ফুলগুলো সরিয়ে নাও, আমার লাগছে

বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে হাসপাতালে নিতে হবে। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। কিন্তু ঘর তো শুন্য, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও কঠিন। দারিদ্র্য তখন ভয়াল এক দানবের মতো আসন গেড়ে বসেছে তাঁর সংসারে। বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়সিহ আরো কয়েকজন এসেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। নিয়ে যাওয়ার সময় ‘‌সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানিকবাবুর স্ত্রীকে অভিযোগ করে বলেছিলেন: এমন অবস্থা, আগে টেলিফোন করেননি কেন? উত্তরে তাঁকে (কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়কে) হাসতে হয়েছিলো। আর তারপর অস্ফুটে বলে ফেলেছিলেন: তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।’

গোটা জীবন কলম যার খনন করে চলেছিলো হাসির ফোয়ারা সেই শিবরাম চক্রবর্তীকেও তাঁর তীব্র অভাবের দিনে লেখার পারিশ্রমিক দেননি কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়িতে অভাব আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করেই কেটেছিলো শিবরাম চক্রবর্তীর জীবন। সে সব কথা এখন ইতিহাস।  

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে লড়াই শুরু করেছিলেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। কবির বাকী জীবন ছিলো ঝড়ের বিরুদ্ধে নৌকা চালনা করা। ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্তও কপর্দকহীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।   

বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসেও এমন আরো অনেক লেখকও বাস্তব জীবনের দাবি মেটাতে গিয়ে লড়াই করেছেন তীব্র অভাবের বিরুদ্ধে। জীবনকে চালিয়ে নেয়ার মতো সামান্য অর্থ জোটানোর ভয়ানক লড়াইয়ে কেউ কেউ পরাস্তও হয়েছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার শেষ শয্যায় এতো পরিমাণ ফুলের মালা চাপানো হয়েছিলো যে শোনা যায় ফুলের ভারে সেই খাটিয়ার পায়ায় চির ধরেছিলো। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সেই দৃশ্য দেখেই লিখেছিলেন ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।’

ইরাজ আহমেদ এর রচনায় প্রাণের বাংলায় এবার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সাহিত্যের সেই উজ্জ্বল পুরুষদের দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কিছু টুকরো গল্প-‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও, আমার লাগছে’।

‘অবস্থা অতি কাহিল। বাজার আনতে দেওয়ার মতো নগদ পয়সা নিজের হাতে নেই।’‌ ১৬ এপ্রিল ১৯৫৬-তে, প্রয়াণের মাত্র কয়েক মাস আগে, ডায়েরিতে লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কপর্দকহীন অবস্থায়, দারিদ্র‌্য আর অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কীভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে বিস্তর।

