ফ্রিডম…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

এটি আমার সপ্তাহান্তের চাকরি। গত সপ্তাহে যেতে পারিনি। আইবিএমে ওভারটাইমের তাগিদ ছিলো। কাল তেরেসাকে ফোনে মেসেজ দিয়ে রেখেছিলাম। আজ মিস করবো না। সকাল ১০টায় যথা সময়ে তার বাড়িতে হাজির হবো।

আমার বাড়ি থেকে ৩৫ কিমি পথ। রাইনবেকের গহীন অরণ্যের পথ। গাড়ি ছোটার সময় লক্ষ্য করছিলাম ছোটখাট পশু এমনকি হরিণও রাস্তার মাঝে কিংবা পাশে মরে পড়ে আছে।

তেরেসার বাড়িটি টিলার উপর। আমি যখন গিয়ে পৌঁছলাম- শুনশান নীরবতা। ফোন থেকে কল দিলাম। কিছুটা কেঁপে কেঁপে এক বৃদ্ধ বের হলেন বাড়ি থেকে। জিজ্ঞেস কর

তেরেসা ও তার স্বামীর সঙ্গে

লেন- তুমি কি সেইফ ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর? আমি আমার লাইসেন্স বের করে দেখালাম। একটি কার্ডও দিলাম।

অত:পর ভদ্রলোক বললেন- ওর তো আজ সকালে শরীরটা ভালো লাগছে না, তাই যেতে চাচ্ছে না। আমি বললাম- তুমি এটা কী বলছো? তুমি আমাকে একটি কল অথবা টেক্সট করেও তো জানাতে পারতে? আজই প্রথম লেসন দেয়ার জন্য আমি এত পথ মাড়িয়ে এসেছি! তেরেসা যদি আজ লেসন নিতে রাজি না হয়, তবে তোমাকে পে’ করতে হবে। ড্রাইভিং স্কুল তোমাকে মাফ করবে না!

বললাম- আমি বরং ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করছি। উনাকে বলো তৈরি হতে। ১০ মিনিটের মাথায় তেরেসা বের হয়ে এলেন। তেরেসার সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। আমার সমস্ত বিস্ময় অন্তরে রেখে বললাম- তেরেসা আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে তুমি শেষ পর্যন্ত এসেছো। তোমার ভয়ের বিন্দুমাত্র কারণ নেই। আমি তোমাকে নিরাপদ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়ে পরীক্ষায় নিয়ে যাবো। এবং লাইসেন্স পাবার ব্যবস্থা করে দেব।

তেরেসাকে পাশে বসিয়ে পাহাড় থেকে নিজেই গাড়ি নামালাম নিচে। নিচে নেমে ড্রাইভিং আসনে বসালাম তেরেসাকে। তেরেসার মুখের হাঁসি সূর্যের আলোয় দীপ্তি ছড়ায়। এক ঘন্টায় তেরেসার ডিএনএ টেস্ট করে ফেলি।

বার্ড কলেজে ইতিহাসের শিক্ষিকা ছিলেন তেরেসা। বয়স ৭৬। ইংরেজী গল্প লেখাও শেখাতেন। ১৭ বছর বয়সেই তিনি লাইসেন্স পেয়েছিলেন গাড়ি চালনার। কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনা তার জীবনের ফ্রিডম কেড়ে নেয়! হাঁটতে গিয়ে পড়ে যান। কোমরের হাঁড় ভেঙে যায়। সেই থেকে স্নায়ুতন্ত্র বিকল হয়। ডিপার্টমেন্ট অব মোটর ভিহাইক্যাল (ডিএমভি) তার গাড়ি চালনার অধিকার কেড়ে নেয়।

মিরিন্ডার সঙ্গে

স্বামী আমারু জোনস একই কলেজের অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে কলেজের চাকরি চালিয়ে যান। আমারুর বয়স এখন ৮৮। দু’জনেই অবসরে গেছেন দশক আগে। আমারুর দিন কেটে যায় বই পড়ে। কিংবা সপ্তাহে একবার মুভি থিয়েটারে গিয়ে। কিন্তু তেরেসার দিন কাটতে চায় না।

তেরেসা পাড়া প্রতিবেশির বাড়ি যেতে চান। যেতে চান নিজের ইচ্ছেমত গ্রোসারি কিনতে। কিংবা লাইব্রেরি থেকে বই আনতে চান নিজেই গাড়ি চালিয়ে। অথচ সে সুযোগ নেই! আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবী অনেকেই তেরেসাকে নিরুৎসাহ করেন গাড়ি চালনায়!

আমি বলি- তেরেসা তুমি তোমার ফ্রিডম ফেরত পেতে চাও না? যারা তোমাকে নিরুৎসাহ করে তারা বাস্তবতা মোকাবিলা করতে ভয় পায়। লক্ষ্য করলাম- তেরেসা অত্যন্ত বুদ্ধিমতি মহিলা। তাঁর বিচারবুদ্ধি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। গাড়ি চালনার প্রতিটি আইন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করেন।

আরো বললাম- তোমার মন থেকে ভয় দূর করাই আমার কাজ। তোমার বাকি সবকিছু ঠিক আছে। আমি নিশ্চিত- পরীক্ষা দিলে তুমি পাশ করবে। সে অবস্থায় আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।

তেরেসা প্রায় ঘন্টাখানেক নিখুঁত চালিয়ে নিজেই পাহাড়ে তুললো গাড়িটিকে। দেখি বুড়ো আমারু প্রেয়সীর জন্য দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বাইরে। তেরেসার মুখ থেকে জেনেছিলাম- আমারু ইহুদী ধর্মালম্বী, কিন্তু ধর্ম মানে না। তেরেসা খ্রিস্টান ক্যাথলিক এবং সপ্তাহান্তে নিয়মিত চার্চে যায়। মনে মনে ভাবলাম- আমারু তাহলে এদেশে আমার মতই সংখ্যালঘু!

যা ভেবেছিলাম, তাই! আমারু আমাকে পেয়ে তার জ্ঞানের বহর মেলে ধরেছে। প্রাচ্য সম্পর্কে তার অগাধ পাণ্ডিত্য। এমনকি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কেও। বললাম- আমার সৌভাগ্য যে তোমাদের মত দম্পতির সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। আর দু:খিত যে, আমার হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই! তা নাহলে তোমার সঙ্গে বসে আরো গল্প করতাম।

এরপর আমাকে ছুটে যেতে হচ্ছে ঘন্টাখানেক গাড়ি চালিয়ে মিরিন্ডার কাছে। মিরিন্ডা ১৬ বছরের তন্বী। গাড়ি চালনা শিখবে। কিন্তু এর সমস্যা হলো কিছুই মনে রাখতে পারে না। বিশেষায়িত স্কুলে পডাশুনা করছে। কিন্তু তাকে নিরাপদ ড্রাইভিং শিখতেই হবে! আমিও চ্যালেঞ্জ নিলাম। মিরিন্ডা শক্তহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে পারে না! ব্রেক থেকে পা পিছনে যায়। কিন্তু একদিন মিরিন্ডাও গাড়ি চালনার ফ্রিডম উপভোগ করবে, সে আশা তার বিলক্ষণ!

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]