ফেইসবুক দ্বিতীয় পাঠ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): এইবার শীত তাড়াতাড়ি এসেছে কানাডায়। নভেম্বর-ডিসেম্বরেই আকাশ ভাঙ্গা তুষারে ঢেকে যাচ্ছে লোকালয়। পত্র-পত্রিকা শোরগোল তুলেছে…”এইবার হবে Brutal Winter!!…নিষ্ঠুর শীতকাল!!!”

খবরের কাগজ তার মূল দায়িত্ব পালন করছে ঠিক-ঠাক। মানুষকে আরো আতংকিত করে তোলাই তাদের কাজ। যুগে যুগে….দেশে দেশে। সাংবাদিকরা সব দেশেই ‘সাংঘাতিক’!

আমিও কিঞ্চিৎ ভয় পেয়ে পয়সা খরচ করে এক খানা জাঁদরেল উইন্টার বুট কিনেছি। গোড়ালী ঢাকা আর ওয়াটার প্রুফতো বটেই। বুটের গায়ে লেখা আছে..”এটা মাইনাস ৩২ ডিগ্রী পর্যন্ত পা বাঁচাতে পারবে।“

চলে যাবে মনে হয়। কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে ঠান্ডাতম দিন হলো ১৯৪৭ সালের ৩রা ফ্রেব্রুয়ারী। কিন্তু সেটা আরো উত্তরে। প্রায় উত্তর মেরুতেই বলা যায়। আন্দাজ করতে পারেন কতোতে নেমেছিলো?

এইটুকু বলতে পারি…আমার এই নতুনকেনা বুটে সে ঠান্ডা কুলানোর প্রশ্নই আসে না!

এই বিকেলে রাস্তা-ঘাট সাদা চাদরে ঢেকে গেছে। একটা কফিশপে বসে আছি। জানলার পাশে। তখনো তুষার পড়ছে বাইরে। ভেতরে বোঝার উপায় নেই। আরাম দায়ক উষ্ণতা। গরম কফির গন্ধ। মানুষ বসে আছে। গল্প করছে।

ছুটির দিনে এক মা এসেছে তার ছোট বাচ্চা নিয়ে। আমার পাশেই বসেছে। মেয়েটার বয়স ৫-৬ হবে। একেবারে কিউটের ডিব্বা। বিরাট মাতবর। মাকে টুকটুক করে কি কি খেতে চায় স্পষ্ট করে বলছে। আমি মাথা নিচু করে…ওদের দিকে না তাকিয়ে…শুনছি। দশ বছর হয়ে গেল কানাডা আছি। এখনো এখানকার ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখে পরিষ্কার ইংরেজী শুনে ভুলেই যাই যে আমি ইংরেজী ভাষাভাষীদের দেশে আছি। এক সেকেন্ডের জন্য ঠিক অবাক হয়ে যাই!! এতো ছোটো বাচ্চা কি করে এতো সুন্দর ইংরেজী বলছে?!
মনে পড়ে যায়…টেন্স, ভয়েস চেঞ্জ, ন্যারেশন, এপ্রোপ্রিয়েট প্রিপোজিশন নিয়েতো আমার পুরা কিশোরকালই ধ্বংস হয়ে গেছে! এখনো ঠিক হয় নাই!!

“কি শৈবাল..তুমি আমার ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছো?”

আমি এই কফি শপে একটু টেনশন নিয়ে বসে আছি। শরীফ ভাই সংগে আছেন। গম্ভীর মুখে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন। তিনি একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন। তার ধারনা আমি কোন সমাধান দিতে পারবো। আসলে তার এই ধারনার কোন শক্ত ভিত্তি নেই। পলকা একটা সম্পর্ক আছে।

বছর দেড়েক আগে আমি আমার ছেলের ফেইসবুকে একাউন্ট খোলা নিয়ে ‘ফেইসবুক-প্রথম পাঠ’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম। শরীফ ভাইয়ের ধারনা লেখাটা কাজের ছিলো।

ব্যস্‌! এই পলকা সুতার উপর দাঁড়িয়ে শরীফ ভাইয়ের ধারনা হয়েছে আমি তার মাত্রাতিরিক্ত ফেইসবুক আসক্তি কমাতে সাহায্য করতে পারবো। কিছুটা গোঁ-গাঁ করেছি। কিন্তু তিনি মানছেন না। আসলে তার অপরাধবোধ তৈরী হয়েছে। তিনি কারো সংগে এই বিষয়ে একটু কথা বলতে চান। ভাবলাম আমার অতি প্রিয় প্রশ্ন-উত্তর পর্ব কিছুক্ষন চালিয়ে দেখি….আমার হাতে সময়ও আছে। বাইরেও ঠান্ডা…কি আর করার আছে?

“শরীফ ভাই আপনি নিশ্চিত আপনার ফেইসবুক আসক্তি আশংকাজনক?”