মধুসূদনের দারিদ্র‌্যের জন্য অবশ্য অনেকেই তাঁর অমিতব্যয়ী স্বভাবকে দায়ী করেন। বেহিসাবী জীবন আর বন্ধু বাৎসল্য তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিলো— এমনটা অনেকেই বলে থাকেন।  ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে দেশে ফেরার পর তিনি কীভাবে জীবনযাপন করতেন তার একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যায় নগেন্দ্রনাথ সোম-এর ‘মধুস্মৃতি’–তে। শ্রীসোম লিখছেন:‌ ‘‌স্পেন্‌সেস্‌ হোটেলে মাইকেল মধুসূদন একাকী বাস করিতেন; কিন্তু তিনখানি বড় বড় ঘর তাঁহার অধিকৃত ছিল। তিনি বন্ধুবান্ধবদিগকে সতত পানভোজনে পরিতৃপ্ত করিতেন। দেশী, বিলাতী, যিনি যেরূপ খানা খাইতেন, তিনি তাঁহাকে সেইরূপ খাদ্যদানে তৃপ্ত করিতেন। তাঁহার মদের ভাণ্ডার সতত উন্মুক্ত ছিল।’‌ তবে সবসময় যে অমিতব্যয়ী জীবনযাপনের জন্যই মধুসূদন আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলেন তাও ঠিক নয়। ১৮৬২ সালের ৯ জুন ‘ক্যান্ডিয়া’ জাহাজে চেপে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার আগে তিনি আর্থিক সঙ্কট থেকে নিজেকে অনেকখানি মুক্ত করতে পেরেছিলেন। ১৮৬০ সালে জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে মামলা জিতে তিনি পিতৃসম্পত্তি উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ে মধুসূদন নিদারুণ অর্থকষ্টের মুখোমুখি হন। বিদ্যাসাগরকে এই সময় বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন তিনি। তার প্রথমটিতে তিনি নিজের এই ভাগ্যবিপর্যয়ের জন্য স্পষ্টতই দায়ী করেছিলেন ‘Babu D—’কে।  চিঠি পেয়ে বিদ্যাসাগর নিজে তো দেড় হাজার টাকা তৎক্ষণাৎ পাঠিয়েছিলেনই, পরে বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে বিশাল অঙ্কের টাকা পাঠিয়ে সে যাত্রা মধুসূদনকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মধুসূদনের সঙ্গে অবশ্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও তুলনাই চলে না। ১৯৩৭ সালে কিরণকুমার রায় সম্পাদিত ‘বঙ্গশ্রী’ (মাসিক ও সাপ্তাহিক) পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে তিনি যখন যোগ দেন তখন তাঁর বেতন ছিল সাকুল্যে ৭৫ টাকা। বিএসসি পরীক্ষায় দু’বার অকৃতকার্য হওয়ার পরে যেহেতু প্রথাগত পড়াশোনাতেও ইতি টেনেছিলেন তাই তাঁর পক্ষে অন্য কোনও ধরনের কাজ করা সম্ভবও ছিল না। দু’টি বিষয়ে মধুসূদনের সঙ্গে তাঁর অবশ্য মিল ছিল। অপরিমিত মদ্যপান আর আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা। জীবনের শেষ অঙ্কে অসুস্থ হয়ে ইসলামিয়া হাসপাতালে ভর্তি লেখক। একদিকে চলছে চিকিৎসা আর অন্যদিকে সবাইকে ফাঁকি দিযে দেশীমদ পান চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের লেখা ডায়েরিতে এই মদ্যপানের উল্লেখ্য আছে অসংখ্যবার। ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি লিখছেনঃ ‘‘দুপুর আড়াইটায় কাসির ওষুধটা খেয়ে দোকানে একটা সন্দেশ খেয়ে আলমবাজার থেকে D আনলাম। এখানে D অর্থ দেশী মদ। আবার সুকান্ত ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর নিজের অভাব–অনটন ভুলে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘‌সুকান্তকে স্মরণ করে আমি ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার আর্থিক সচ্ছলতা যতদিন না হবে ততদিন ‘পরিচয়’ পত্রিকায় লেখার জন্য যা মজুরি পাই তা ‘স্বাধীনতা’র তহবিলে জমা দেব’‌। অতিরিক্ত মদ্যপান কেন করেন তার একটি উত্তর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্ভবত, দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর একটি কবিতায়, যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌মানুষ হয়ে মদ কেন সে খায়?/মানুষ যদি মানুষ হয়ে বাঁচার উপায় পায়/অমানুষের মরার মতো মদ সে কভু খায়!’‌ কী নিদারুণ স্বীকারোক্তি! এমন স্বীকারোক্তি পাঠককে বাকরুদ্ধ করে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের পরাক্রান্ত সৃষ্টিপ্রতিভার মতোই তাঁর চিকিৎসাতীত মৃগী রোগ ও আসক্তি এবং স্বেচ্ছানির্বাচিত দারিদ্র্যের সমেবেত আক্রমণে বিপন্ন হয়ে পড়েন। আর তারই পরিণতিতে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হয় তাঁকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই চূড়ান্ত আর্থিক কষ্টে শেষের দিনগুলি কেটেছিল শিবরাম চক্রবর্তীরও। মধুসূদনের সঙ্গে তাঁর জীবন প্রণালীর ক্ষীণ মিল পাওয়া যায়। বন্ধুদের মাধ্যমে যেভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন মধুসূদন, তেমনই বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন শিবরামও। শরৎচন্দ্রের ‘দেনাপাওনা’–র নাট্যরূপ দিয়েছিলেন শিবরাম। ‘ষোড়শী’। শিশির ভাদুড়ী প্রযোজিত-অভিনীত এই নাটকটির বেশ কিছু রজনী সফল মঞ্চত্ব হয়েছিলো। শিশির ভাদুড়ীর কাছে তখন আশ্বাস পেয়েছিলেন শিবরাম যে, টিকিট বিক্রির টাকার একটা অংশ তিনি পাবেন। কিন্তু সেই টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে বঞ্চিত হয়েছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। টাকা নিয়ে নিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র

