ফ্রয়েড, কোকেন আর সেই বাড়িটা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লন্ডনের উত্তর-পশ্চিম হ্যাম্পস্টেড এলাকার ম্যারস্ফিল্ড রাস্তার ২০ নম্বর বাড়ি। এই বাড়িতেই জীবনের শেষ সময়টা কেটেছে পৃথিবী বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের। নিজের প্রিয় শহর ভিয়েনা থেকে অনেক অনেক দূরে।

ইংল্যান্ড চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন আধুনিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই মনস্তত্ত্ববিদ। কারণ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কাছে তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিলো তিনি ইহুদি, অতএব তাকে খুব সহজই খুন করা যায়। হননের যোগ্য। অথচ তখন তাঁর খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে। বিভিন্ন দেশ থেকে ভিয়েনার ১৯ বের্গেসিতে আসতেন রোগীরা তাকে দেখানোর জন্য।

তরুণ ফ্রয়েড

১৯০০ থেকে ১৯৩০-এই সময়ের মাঝে অর্থাৎ তাঁর চুয়াল্লিশ বছর বয়েস থেকে আশি, এই সময়টাতে  ফ্রয়েড পরিণত হয়েছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তিতে। তখনই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এমন সব তত্ত্বের বই যা পড়ে চমৎকৃত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের  মনোবিজ্ঞানীরা। ফ্রয়েডের তত্ত্ব নাড়িয়ে দিয়েছিলো মধ্যবিত্ত সমাজের ভিত। ফ্রয়েড জানিয়েছেন, মানুষের মনের মধ্যে আছে অজানা অচেনা এক অবচেতন, যার সিংহভাগ জুড়ে নানান গোলমেলে যৌন ইচ্ছে, ভীতি আর হিংসার প্রবণতা! শিউরে ওঠার মতো তথ্য। কিন্তু তবু কী অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ফ্রয়েডীয় থিয়োরির।

তরুণ বয়সে ফ্রয়েড কোকেনের নেশায় আসক্ত হয়ে ‍উঠেছিলেন। পৃথিবীকে চমকে দেয়া এই মনোবিজ্ঞানীর আসক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁরই লেখা একটি চিঠিতে। বন্ধু ও সহকর্মী উইলহেলম ফ্লসিসকে তিনি লিখেছেন, ‘আমার এখন অনেক পরিমাণ কোকেন প্রয়োজন। মাথার মধ্যে নতুন নতুন চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে, ধরা দিচ্ছে তত্ত্ব।’ কোকেনের নেশা কিন্তু তরুণ বয়েসে বিপদেও ফেলেছিলো। ১৮৯৫ সালে এমা একস্টেইন নামে এক ফরাসী ভদ্রমহিলার মনোরোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে ফ্রয়েড পরীক্ষামূলকভাবে কোকেনের ব্যবহার করে মহা বিপত্তি ঘটিয়ে ফেলেন।তিনি এবং তাঁর এক বন্ধু চিকিৎসক মিলে  মহিলার মনোরোগের সঙ্গে নাক ও যৌনাঙ্গের সংযোগ খুঁজে পেয়ে নাকে একটা অপারেশন করেন। আর সেখানে তিনি মহিলার নাকে অনেক পরিমাণে কোকেন ঢুকিয়ে দেন অপরারেশনের জন্য। সেই বিচিত্র এবং পরীক্ষামূলক অস্ত্রপচারের পাল্লায় পড়ে ভদ্রমহিলার মৃত্যু হয়। ফ্রয়েডের পেশাজীবন বিপত্তির মুখে পড়ে। ওই সময়ে মানসিক যাতনা থেকে মুক্তিপেতে এই বিজ্ঞানী কোকেনের আশ্রয় নেন। ওই সময়ে বন্ধু ফ্লসিসকে লেখা চিঠিতে বারবার উঠে আসে কোকেন প্রসঙ্গ। ফ্রয়েড চিঠিতে চিঠিতে কোকেন নিয়ে ভালো থাকার কথা উল্লেখ করেন। ফ্রয়েড যখন মনোবীক্ষণ, স্বপ্নের ব্যাখ্যা এবং ইডিপাস কমপ্লেক্স নিয়ে কাজ করছিলেন তখনও তিনি থাকতেন কোকেনের নেশায় বুঁদ।  জীবনী লেখকরা তাদের লেখায় এমন মন্তব্য করেছেন।

