ফজলে রাব্বি-নামটার কাছে নত হই আজন্ম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

ডাঃ ফজলে রাব্বি ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছিলেন। সারা পাকিস্তানে সবার চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে, জয় করেছিলেন স্বর্ণপদকও ।১৯৭০ সালে অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি “Pakistan best professor award” এর জন্যে নির্বাচিত হন। কিন্তু পশ্চিমাদের শোষণের প্রতিবাদে তিনি সেই অ্যাওয়ার্ড গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানান। আর সেদিন থেকেই তিনি পরিণত হন শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূলে ।

স্ত্রীর সঙ্গে

২৭ মার্চ,১৯৭১। কিছু সময়ের জন্যে কার্ফু স্থগিত হলে ডাঃ রাব্বি তার স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাসা থেকে। চলে আসেন তার প্রিয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই এলাকায় ঘটে যাওয়া কালরাত্রির নৃশংসতা নিজের চোখে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন তার মেধা দিয়ে দেশের সঙ্কটে কিছু করার । পরবর্তী ৯ মাস অবস্থান করেন ঢাকায়। দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একটিবারের জন্যেও সে কথা না ভেবে কাজ করে যান দেশের জন্যে। কি চিকিৎসায়, কি টাকা-পয়সার প্রয়োজনে, গেরিলা যোদ্ধারা তাকে চেয়ে পায়নি, এমন দিন বিরল !

ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজিস্ট। তাঁর স্ত্রী জাহানারা রাব্বি ১৯৭১ সালের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর একই স্বপ্ন দেখলেন। একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে জিয়ারত করছেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন। ১৫ ডিসেম্বর সকালে তিনি এ স্বপ্নের কথা বললেন ফজলে রাব্বিকে। রাব্বি বললেন, ‘তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ’।

১৫ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। ২ ঘণ্টার জন্যে কার্ফু স্থগিত হলো। সেই সুযোগে স্ত্রীর নিষেধ না মেনে ডাঃ রাব্বি পুরান ঢাকায় এলেন অবাঙ্গালী এক রোগীকে দেখতে । ফেরারসময় দিনের বাজারটা সারতে ভুল করলেন না। তারপর, দুপুরের খাওয়া শেষে দখিন খোলা জানালার পাশে ইজি চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিলেন, স্ত্রী ডাঃ জাহান আরার শত অনুনয়েও রাজী হলেন না কয়েকদিনের জন্যে বাড়িটা ছেড়ে অন্য কথাও যেতে। শুধু বারবার একটা কথাই বলছিলেন সেদিন- “ছেলেরা এসে যদি আমাকে না পায় ? আর মাত্র কটা দিন হয়ত জাহানারা, তার পরেই আমরা বিশ্বের বুকে নাম লেখাবো, দেখো। সকালের ঘুম ভেঙ্গে হাতে হাত রেখে দেখবো স্বাধীনতার লাল সূর্য”।

কথা শেষ না হতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। না, ফজলে রাব্বির যোদ্ধা ছেলেরা নয়, এবার বাড়ি ঘিরে ধরেছে রাজাকার-আল বদরের দল,সাথে পাক সেনারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ফজলে রাব্বিকে নিয়ে চলে গেলো রাজারবাগের দিকে । ৩ সন্তানকে বুকে আঁকড়ে হতবাক দাড়িয়ে রইলেন জাহান আরা। কি হতে যাচ্ছে তা বুঝেও যেন অবুঝ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আর একটা রাত পেরোলেই স্বাধীনতা , কিন্তু সেই সূর্যোদয় আর দেখা হলনা ডাঃ রাব্বির।

১৮ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। রায়েরবাজার বধ্যভুমিতে পাওয়া গেল ডাঃ ফজলে রাব্বির লাশ।১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি দৈনিক আজাদে ডাঃ ফজলে রাব্বির মৃতদেহের বর্ণনা দেওয়া হয়। লেখাটি ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা সূত্রে। তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিখেন- “প্রায় ঘন্টাখানেক। একে একে সবাই এসে এখানে হাজির হচ্ছে। ডা. রাব্বির মৃতদেহটা তখনও তাজা। জল্লাদ বাহিনী তাঁর বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত যে, তিনি চিকিত্‍সক ছিলেন। তাই তাঁর হৃত্‍পিন্ডটা ছিঁড়ে ফেলেছে জল্লাদের দল। চোখ বাঁধা অবস্থায় কাত্‍ হয়ে দেহট পড়ে আছে। ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। রাব্বি সাহেবের পা দুখানা তখনও জ্বলজ্বল করে তাজা মানুষের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নাক-মুখ কিছুই অক্ষত ছিল না তাঁর। হায়েনাদের নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।”

ডাঃ ফজলে রাব্বীদের মত এমন অনেক শহীদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। যারা কর্তব্যের কাছে নিজের জীবনকে দেখেছেন তুচ্ছ করে। প্রাণের ভয়ে, স্ত্রীর শত অনুরোধ সত্ত্বেও যারা পালিয়ে যাননি কর্তব্য ফেলে। বাঙালীর অস্তিত্ব যতদিন ততদিন স্মরণ করবে তার এসব আত্নত্যাগী বীরদের। কারণ তারাতো বাঙালীর অস্তিত্বের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাঃ ফজলে রাব্বি ছিলেন হার্টের ডাক্তার। তাই হত্যা করার আগে পাক বাহিনী তার হৃদপিন্ড ছিঁড়ে এনেছিল। তেমনিভাবে চোখের ডাক্তার ছিলেন বলে আলীম চৌধুরীর চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছিল বেয়োনেট দিয়ে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাক্তার ফজলে রাব্বি ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাবনা শহরের পশ্চিমে ছাতিয়ানি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তোমাদের যা বলার ছিল/বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ ‘শহীদদের প্রতি’ কবিতায় কবি আসাদ চৌধুরী বলেছিলেন। বলছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা, যাদের হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে কার্যত মেধাশূন্য করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা। শহীদরা তো প্রশ্নোত্তরের বাইরে চলে গেছেন বহুকাল আগে; প্রশ্নটা তো প্রকৃতপক্ষে কবি নিজের কাছেই করেছিলেন, উত্তর চেয়েছিলেন দেশের কাছে, যে দেশটা ওই শহীদদের আত্মত্যাগে প্রতিষ্ঠিত।

শুভ জন্মদিন ডাক্তার ফজলে রাব্বি,নামটার কাছে নত হই আজন্ম।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]