শিবরাম চক্রবর্তী

চট্টোপাধ্যায়। শতদল গোস্বামী তাঁর ‘‌১৩৪, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের সেই রসিক লেখক’‌-এ লিখছেন, ‘‌ভাদুড়িমশায় অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি করেননি। আন্তরিক অনুরোধ করেছিলেন শরৎচন্দ্রকে। তিনি কর্ণপাত করেননি। বলেছিলেন, ‘শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে-থা করেনি, ছেলেপিলে ঘরসংসার নেই, টাকায় তার কিসের দরকার’। শুধু শরৎচন্দ্রই নন, প্রকাশকরাও যে শিবরামকে ঠকিয়েছিলেন, শতদল গোস্বামী লিখেছেন সেকথাও।

শেষ জীবনে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে থাকা শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। সেই প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পরে অবশ্য নড়েচড়ে বসে ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সাহায্যে এগিয়ে আসে রোটারি ক্লাব আর পুস্তক প্রকাশন সংস্থা। এই চারটি সংস্থার থেকে প্রতি মাসে ছ’শো টাকা সাহায্য পেতেন শিবরাম। এতে একা মানুষের সে সময় সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সেই সময় শিবরামের যে ভাগ্নে এবং ভাগ্নেপত্নী তাঁর দেখাশোনা করতেন তারা যে তাঁর ঠিক কেমন যত্ন করতেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। সাহায্যের পুরো টাকাটাই অসুস্থ শিবরাম তুলে দিতেন ভাগনের হাতে। সে টাকা শিবরামের জন্য ব্যয় হতো কিনা এ প্রশ্ন তুলেছেন শতদল। যেমন, গরম একদম সহ্য করতে পারতেন না শিবরাম। তাঁর ঘরের সিলিং ফ্যানটি বিকল হলে সেটি মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছিল কিন্তু সেটি আর ফেরত আসেনি। নতুন কোনও ফ্যানও কিনে দেওয়া হয়নি তাঁকে। দ্বিতীয় যে ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন শতদল গোস্বামী তাঁর বইতে তা আরো করুণ। ‘‌এই শৌখিন মানুষটি চাঁপা ফুল রঙের শার্ট পরতে ভালবাসতেন, বরাবরই তাই পরতেন। একদিন দেখা গেল— ধুতি আর গেঞ্জি পরে তাঁর জীবনের শেষ সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত হয়েছেন। শোনা গেল, কিছুকাল আগে তাঁর রিক্ত ঘরে চোর ঢুকেছিল, তাঁর জামা চুরি করে নিয়ে গেছে। চোরের উপর রাগ করেই সম্ভবত শাস্তিস্বরূপ তাঁকে নতুন জামা কিনে দেওয়া হয়নি। শিবরাম চক্রবর্তী তখনও হাসিতে বেদনা ফুটিয়ে বলেছিলেন, ‘গেঞ্জিতেই যখন চলছে, চলুক না’‌।

যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানিকের মৃত্যুর পরে লিখেছিলেন ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও’, তাঁর নিজের শেষ জীবনও তো সুখে কাটেনি। ক্ষমতাসীন পার্টির থেকে নানা কারণে আজীবন বামপন্থী এই মানুষটি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। শেষজীবন তাঁর কেটেছিল নিদারুণ অর্থকষ্টে। মৃত্যুর পরে অবশ্য তাঁর দেহের দখলদারিত্ব নিয়ে নির্লজ্জ নাটক অভিনীত হয়েছিলো। মারা না গেলে আমরা অনেক সময়েই একজন লেখক বা সাহিত্যিককে তাঁর প্রাপ্যটুকু দেয়া হয় না। কিন্তু মৃত্যুর পর তার শেষশয্যা ভরে ওঠে ফুলে আর শ্রদ্ধায়। বাংলাদেশের প্রয়াত কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সেই অমর কবিতার লাইন আবারো ফিরে আসে, ‘তোমাদের হিসেবি খাতায় বীর নেই/ শহীদ রয়েছে শুধু।

ছবি: গুগল