ফিরে দেখা সব সময় আনন্দের…

শেখ রানা

শেখ রানা

 গান লেখার গল্প। গীতিকার হবার উপাখ্যান।সে গল্পও মন্দ নয়।কেবল তাকে পেছনে ফেরানো। ফিরেতাকালে মনে হবে খুলে গেছে আস্তএক জাদুর বাক্স।উনিশ বছর পূর্তিতে ভাবলাম গান লেখার গল্প হোককিছু। ইদানিং অনুজ গীতিকারদের জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্নেরউত্তরও হয়তো এসে যাবে আলগোছে।এভাবেই আমাদের প্রাণের বাংলায় শুরু করলেন গীতিকার শেখ রানাতার গান লেখার গল্প…

(এডিনবরা, স্কটল্যান্ড): দুঃখগুলোও এক ধরনের সেরেনিটি নিয়ে বুক পাঁজরের অদৃশ্য পালকে পেজা তুলোর মতো অণুরণ জাগায়। আনন্দগুলো, হাসিগুলো শান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে আয়নায়। অবয়বে ধরা পড়ে বোহেমিয়ান গীতিকারের বর্ণিল জীবনের টুকরো ছবি, নাগরিক জার্নালের বেড়ে ওঠা একটু একটু করে।কিছু আক্ষেপ, প্রিয় বন্ধুর দূরে চলে যাওয়া, সমতলে থেকে যাওয়া শব্দসুরের বন্ধুতা, সমতল থেকে আলোকবর্ষে হারিয়ে যাওয়া গিটার হাতে চেনা মুখ, ভিড়ের মানুষ হয়ে যাওয়া একজন,ভিড় ঠেলে সামনে দাঁড়ানো আর একজন। চুপচাপ, শান্ত।এই সব টুকরো গল্প ছায়া হয়ে আমার সঙ্গে রোদ্দুরে হেঁটেছে লম্বা সময় । তারপর চিরাচরিত নিয়মে ওয়ান ফাইন গুড মর্নিং আমি চোখে-মুখে অপার্থিব আলো মেখে ভুলে গেছি সব।মনে রেখেছি শুধু আনন্দ, হাসি, আর মুঠি মুঠি ভালোবাসা।শব্দগুলো কোথা থেকে আসে, লেখা শেষ করে আমাকে অবাক করে চলে যায় কোথায়…জানতে জানতেই বোহেমিয়ান জীবনের পথ চলা পথের নিয়মে বাঁক নিচ্ছে, বাঁক নেয়।পথের বাঁকেই আমি স্বজনদের খুঁজে পাই, তারপর।এইসব ভাবনার অতলে বুঁদ হয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে আমার গীতিকার জীবনের টুকরো মজার ঘটনা শব্দে ধরি, বন্ধুদের জন্য। 

এক.

পাটুয়াটুলি, পুরান ঢাকা। রাতপ্রহরী-র কাজ প্রায় শেষের দিকে। এক বিকেলে বাপ্পা ভাই এর সঙ্গে গেলাম এক ক্যাসেট কোম্পানীর কর্ণধারের অফিসে। বিরস বদনে  আমাকে আর উজ্জ্বল মুখে বাপ্পা ভাইকে বসতে বললেন ভদ্রলোক। তারপর খাস ঢাকাইয়া ভাষায় শুরু করলেন,’ ভাই, এইসব ঠান্ডা গান এলা শোনেনা পাবলিক। একটু ড্রাম ড্রুম বাজানি গান ঢুকান। এই যেমুন ধরেন চাঁদ-তারা সুর্‍্য নও তুমি, আছে না, সেইরাম আর কি!’শুনে আমি আর বাপ্পা ভাই দুজনেই থমথমে মুখে বের হয়ে আসি। তারপর রাগে দুঃখে চকলেট খেতে খেতে দুজন ফিরে আসি সিদ্বেশ্বরীতে। সপ্তাহখানেক পর। বুড়ি-গানটার কম্পোজিশন শেষ। বাপ্পা ভাই খুশী। আমিও গান শুনে খুশী। এবার আর আমার যাওয়া হলো না পাটুয়াটুলি। তবে ঘটনা যা শুনলাম সেটা না যাওয়ার বেদনাকে তরমুজ বানিয়ে দিলো একদম।বুড়ি গানের একটা লাইন আছে এ রকম- কফি হবে, হুইস্কি হবে/ জেগে থাকা রাত…চাউমিন আর ফ্রায়েড রাইস, লজ্জা পাবে ভাত। লিরিকটা করা হয়েছিলো আসলে স্যাটায়ার করে, মজা করেই লেখা হয়েছিলো- যৌবনের এই উচ্ছ্বলতার হঠাৎ থামবে ঘুড়ি, আমার মাথা গড়ের মাঠ, তুমি হবে বুড়ি। তো, গান শুনে কম্পানী কর্ণধার বেজায় খুশী। এই গানের ড্রাম-ড্রুম তার পছন্দ হয়েছে। তবে একটা বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন কর্ণধার সাহেব। কফি হবে, হুইস্কি হবে- এই লাইন নিয়ে তার ওজোর-আপত্তি। গান শুনে হাসি হাসি মুখে উনার মতামত ছিলো এ রকম-‘বাপ্পা ভাই, কইছিলাম কি, এই হুইস্কির জায়গায় বিস্কুট দিলে হয়না?’ আক্কেল গুরুম মুহূর্ত যাকে বলে!

