয়ে ভ্রাম্যমাণ শিল্পীদলের শরিক হন। নিজের নাট্যদল লিটল থিয়েটার গ্রুপ থেকে ছুটি নিয়ে উৎপল কেন্ডালের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। আর তখনই কেন্ডালের বড় মেয়ে জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর প্রিয়তম ছাত্র উৎপল দত্তকে নিজের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী বলে মনে করতেন। উৎপলের প্রতি কেন্ডালের এই দুর্বলতা ও অনুরাগ আমৃত্যু অটুট ছিল। তাই কেন্ডাল দম্পতি উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের এই প্রণয় নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন।
উৎপল দত্তের মেজদা ব্রিগেডিয়ার মিহিররঞ্জন দত্ত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার। তিনি কর্মসূত্রে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেন। তিনি যখন দেরাদুনে ছিলেন, তখন জেফ্রি কেন্ডাল সপরিবার তাঁর থিয়েটার দল নিয়ে সেখানে এলে তাদের পচিয় হয়েছিল। এরপর মিহিররঞ্জন সিমলায় বদলি হন।

যখন জেনিফার কাপুর

কেন্ডাল তাঁর নাট্যদল নিয়ে সিমলায় অভিনয় করতে এলে আবার মিহিররঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়। সেই সময় একদিন মিহিররঞ্জন ছোট ভাই উৎপলকে সিমলার একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁতে আমন্ত্রণ জানান। উৎপল তাঁর প্রেমিকা কেন্ডালকন্যা জেনিফারকে নিয়ে সেখানে হাজির হন। মিহিররঞ্জন প্রেমিকা–সহ ছোট ভাইকে সাদরে আপ্যায়ন করেছিলেন। অর্থাৎ দুই পরিবারের মধ্যে এই প্রেমের সম্পর্ক স্বীকৃত ছিল। উৎপল দত্ত জেনিফারকে প্রেমপত্র লিখতেন। তবে সেইসব মূল্যবান প্রেমপত্র আজো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।
উৎপল দত্তের সঙ্গে জেনিফার কেন্ডেলের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। আর সেই আহত ভালোবাসা ক্ষত হয়েই রয়ে গিয়েছিলো দুজনের মাঝে। কেন তাদের প্রেম ভেঙ্গে গিয়েছিলো সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও উৎপল দত্তের মনে এই বিচ্ছেদ গভীর ছাপ রেখে যায়। এমন–কি জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার এক দশক পরেও সেই ক্ষত শুকিয়ে যায়নি। ১৯৫৫ সালের পর উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ১৯৬৫–৬৬ সালে সাত মাস প্রেসিডেন্সি জেলের বন্দিজীবনে উৎপল চারটি অনবদ্য ইংরেজি কবিতা লিখেছিলেন। আর সেই চারটি কবিতার একটি অপ্রকাশিত কবিতায় ফুটে উঠেছে মুছে যাওয়া পুরোনো প্রেমের স্মৃতিতে তিক্ত, ক্রুদ্ধ, যন্ত্রণাময় ছবি। কিন্তু সেই কবিতাটি কেনো আজো আলোর মুখ দেখেনি সেটা অনেকের কাছেই প্রশ্ন। উৎপল দত্তের এক সহযোগী অভিনেতা সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণেও এই প্রসঙ্গ এসেছে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি এক রাতের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘এক রাতে তিনি হাপুস নয়নে কেঁদেছেন। নিজ গুরুকন্যার প্রতি প্রণয়ের ব্যর্থতা তাঁকে তীব্র জ্বালায় জ্বালিয়ে দিয়েছে। অশ্রুপাতে উচ্চকণ্ঠে নাম উচ্চারণ করে জ্বালা জুড়োতে চেয়েছেন।’
উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরেও গত শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় দুজন একসঙ্গে উত্তম–সুচিত্রা জুটির চিরন্তন প্রেমের ছবি ‘সপ্তপদী’তে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সিনেমায় ওথেলো ও ডেসডিমোনার চরিত্রে নেপথ্যশিল্পী হিসেবে উৎপল ও জেনিফারের অভিনয় অনেকেরই মনে থাকার কথা। তার পরেও মার্চেন্ট আইভরি সংস্থার প্রযোজনায় ১৯৭০ সালে ‘বোম্বে টকিজ’ ছবিতে উৎপলের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন জেনিফার কেন্ডাল (কাপুর), অপর্ণা সেন ও শশী কাপুর। অবশ্য তার অনেক আগে ১৯৫৮ সালে জেনিফার বিয়ে করেছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনেতা শশী কাপুরকে। আর তারপরেই জেনিফার সরে আসেন অভিনয় থেকে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আজকাল
ছবিঃ গুগল