“বলো..কি! অবশ্যই। তুমি জানো আমি ফোন হাত থেকে নামাতে পারি না। একটু পর পর পকেট থেকে বের করতে হয়। নয়লে দম বন্ধ হয়ে আসে। স্ক্রল করা শুরু করলে থামতে পারি না। এটা কি আসক্তি না?”

“অবশ্যই আসক্তি। ফেইসবুকতো আর পানি না। যার আরেক নাম জীবন। সকল আধুনিক টেকনোলজীকে যদি খাবারের সংগে তুলনা করি…তবে ফেইসবুককে বলা যায় বড়োজোড় ‘চানাচুর’। মাঝে মাঝে বিকেলে মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জন্য খুব স্বাদের। সেটাকে আপনি যদি ঘন্টায় ঘন্টায় খান তবে পেট খারাপ হতে বাধ্য। তবে আপনার জন্য একটা সুখবরও আছে।“

“কি?!”

“উদাহরন দিয়ে বলি। কম্পিটার ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ভাইরাস প্রথম কি করে জানেন? কম্পিটারের ভাইরাস গার্ডকে অকেজো করে দেয়। এরপর অন্য কোন ভাইরাস গার্ডকে ইনষ্টল করতে দেয় না। অর্থাৎ কম্পিউটারকে বুঝতেই দেয় না সে আক্রান্ত। ফেইসবুকও তাই করে। আমি আমার জীবনে আজ পর্যন্ত যে কজন ফেইসবুক মাতাল দেখেছি। তারা কেউ স্বীকারই করবে না যে তারা এটি অতিরিক্ত করছে। হয় বেমালুম অস্বীকার করবে। নয়তো বলবে…এটা তার একটিভিজম। তারপর আর কথা চলে বলেন? এতো বড় দায়িত্ব জুকার মামা তাকে দিয়েছে। সেটাকে আসক্তি বলে সাধ্য কার। কিন্তু আপনার রোগ নিয়ে আমি আশাবাদী। মনে করছি আপনার রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই আছে। আপনি জানেন এবং মানেন আপনার ফেইসবুক ব্যবহার অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ খুব পরিষ্কার। আপনার রোগ নিরাময়যোগ্য। যুক্তি ঠিক আছে?”

শরীফ ভাইয়ের মুখ উজ্বল হয়ে উঠলো। “ঠিক! একদম ঠিক। এবার ব্যবস্থাপত্র বল।“

আসল মুশকিলে পড়লাম এখন!

কি বলবো? সারা পৃথিবী এই সমস্যা নিয়ে ভাবছে। হঠাৎ শরীফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার প্রাপ্তবয়স্ক মুখে প্রচন্ড দু:চিন্তা দেখে ছবির মতো কতোগুলো ঘটনা মনে পড়ে গেল। মনে হলো বিষয়টা আসলে মজা করার বিষয় নাই আর। এটা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক অন্ধকার।

এই কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বছরের একটি মেয়ের মোবাইল ফোন বাবা-মা কেঁড়ে নিয়েছিলো বলে সে আত্মহত্যা করেছে।

আমার এক পরিচিত মানুষ খেলা খেলা তর্ক করতে করতে প্রচণ্ড সোশ্যাল মিডিয়া বুলির স্বীকার হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিল। তার পরিবারও এই মানসিক নির্যাতনের বাইরে ছিল না। একগাদা মানুষ মিলে সোশ্যাল মিডিয়া বুলির মতো এতো ভয়ংকর বুলি আর নাই।

কতোবার ভুয়া খবর ছড়িয়ে মানুষ মরেছে? ধর্মালয় ধ্বংস হয়েছে? ঘৃনা-বিদ্বেষ মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে? অযোগ্য-অশ্লীল অনাসৃষ্টিকে ভাইরাল করে দিয়েছে?

ছোটোবেলায় আমরা স্কুল-কলেজে বির্তক করতাম ‘বিজ্ঞান আর্শীবাদ না অভিশাপ?” উত্তর আসলে আমরা জানতাম। বিজ্ঞান আর্শিবাদও না। অভিশাপও না। আমরা সেই বিশেষ জ্ঞান নিয়ে কি করছি…কতোটা করছি সেটাই নির্ধারন করে তার ফলাফল।

