ফিরে এলো আমাদের সেই দুরন্তবেলা

মীনা মনোয়ারা

প্রবাসী বন্ধু রেখা জলি, মিঠু আসবে। আমরা প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিলাম। মনে হয়েছিলো সময় বুঝি আর শেষ হচ্ছেনা। বার বার মনে পড়েছিলো সেই ছোট্টবেলার কথা। স্কুলে গিয়েই একছোট খেলা। তারপর বেল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাশে যাওয়া। ফাঁক পেলেই বোর্ডের ফাকে গিয়ে গুটি খেলা। এখন মনে হয় নিয়ম কানুনের তোয়াক্কাই আমরা করতামনা। যে সমস্ত টিচার একটু ভদ্র, শান্ত ছিলেন। তাদের ক্লাশে তাদের ভদ্রতাকে কাজে লাগিয়ে পানি খাওয়ার নাম করে দলে বেধে পানি খেতে যেতাম। একদল আসলে আরেক দল। পানি খাওয়া মোটেও নয়। ক্লাশ ফাঁকি দেয়া। তখন হেড মিস্ট্রেস ছিলেন পারুল হোম রায়। আজীবন কুমারী। স্কুলই ছিলো উনার স্বপ্ন। ভদ্র, মার্জিত একজন শিক্ষক। স্কুলের ভিতরেই ছিলো উনার কোয়ার্টার। পাশে ছিল রহিমা আপার কোয়ার্টার। আমাদের বাংলা টিচার। যেমন ছিলেন স্মার্ট তেমনি পড়ানোর অসাধারন কৌশল। আমরা মনোযোগ দিয়ে উনার ক্লাশ করতাম। মনে হতো আরও কিছু সময় উনার ক্লাশ চলতে থাকুক।

একটা আকর্ষন আমাদের মাতিয়ে রাখতো। দেখতেও ছিলেন অপরূপা। পিছনে ছিলো একটা মাঠ। চারিদিকে আম গাছ।স্কুল শুরুর আগে মাঠে আমরা গিয়ে একবার খেলা করতাম। আবার টিফিনের সময় আরেকবার।

রেখার বাসায় আমরা।

আমের দিনে কাচা আম পেড়ে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেংগে সবাই ভাগ করে নিতাম। দপ্তরী মাখনদা বুট, বাদাম বিক্রী করতো। কিনে আমরা খেতাম। আবার টিফিনের সময় পিছনের গেট দিয়ে বের হয়ে রাস্তার পাশে একটা ভুষিমালের দোকান ছিলো।সেখান থেকে তেতুল কিনে এনে লেবু পাতা ও লবন দিয়ে মেখে মাঠে গোল হয়ে বসে সবাই মিলে খেতাম। স্কুল একদিন সরকারী হলো। ফাতেমা আবেদীন হেডমিস্ট্রেস হয়ে আসলেন।

স্কুলের ভাঙ্গা গড়া শুরু হলো। গড়ে উঠলো অট্টালিকা। পিছনের খেলার মাঠে হলো হেডমিস্ট্রেস ও অন্যান্য টিচারদের কোয়ার্টার। হারিয়ে গেলো আমাদের দুরন্তপনা। স্কুল আসলো একটা নিয়মের মাঝে। স্কুল গিয়ে এসেম্লী করা ও ইউনিফর্স পড়া বাধ্যতামূলক। তারপরও আমাদের ব্যাচের দুরন্তপনা বেড়েই চলেছিলো। প্রধান শিক্ষিকা আমাদের কন্ট্রোল করার জন্য উনার পাশের কক্ষে নিয়ে আসেন। একটা ক্লাশ শেষ হলেই হৈচৈ শুরু হতো। তারপর উনি এসে শাস্তি দিতেন। হারিয়ে গেছে আমাদের সেই সোনালী দিনগুলি। বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে দেশে বিদেশে। এখন একজন বিদেশ থেকে আসলে আমরা ঢাকাতে যারা আছি একত্রিত হই। করি নানা স্মৃতিচারন। ইদানিং প্রবাসী বন্ধু রেখা, জলি, মিঠু আসবে।

প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিলাম। রেখা ইংল্যান্ড থেকেই ঘোষনা করলো ১০-১২-২১ইং তারিখ রাতে তার বাসায় আর রেবা (সাহানা) ঘোষনা করলো ৮-১২-২১ ইং তারিখ তার বাসায় দুপুরে আড্ডা হবে সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া ।সেদিন রেবার বাসায় সবাই একে একে সবাই হাজির। যেমন সুগৃহিনী তেমনি পাকা রাধুনী বটে। রেবার ড্রয়িং রুমে বসে ভুলে গেয়েছিলাম আমরা সিনিয়র সিটিজেন। ফিরে গেয়েছিলাম সেই বাল্য, কৈশোর ও উত্তাল যৌবনের দিনগুলিতে। আড্ডা, হৈচৈ, খুনসুটি কোনটাই বাকী ছিলোনা।

ভুলে গিয়েছিলাম বন্ধুবর বীরউত্তম আজিজুর রহমান, মেজর জেনারেল ঘরেই আছেন। তবে ভাইও আমাদের আনন্দে শরীক হোন। তিনি আমাদের সকলের প্রাণের মানুষ। অত্যন্ত ভাল মানুষ। স্বাধীনতার বীর পুরুষ। তিনি ছিলেন আমাদের ফটোসেশন নিয়ে ব্যস্ত। রেবার ছেলের বউ শবনম এতগুলো শ্বাশুড়ী ম্যানেজ করা তাছাড়া ফটোসেশন ও আমাদের নিয়ে তার ব্যস্ততার তার শেষ ছিলনা। তারপর খাওয়ার পালা। রেবা ডাইনিং টেবিলের এপাশ ওপাশ নানাবিধ খাবারে ভরে উঠেছিল। খুবই সুস্বাদু সব খাবার। এত পদ সবকিছুর নামও জানিনা। তারপর বিদায় নিয়ে আমাদের সবার নিজস্ব গন্তব্যে প্রস্হান।

রুন্নির আয়োজনে আমরা

১০-১২-২১  তারিখ রেখার উত্তরার বাসায় আমাদের মিলন মেলা। রেখা আমার প্রিয় টিচারের মেয়ে। উনিও আমাকে ভীষন আদর করতেন। উনাকে দেখার জন্য অনেকবার আমরা রেখার বাড়ীতে গিয়েছি। ক্ষনে ক্ষনে উনার কথাই মনে পড়ছিলো। রেখা আমাদের সঙ্গে অনেক আত্মীয় পরিজনকেও দাওয়াত করেছিলো। পাশাপাশি দুইটা ফ্ল্যাট ওর। একটাতে আমরা বন্ধুরা অন্যদিকে আত্মীয় পরিজন। সেখানে আমরা খুব ভদ্রভাবে গল্প গুজব করে কাটিয়েছি। রেখার ছোট বোন উল্কা বলাকা বুড়ীর সঙ্গেও দেখা হয় দীর্ঘদিন পর। সবচেয়ে বড় আকর্ষন হলো কলির সঙ্গে দেখা হওয়া। অনেক ছোটবেলা দেখেছিলাম। আবার পরিনত বয়সে দেখা। আবেগে একজন আরেক জনকে জড়িয়ে ধরি। মনে হলো এক টুকরো হবিগন্জ পেয়ে গেছি। খাওয়া পর্ব শেষে আমাদের বিদায় পর্ব। খুবই খারাপ লাগলো। তবুও বিদায় নিতে হলো।