দুই.

পরী গান নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে।আমি তখন  নির্বাসন দন্ডে লন্ডনের এক ছোট্ট শহরতলীতে। সারাদিন হকারগীরি করে বিমর্ষ হয়ে টিউব এর ভাবলেশহীন সব মুখগুলোকে সঙ্গী করে বাড়ি ফিরে আসি। লেখালেখি ভুলে থাকার চেষ্টা করি, তবু শব্দ আমাকে একা রেখে চলে যায় না। পরম মমতায় মাঝে মাঝে দেখে যায়, কেমন আছি।সে রকম এক আনন্দ বেদনার রজনীতে শুনতে পেলাম নারায়ণগঞ্জ নিবাসী রানা নামের জনৈক তরুণ দাবী করেছে সে-ই পরী গানের গীতিকার। দাবী করেই ক্ষান্ত হয়নি, এলাকার মেয়ে ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণের মিশনে দেদার প্রেম নিবেদন করে বেড়াচ্ছে। তার এহেন কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে জনৈক রানার বাড়িওয়ালা তাকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ তো দিয়েছেই বাপ্পা ভাই এর ফোন নাম্বার যোগার করে ফোন দিয়ে বিচার পর্যন্ত ঠুকে দিয়েছে।আমি শুনে হাসবো না অবাক হবো বুঝে উঠতে পারিনা। বাপ্পা ভাইকে জিজ্ঞাসা করি- ‘এখন কি?” জনৈক রানাকে স্টুডিওতে আসতে বলেছি। আর রশি তৈরি আছে। এলেই বেঁধে ফেলবো, তারপর ফোন দিবো তোমাকে।’ বাপ্পা ভাই গম্ভীর মুখে রসিকতা করে জানায় আমাকে।জনৈক রানার মিশন  ‘মিশন ইম্পসিবল’ হয়েছিলো, বলাই বাহুল্য।

তিন.

পরী নিয়েই আর এক ঘটনা।আমি তখন ফিরে এসেছি প্রিয় শহরে। কোনো এক দুপুর শেষবেলায় পরিচিত ছোটো ভাই এর সঙ্গে গেলাম বারডেমে, তার অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে। দেখা শেষে ক্যান্টিনে বসে আছি। ছোটো ভাই এর দুই পরিচিত ছোটো ভাই এলো। ক্যান্টিন  ছোটো ভাই-এ ভরে গেলো মোটামুটি। আমার পরিচিত ছোটো ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো পরী গানের গীতিকার হিসেবে।খানিক বিব্রত মুখে হাত মেলালাম। ছোটো ভাই এর ছোটো দুই ভাই আমার পরিচয় পেয়ে রীতিমত উত্তেজিত। ‘ভাই,কি খাবেন বলেন…না না, শুধু চা হতেই পারে না, এই বেয়ারা, সিঙ্গাড়া, সমুচা কেক নিয়ে আসো। ভাই আর কি খাবেন বলেন।’আমি বিরস মুখে সিঙ্গাড়া, সমুচা, আর কেক এর দিকে তাকিয়ে থাকি। টেবিলের অপর প্রান্তে ওরা নিজেদের মধ্যে কি যেনো ফিসফাস করে । ‘ তুই বল, না না তুই বল ‘- জাতিয় ফিসফাস শুনতে শুনতে আমি  কেক এর টুকরো ভেঙ্গে মুখে দেই।ঠিক তখনই ছোটো ভাই এর ছোটো ভাই উত্তেজিত মুখে বলে ওঠে, ‘ ভাই, পরী নিয়ে তো অনেক লিখলেন, জ্বিন নিয়ে কবে লিখবেন? ‘শুনে কেক গিলে ফেলার জন্য চায়ে একটা বড়  চুমুক দিয়ে যথাসম্ভব ভাবলেশ মুখে প্রশ্নকর্তা ছোটো ভাই এর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।সেও আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে জম্পেশ।

ছবি: সৌজন্যে শাহানা হুদা