আমি মাথা নিচু করে বললাম, “শরীফ ভাই, কল নিউপোর্ট (Cal Newport) একজন মেধাবী কম্পিউটার সায়িন্টিষ্ট..বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আধুনিক মানুষ। এ যুগের মানুষ। তিনি একটা বই লিখেছেন। সেই বই এখনো যাদের শুভ বুদ্ধি আছে তারা বুবুক্ষের মতো পড়ছে। বইটার নাম ‘Digital Minimalism: Choosing a Focused Life in a Noisy World’। নিউপোর্ট বলেছেন, কাজটা অতি কঠিন। আমরা যা বুঝি তার চেয়েও কঠিন। কারন পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী মানুষেরা….সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে পরিকল্পিতভাবে এই আসক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফেইসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, ইনষ্টাগ্রাম। নিউপোর্ট বলছেন, ফেইসবুক এ্যাপ তৈরী হয়েছে ক্যাসিনোর প্রোগ্রাম রুল ফলো করে। এই যে আপনি..আপনার ওয়াল স্ক্রল করে টেনে ছেড়ে দেন…এটা সেই ক্যাসিনোর হ্যান্ডেল টেনে ধরার মতো নেশা দেয়। আপনার ওয়াল রিফ্রেশ হয়। আপনি নতুন একটা কিছু পান। আবার টানেন। আবার পান। হাতল চলতে থাকে। এদের ব্যবসায়িক মডেল পাল্টানোর সামর্থ এখনো কারো নেই। লড়াইটা তাই অসম। বইটা আপনাকে পড়তে বলবো। নিউপোর্টের অনেক ইন্টারভিউ আছে ইউটিউবে। শুনতে পারেন। সে কিছু ব্যবস্থার কথা বলেছে।“

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাইরে তুষারপাত কমে গেছে। আমাদের কফি শেষ। এখন উঠা যায়। বাইরে কি পবিত্র সাদায় ভরে আছে। ধব ধব করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে কোন গ্লানি নেই। অন্ধকার নেই। মনে হচ্ছে তুষারে হাঁটু ডুবিয়ে হাঁটি। পায়ের নিচে বালির মতো কিচ কিচ করুক সাদা তুষার। আহ্‌!

শরীফ ভাই আস্তে আস্তে বললেন, “সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর আমি, তোমার ভাবী..আমার মেয়েটা…সবাই..সবাই..ঘন্টার পর ঘন্টা..কথা নাই…..ঐ বাসা মানুষের নাই…ভাল্লাগেনা। কিন্তু নিজে ঠিক না হয়ে অন্যকে বলি কি ভাবে।“

আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। আসলেই তুষারে পা ডুবিয়ে হাঁটতে খুব ভালো লাগছে।

“শরীফ ভাই….প্রথমে যেটা করতে হবে সেটাই সবচেয়ে কঠিন। আবার সহজও। ফেইসবুকসহ এইসব এ্যাপগুলোকে আপনার সংগে চব্বিশ ঘন্টা পায়ে পায়ে হাঁটা বন্ধ করে দিতে হবে। বুঝতে পারছেন? সব সময় আপনার সংগে কে থাকে? আপনার ফোন। ফেইসবুক এ্যাপ মোবাইল থেকে ফেলে দিতে হবে। আপনারতো ল্যাপটপ আছে। সেখানে ব্যবহার করুন। আপনি বিস্মিত হয়ে দেখবেন আপনি আসলে কিছুই মিস করছেন না। এতেই আপনার ৫০% বা তারও বেশি ব্যবহার কমে গেছে। হাতে অনেক সময় পাচ্ছেন। যাদের কম্পিউটার নেই বা ফেলে দেয়ার শক্তি নেই। তাদের জন্যও ব্যবস্থা আছে। বাসায় ফিরে মোবাইলটা দরজার কাছে কোন একটা টেবিলে রেখে দিতে হবে। শর্ত একটাই সারা রাত আর এই মোবাইল টেবিল থেকে সরানো যাবে না। মোবাইলটা আপনি বাইরে গেলে মোবাইল। কিন্তু বাসায় ফিরলে বাসার সেই প্রাচীন ফোন। সেই ফোনের মতোই এক জায়গায় আটকে থাকে। যা করার এই টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করতে হবে। জানি মেনে নেওয়া কঠিন। আবার খুব কঠিনও না।“

আরো কিছু বলার ছিলো। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করলো না। সেই পিচ্চি কিউটের ডিব্বা মেয়েটা লাল টুকটুকে একটা জ্যাকেট পরে দৌড়ে কফি শপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারপর আমাকে দেখে সে কি খুশী। দৌড়ে চলে এসেছে। আমি আমার শীতের টুপি কফি শপে ফেলে এসেছিলাম। সে তুলে আমাকে ফেরত দিতে এসেছে। মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হাসছে।

আমি টুপি মাথায় দিয়ে আর্মী স্টাইলে একটা স্যালুট দিলাম। থ্যাংকু দিলাম। তারপর বাংলায় আস্তে আস্তে বললাম, “মারে…আমার টেন্স…ভয়েস চেঞ্জে গোলমাল….মাফ করে দিস। এই কনকনে শীতের রাতে তোর জন্য ভারচুয়াল না, একটা সত্যিকার মানুষের উষ্ণতায় ভরা ঘর…পরিবার….বেঁচে থাকুক…এই দোয়া করি।”

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]