ফেসবুক এখন আড্ডার টেবিল নয়, ঝগড়ার মাঠ

সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ ছবিতে উৎপল দত্ত অভিনীত মনমোহন চরিত্রটি বাঙালির আড্ডাকে ভালোরকম ধোলাই করেছিলো। বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানো সেই মনমোহন আড্ডার তালুক কেবল বাঙালিকে দিতে রাজি হননি। বরং আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের আড্ডাকে ‘আড্ডা, বাট অ্যাট দ্য হায়েস্ট লেভেল’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই আড্ডার আখড়া ছিলো জিমন্যাসিয়াম, যেখানে শরীরের পাশাপাশি মনেরও ব্যায়াম চলতো। সক্রেটিস, প্লেটোদের মতো ব্যক্তিত্বের কথাও সে প্রসঙ্গে চলে এসেছিলো। 

কিন্তু বাঙালি যে আড্ডাপ্রিয় এক জাতি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আড্ডা দেয়ার সুযোগ পেলে আমাদের সময় যে কোন ফাঁক গলে হারিয়ে যায় তার হিসাব রাখা বেশ কঠিন। একটা সময় ছিলো আড্ডা হতো রেস্তোরাঁয়, গলির মোড়ে, সেলুনে, মাঠে, বন্ধুদের বাড়িতে ছুটির দিনে। আড্ডার সুসময় ছিলো সেটা। কিন্তু এখন? স্যোশাল মিডিয়ার যুগে সেই আড্ডা উঠে এসেছে মুঠোফোনে, আরেকটু খুলে বললে ফেসবুকের রাজ্যে। মোটামুটি এক দশকের কাছাকাছি হয়ে গেল ফেসবুকের রাজত্ব শুরু হয়েছে।  তারও আগে অর্কুট ছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, অর্কুট ছিলো ছেলেমানুষ। শুধু অর্কুট কেন, ইয়াহু মেসেঞ্জার বা আরও যে সব চ্যাট রুম এক সময়ে দাপিয়ে বেরিয়েছে, তারা কেউই ফেসবুকের মতো এতোটা দাপট দেখাতে পারেনি। মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার ডালভাত হয়ে যাবার পর ফেসবুক তার শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে মানুষের মনের অন্দরমহলে। আমরা স্বীকার করি বা না-ই করি, চলতে ফিরতে ফেসবুকের একটা এফেক্ট আপনার জীবনে আছে।

ফেসবুক এক আজব জগৎ। আমরা কে কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কী পরছি, কী ভাবছি— সবকিছু নিজের দেওয়ালে খুলে ধরতে না পারলে ব্যবহারকারীদের মনে শান্তি আসে না। লাইক আর কমেন্টের বন্যায় কেটে যায় সময়।ভার্চুয়াল পৃথিবীর আড্ডা এখন এই ফেসবুক।

এই ফেসবুক এখন আড্ডার টেবিল হয়ে ওঠার চাইতে তর্ক আর ঝগড়ার মাঠও হয়ে উঠেছে। রাজনীতি থেকে সিনেমা, সিনেমা থেকে লেখালেখি হয়ে ব্ল্যাকমেইলিং-সবই এখন ফেসবুকের পাতায়। একটা সময়ে শোনা যেতো ‘চায়ের কাপে ঝড়’ কথাটা। চায়ের সঙ্গে তখন থাকতো গরম সিঙ্গাড়া অথবা পিয়াজু। আর এখন কথার পিঠে থাকে কেবলই অফুরন্ত খই ফোটা উত্তপ্ত কথা। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সেই তর্ক-বিবাদ এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে।

বাঙালির আড্ডার প্রধান রসদ পরনিন্দা-পরচর্চা, সে কথাও বলার চেষ্টা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ফেসবুকের কল্যাণে সেটা দারুণ ভাবে এখন উপলব্ধি করা যায়। আর সেই নিন্দামন্দই জন্ম দিয়ে চলেছে ধৈর্যহীনতার। আসলে ফিজিক্যাল আড্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে যা চলতো, সেটা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এসে অন্য এক চেহারা ধারণ করেছে। সময় নেই হাতে এই অজুহাতে ফেসবুকের পাতায় চকিতে প্রবেশ এবং তারপর আচমকা কমেন্ট করে দিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার রীতিটা ফেসবুক সংস্কৃতির বড় অংশ। মাইক্রোসফটের একটা সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, সবথেকে কম মনঃসংযোগ এতদিন ছিল গোল্ড ফিশের। ১২ সেকেন্ডের বেশি তারা মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু মানুষ তাকেও হারিয়ে দিয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে সময়টা গড়ে ৮ সেকেন্ড!

এভাবেই পরস্পরকে কমেন্ট ছুড়তে ছুড়তে যাওয়া। কারোই যেন সময় নেই, কেবল নিজের তূণ থেকে বাক্য ছুড়েই মিলিয়ে যাওয়া। স্বাভাবিক ভাবেই, বিরোধিতা আরও বড় হলে ধৈর্য হারিয়ে এক সময়ে অবস্থা আরও গম্ভীর চেহারা নেয়। এভাবেই চলছে। যে কোনও কিছুতেই সহজে ধৈর্য হারিয়ে বাঙালি বিচরণ করে চলেছে ফেসবুকে। আর

এই ধৈর্যহীনতার অভ্যাস যে আমাদের আড্ডার সেই মধুর পৃথিবী থেকে বের করে ঠেলে দিচ্ছে সংঘাতের অন্য এক অচেনা পৃথিবীতে সেটা বোধ হয় সবাই ভালো করে বুঝতেও পারছে না। ফলে ফেসবুকের দেয়ালে আমাদের মন্তব্যগুলো গুলির মতো, কখনো হাতবোমার মতো আছড়ে পড়ছে। তর্ক করতে গিয়ে ধৈর্যহীন মতপ্রকাশ বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে সম্পর্কের। রাগ আর ক্ষোভ জায়গা দখল করছে সম্প্রীতির। আমাদের বিষয়গুলো ভেবে দেখার সময় এখনই।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল