ফ্যামেলী ডে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): কানাডায় ফেব্রুয়ারী মাসের তৃতীয় সোমবার ফ্যামিলী ডে পালন করা হয়। সরকারী ছুটি থাকে। রাষ্ট্র চায় এইদিন মানুষ তার পরিবারের সংগে থাকুক। পরিবার শক্ত হোক। ভালোবাসায় ভরে উঠুক।

বাড়ীতে বাড়ীতে পারিবারিক ডিনার হয়। দুর-দুরান্ত থেকে ভাই-বোন..মা-বাবা মিলিত হয়। এই সময় ঠান্ডা বেশি থাকে। তাই খাবারের তালিকায় হট চকলেট বা বাসায় বানানো গরম গরম কুকিজ থাকে।

ছুটির দিন। বিকেলের দিকে আমি আর তরংগ গাড়ী নিয়ে ঘুরছিলাম। হঠাৎ নজড়ে পড়লো কিছু মানুষ। পাশাপাশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একটা বিশাল কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাউন্ডারীর ভেতরে মানুষগুলো একটা কবর ঘীরে দাড়িয়ে ছিলো। আমরা রাস্তা থেকে দেখছিলাম। মানুষগুলোর মধ্যে কথা হচ্ছিলো না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো। আশে পাশের কবরগুলোতে তাজা ফুল দেখলাম। বুঝলাম ফ্যামিলী ডে-তে পরিবারের সব সদস্য রাতের ডাইনিং টেবিলে সশরীরে আসতে পারে না। কেউ কেউ এতো দূরে চলে যায় যে তাদের সংগে মিলিত হতে বাকীদের তাদের কাছে আসতে হয়।

আমার ছেলের বয়স তখন দেড়। মাঝে মাঝেই এটা-সেটা হতো। জ্বর, সর্দি, পেট খারাপ…। যেরকম হয়। আমি নতুন বাবা। নার্ভাস হয়ে যাই। সেবারের জ্বরটা যাচ্ছিলো না। সপ্তাহখানেক পার হয়ে গেলো। ছেলে খাওয়া বন্ধ করে দিলো। খেলা বন্ধ করে দিলো। আমার কোলে এসে উঠলো। আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম। ব্লাড টেষ্ট হলো। টাইফয়েড। হাসপাতালে নিতে হলো।

ইনজেকশন শুরু করতে হবে। প্রতিদিন একটা করে। এক সপ্তাহ বা তারও বেশি। দেড় বছরের বাচ্চাকে এমনি এমনি সুই দিয়ে ইনজেকশন দেয়া গেলো না। কারণ টাউফয়েডের ইনজেকশন দিতে হলে শরীরে সুই ঢুকিয়ে বেশ কিছুক্ষন ধরে অনেকখানি ঔষধ আস্তে আস্তে পুশ করতে হয়। আমার ছেলে চিৎকার করে, আমার দিকে দুইহাত বাড়িয়ে…চোখ ভরা জল নিয়ে সমানে হাত-পা নাড়াতে থাকলো। সুই নড়ে গেলো। আমি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

ডাক্তার জানালেন বিকল্প একটাই। ভেইনে বাটারফ্লাই ক্যানোলা সেট করতে হবে। বাঁকানো একটা সুই ভেইনে ঢুকিয়ে টেপ দিয়ে রেখে দেয়া হবে। সুইয়ের মাথা বের হয়ে থাকবে। সময়মতো সেই ছিদ্র দিয়ে ইনজেকশন পুশ করা হবে।

আমি আমার অসুস্থ লিকলিকে ছেলেটিকে বুকে নিয়ে বসে রইলাম। আমি যতোবার চিন্তা করছি…..ডাক্তাররা জোর করে তার শরীরে ক্যানোলা ডুকাচ্ছে..আমার ছেলে চিৎকার করছে..কাঁদছে…আমাকে ডাকছে…এর বেশি আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ছেলেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বসে আছি।

আমার মেঝ ভাই ডাক্তার। সে ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছে। বুঝে ফেলেছে আমি পারবো না। সে জোর করে আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। ক্যানোলা লাগানোর পুরো সময়টা আমি শিশুর মতো কেঁদেছি।

অসুখের পুরো দুই সপ্তাহ ছেলে আমার কোল থেকে নামেনি। শুধু যখন সে গভীর ঘুমে থাকতো আমি আস্তে করে তাকে কোল থেকে নামিয়ে একটু রেষ্ট নিতাম। হাটাহাটি করতাম। বাথরুমে যেতাম। বাকি সময় ছেলে কোলে নিয়ে বসে থেকেছি।

ছেলে এখন বড় হয়ে গেছে। এই কয়েকদিন আগে তাকে সেইভ করা শিখালাম। সে প্রথম বার নিজে নিজে সেইভ করতে গিয়ে একটু কেটে ফেললো। আমি পিছে দাড়িয়ে ছিলাম। যদি আমাকে লাগে। অল্প রক্ত বেরুলো। সে ভয় পেলো না। আমাকে ডাকলো না। শান্তভাবে আমারই আফটার সেইভ লাগালো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে আয়নার আমার সন্তানের পুরুষ হয়ে যাওয়া দেখছিলাম।

২০২০ লিপ ইয়ার। ফেব্রুয়ারী হবে উনত্রিশ দিনে।

কোন এক ফেব্রুয়ারী মাসে আমার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
কোন এক ফেব্রুয়ারী মাসে ছন্দর বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

কোন এক ফেব্রুয়ারী মাসে আমার একমাত্র সন্তান জন্ম নিয়েছে।

আমাদের জীবনের চুড়ান্ত কষ্ট আর অসম্ভব আনন্দ এই ফেব্রুয়ারী মাসে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

সম্ভবত প্রকৃতি কোন কিছু না দিয়ে কোন কিছু কেঁড়ে নিতে পছন্দ করে না।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]