রাওয়া ক্লাবে  আমরা ১১-১২-২১ তারিখ আবার সব বন্ধুরা মিলিত হলাম। খাওয়া, আড্ডা ও হৈচৈ এ মেতে উঠলাম। ভুলে গেলাম আমাদের বর্তমান। ফিরে গেলাম বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের সোনালী দিনগুলিতে। খাওয়া, ফটোসেশন, কেক কাটা সবই হলো।

তবে সবশেষে আমাদের ছোট্ট রুন্নিও আমাদের একটা মিলনমেলার আয়োজন করে। ছোট্ট রুন্নি বড় হয়ে গেল কোনদিকে খেয়ালই করতে পারিনি। এখন সে নিজেও মা। স্বামী সংসার নিয়ে প্রবাসে ঘর বেধেছে। প্রবাস থেকে সবাইকে অনুভবে অনুভবে বুঝে নেয়। ভাবতে থাকে দেশে গিয়ে সবাইকে দেখবো। স্বল্প সময়ে কি সম্ভব? তাই হল ভাড়া করে সবাইকে ডাকে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে মায়ের বন্ধুদেরকেও বাদ দেয়নি।এতো মাকে আনন্দ দেয়া।রুন্নির বাবাও আমাদের হবিগন্জের বড় ভাই। উনারা সবাই আমাদের অতি পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিন পর দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠি। রিনি আপা আমাদের অতি কাছের বন্ধু। নিমনিকে দেখেছি কত যুগ পরে। বাদল ভাবীকে প্রথম দেখেছিলাম নুতন বউ। একেবারে নায়িকার মত। আরও বহুবার দেখেছি। তবে সেদিন দেখে মনে হলো আমাদের সঙ্গে ভাবীও সিনিয়র সিটিজেন।  তবে ভাবীর চেহারাটা এখনও কমনী।

রেবার বাসার টেবিল ভর্তি খাবার

টুনি আপার মেয়েকে দেখে চেনা চেনা লেগেছিলো। কিন্তু আন্দাজ করতে পারিনি। রিনি আপা দূর থেকে দেখিয়ে দিল টুনী আপার মেয়ে। সত্যিই টুনী আপার চেহারার আদল পেয়েছে। সে এখন মানিকগন্জের ডিসি। গর্বে মনটা ভরে গেলো। অনেক কথা হলো। টুনি আপা কিছুদিন পূর্বে গত হয়েছেন। আল্লাহ উনাকে জানাতবাসী করুন। আমীন।

সাহানা (রুবি) দের পরিবারের সঙ্গে আমরা এত ঘনিষ্ঠ। ওরা আমাদের আত্মার আত্মীয়। জেবা অসু্স্থ জেনে মনটা সবসময়ই কাঁদতো। রেবা আর আমি একসঙ্গে সময় করতে না পারায় দেখা হয়ে উঠেনা। ওর সঙ্গেও দেখা হলো। ভাল লাগলো। রশিদ ভাই ভাল স্বামী। ওকে সেবা ও যত্ন দিয়ে আগলে রেখেছেন।

রুন্নির স্বামী এক ঝলকেই বুঝতে পারলাম ভাল ছেলে। হলে ডুকতেই রুন্নি আমাকে বুকে টেনে নিলো। তার স্বামীর সঙ্গে পরিচয় করালো।

শেষ আকর্ষন নুতন বন্ধু। ওয়াদী, যাহরা, রিদা আরও একটা টুনটুনি। মজাই হলো ওদের নিয়ে। তোমরা আমাদের নুতন প্রজন্মের বন্ধু।

মা রুন্নি তুমি আমাদের এত জনকে এক সঙ্গে দেখার সুযোগ করে দিলে। নিয়ে গেলে ফিরিয়ে সেই স্কুল জীবনে। আনন্দ আনন্দে ভরিয়ে দিলে অনেকক্ষন। যা হৃদয় পটে জেগে থাকবে আমৃত্য। ভাল থেকো, সুখে থেকো। দোয়া অবিরত।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box