ফ্রয়েড তাঁর প্রেমিকা মার্থা বারনেইসকে লেখা চিঠিতেও কোকেনের কথা উল্লেখ করেছেন। সেসব চিঠিতে তিনি লিখেছেন, কোকেন তাকে যেমন মনকে শান্তি দেয় তেমনি মন:সংযোগেও সাহায্য করে। ফ্রয়েড নিজের রোগীদের কোকেন নেয়ার জন্য বলার পাশাপাশি প্রেমিকাকেও এই নেশায় আসক্ত হতে আহ্বান জানান। কে জানে হয়তো কোকেন নিয়ে আসক্তির ঘোরের মাঝেই এই এই দাপুটে মনোবিজ্ঞানী খুঁজে পেয়েছিলেন মনের গহীনের খবর।

পৃথিবীর প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করে ১৯৩৩-সালে  জার্মান রাইখের অপ্রতিরোধ্য নেতা ও নায়ক অ্যাডল্ফ হিটলারের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে । দুঃসময় যে আসছে তার অশনি সঙ্কেত ছিলো হিটলার-সমর্থক নাৎসিদের বামপন্থা, গণতন্ত্র বা মানুষের অধিকার সংক্রান্ত বইয়ের প্রতি আক্রোশের মাঝে। কার্ল মার্ক্স, টমাস মান, কাফকা, আইনস্টাইনের বইয়ের সঙ্গে ফ্রয়েডের বইও স্তূপাকার করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিলো তখন। খবরটা শুনে ফ্রয়েড নাকি একটু শ্লেষের হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘মধ্যযুগ হলে আমাকেও পুড়িয়ে মারতো, এখন তো শুধু আমার লেখা বই জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এরা কতটা অগ্রসর হয়েছে ভাবো।’ ফ্রয়েড কি তখন ভাবতে পেরেছিলেন সেই ঘটনার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় নাৎসিরা হাজার হাজার ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে চালান করবে? এই সময়ে ফ্রয়েড নেশা থেকেও দূরে সরে এসেছেন। কোকেনের নেশার অন্ধকার দিকটি নিয়েও অনেক তথ্য উপস্থিত করেছিলো বিজ্ঞান। ফ্রয়েড চেষ্টা করেছিলেন নিজের সেই অতীত অধ্যায়টিকে মুছে ফেলবার। তবে প্রিয় চুরুট খাওয়ার নেশাটি  কখনোই পরিত্যাগ করতে পারেননি এই বিজ্ঞানী।

জার্মান আগ্রাসনের মুখেও ভিয়েনা ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শে কান দেননি ফ্রয়েড। বলেছিলেন, এ শহর ছেড়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। একে তিনি বৃদ্ধ, তায় চোয়ালের ক্যানসারে ভুগছেন এক দশক ধরে। বার বার যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচারে কাবু, তবু সিগার ছাড়তে নারাজ জেদি মানুষটি বলেছিলেন, এই অবস্থায় অন্য দেশে ‘রিফিউজি’ হয়ে থাকার কোনও বাসনা তাঁর নেই। তা ছাড়া জার্মানিতে যা হয়েছে, সত্যি কি তা অস্ট্রিয়ায় হবে?

কিন্তু সেই দুঃস্বপ্ন সত্যি হলো, পাঁচ বছরের মধ্যে। ১৯৩৮ সালের ১৪ মার্চ হুডখোলা মার্সিডিজ়ে চেপে হিটলারের ভিয়েনা প্রবেশের দৃশ্যে আনন্দে ফেটে পড়েছিলো রাস্তার দু’পাশে জড়ো হওয়া মানুষ। তাদের হাতে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা পতাকা, মুখে একটাই বুলি, ‘ হিটলারের জয় হোক’। অস্ট্রীয় নাৎসিরা, যারা এত দিন ঘাপটি মেরে দিন গুনছিল তাদের প্রিয় ফ্যুয়েরারের, তখন তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিলো নারকীয় উল্লাস। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছিল ইহুদিদের দোকান লুঠপাট, ভাঙচুর, রাস্তায় ধরে অপমান, মারধর। এতেও ভয় পাননি ফ্রয়েড। এমনকি যে দিন বাড়িতে হাজির হয়েছিলো নাৎসি বাহিনী, শোনা যায়, নিজের স্টাডিতে পড়াশোনায় মগ্ন অশীতিপর মনস্তত্ত্ববিদ প্রথমে টেরই পাননি তাদের  উপস্থিতি। বুঝতে পেরে ধীর পায়ে হেঁটে এসে, স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন লুঠতরাজ করা নাৎসিদের  দিকে। ফ্রয়েডের সেই বিখ্যাত চাউনিতে নাকি চুপসে গিয়েছিলো হিটলারের খুনে বাহিনীর সদস্যরা।

কিন্তু তাঁরও বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেলো , যে দিন বাড়িতে গেস্টাপো এসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গেল তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান অ্যানা ফ্রয়েডকে। যদিও অ্যানা এক বারের জন্যও বিচলিত হননি নিষ্ঠুর জার্মান পুলিশকে দেখে। শান্ত ভাবে হুডখোলা গাড়িতে চেপে চলে গিয়েছিলেন সিগমুন্ড-কন্যা, যিনি শুধু পিতার ভালবাসার পাত্রীই নন, ছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্যা ও সচিব, তাঁর নিশ্চিন্ত নির্ভরতার মানুষও। ব্যক্তিগত ব্যাপারে তো বটেই, নিজের সমস্ত চিন্তাভাবনা অ্যানার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন ফ্রয়েড। সেই অ্যানাকে গেস্টাপো তুলে নিয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। অনেক রাতে অ্যানা ফিরে আসার পর স্বস্তির গভীর নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বৃদ্ধ পিতা। সেই রাতের পর থেকেই ফ্রয়েড বুঝতে পারেন, ভিয়েনা আর নিরাপদ নয়। চলে যেতে হবে সব ছেড়ে।

কিন্তু যাবেন কোথায়? আমেরিকায় তার বহু ভক্ত। অথচ ফ্রয়েডের সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে ঘোর অনীহা। কাছেপিঠের মধ্যে ইংল্যান্ড, সেখানেও তাঁর গুণগ্রাহীর অভাব নেই। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রধান আর্নেস্ট জোন্স এগিয়ে এলেন এই বিজ্ঞানীকে সাহায্য করতে। বহু ব্রিটিশ হোমরাচোমরাদের সঙ্গে ওঠাবসার সূত্র কাজে লাগিয়ে সরকারকে রাজি করিয়ে ফেললেন জোন্স। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মিললো ছাড়পত্র। ১৯৩৮ সালের ৪ জুন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে উঠলো ফ্রয়েড পরিবার। ট্রেন যখন ধীর গতিতে জার্মানির সীমানা পেরিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করলো, তখন নাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন ফ্রয়েড। রাইন নদীর ওপর দিয়ে ঝুকঝুক করে চলেছে ট্রেন। জল যেখানে ছুঁয়েছে আকাশের বিস্তার, সেই সীমারেখার দিকে তাকিয়ে মাতৃভাষা জার্মানে ফ্রয়েড উচ্চারণ করেছিলেন তিনটি শব্দ, ‘‘এখন আমরা স্বাধীন।’’

ওই বছরের ৬ জুন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে ভিড় জমিয়েছিলো লন্ডনবাসী, প্রিয় সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে দেখার জন্য। বস্তুত জীবনের শেষ একটি বছর লন্ডনে স্বস্তিতে আর আরামেই কেটেছিলো ফ্রয়েডের। আর্নেস্ট জোন্স ফ্রয়েড ও তাঁর পরিবারের জন্য খুঁজে বের করেছিলেন ১৯২০ সালে তৈরি পুরনো দিনের স্থাপত্যরীতিতে গড়া বিশাল এক ম্যানসন। সেই বাড়ি কিনে অনেক অদলবদল করেছিলেন পেশায় স্থাপত্যবিদ কন্যা। এমনকি সিঁড়ি ভাঙতে ফ্রয়েডের কষ্ট হয় বলে বাড়িতে বসেছিলো সুন্দর ছোট্ট লিফ্‌টও। ২০ নম্বর ম্যারস্ফিল্ড গার্ডেনস-এর আলো-হাওয়া মাখা সেই বিশাল বাড়িটিকে পছন্দ করেছিলেন ফ্রয়েড।  ফ্রয়েডের সেই শেষ আবাসস্থলটি এখন জাদুঘর করে রেখেছেন বৃটেনের সরকার।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র: ন্যারেটিভলি হিস্ট্রি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট

ছবি: ন্যরেটিভলি হিস্ট্রি, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]