ফিরে দেখাঃ শিল্পী রামকিংকর বেইজ

শিল্পী রামকিংকর বেইজ ছিলেন আধুনিক ভারতীয় ভাষ্কর্যশিল্পের অন্যতম পথিকৃত। তিনি ১৯০৬ সালের ২৫ মে ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির বাঁকুড়া জেলার যুগীপাড়ায় (পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য) এক সাঁওতাল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
মধ্যকৈশোরে রামকিঙ্কর অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি আঁকতেন। ১৯২৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় তিনি বিশ্বভারতীর কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানে নন্দলাল বসু ও রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে তার শিল্পশিক্ষা বিশেষ মাত্রা লাভ করে এবং পরবর্তীতে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন।3298380375_01f96ff260_b-282x300
ভারতীয় শিল্পকলায় রামকিংকর বেইজ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলেন। মানুষের মুখ, অভিব্যক্তি, তাদের শরীরের ভাষা নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ দেখা যায় তার শিল্পকর্মে। টেরাকোটা রিলিফ ও পাথর খোদাইয়ের পাশাপাশি তিনি জল ও তেলরঙে প্রচুর কাজ করেছেন।শিল্প নির্মাণে তিনি দেশজ উপাদানের প্রাধান্য দিয়েছেন।
রামকিংকর বেইজ ১৯৮০ সালের ২ আগস্ট রাত সাড়ে বারোটায় মহাকালের সঙ্গে মিলিত হন।
পুরনো বই ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ হাতে এলো রামকিংকর বেইজের একটি সাক্ষাৎকার। শিল্পীর জীবন, শিল্প ভাবনা আর কাজ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য মুদ্রিত হলো রামকিংকরের জবানীতে।

ছেলেবেলায় দূরদেশে বিদ্যাশিক্ষার আশায় গিয়েছিলাম। মা‘র মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি ছুটে এলাম। মৃত্যুর কথাটা বুঝতে একটু দেরি হলো। আমি যেন কথা বলতেই জানি না। প্রলাপ বকারও কোন উৎসাহ নেই। কেবল একটি উচ্চারণমাত্র ‘মা’-ব্যাস, এ ছাড়া আর কোন কথা নেই। গভীর বেদনার বোবা প্রকাশমাত্র।
dandi-march-239x300গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখেছিলাম তিনি তাঁর জীবনের অর্ধাংশেরও বেশি সময় বাণী-সুর-শব্দ নিয়ে রচনার কাজ করেছিলেন অজস্রধারে। পরে দেখি, রং-রেখার প্রাচুর্য নিয়ে টানা দশ বছর কাটিয়েছেন নির্বাক মৌনতায়।
গতি আর ঘর্ষণের মধ্যে বৈরীভাব আছে। গতি যত তেজবান ততোই কর্কশ। এর মধ্যে যেখানে সুসম্বন্ধ, সেখানেই সঙ্গীতের উদ্ভব।
প্রকৃতিতে আমরা দুটি আকৃতি পাই। পুরুষ আর নারী। আর একটি ফর্ম হচ্ছে প্রজনী-অর্থাৎ বাচ্চা। এই থিমটি এক অদ্ভূত সুন্দর। এর উপর কত আনন্দ, কত সৌন্দর্যের খেলা চলছে। এটিকে একটি ফর্মের ভেতরে প্রকাশের চেষ্টা, তার নামই হচ্ছে সিম্বল। সেটাই বলার চেষ্টা করেছি। এ্টাই সিম্বল বলে প্রচার। সঙ্গীতেও কী এইরকমের সিম্বল আছে? সে কথাটা সঙ্গীত স্রষ্টারা বলতে পারবেন।
আজকাল খালি কথার প্রচার এবং প্রচার। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কানেও ঢুকছে না। কারণ গোলমাল আর গোলমাল। কান ঝালাপালা। মেশিনের গোলমাল এ যুগের একটি প্রধান গোলমাল। এবার সাইলেন্সারের যুগ কবে আসবে সে আশায় রইলাম। রূপকারের কাছে শব্দের অর্থ অতি ক্ষীণ। রবীন্দ্রনাথ যখন রূপ নিয়ে কাজ করছিলেন তখন দেখেছি, তিনি নিস্তব্ধ থাকতেন। অথচ শব্দ নিয়ে তিনি সারা জীবন কাটিয়েছেন। কথোপকথনের শিল্প, সঙ্গীতের শিল্প-এ দুটিই শাব্দিক। রূপশিল্পের বেলায় একেবারে চুপচাপ। কেবল ধ্যান। নিজের লেখায় বলেছেন “ধ্যানের ধনখানি পাইবে আপন বাণী”।
শেষ কথা, মহাশয়, আমি চাক্ষিক, রূপকার মাত্র। শাব্দিক নই। যাই হোক, শব্দের মাঝে রূপ-ঝগড়া যখন বাধে তখনই শব্দের ঝনঝনানি। মোটর, ট্রাক, ট্রেনের শব্দ, কারখানার শব্দ, মানুষের কোলাহল-এসব শুনেও আপনারা আরও শব্দের জন্য পত্রিকা ছাপেন? আপনাদের ধৈর্যের কী বলিহারি!

তাহিয়া সুলতানা
সূত্রঃ রামকিংকরঃ আত্নপ্রতিকৃতি