ফড়িঙদের ইশকুলে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

তিন.

দুই একে দুই। দুই দুগুণে চার। বিশাল মাঠের কোণায় লম্বা  হলুদ দালান। সেখানে সকালে ইশকুল বসে। সেই ইশকুলে দোলে দোলে মেয়েরা, ছেলেরা নামতা পড়ে। এক থেকে একশ’ গোণে। পড়ে, মুখস্ত করে ‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে।’ ইশকুলের মাঠ পেরিয়ে খালের পূবপাড়ে কাশের বন। সেই বনের ওপারে একটা তাল গাছ দাঁড়িয়ে। আরো একটু দূরে আরো অনেক অনেক তাল গাছ। ফাল্গুন, চৈত্র মাসে  পাগল হাওয়া বইলে তালের পাতারা নটবর হয়ে নেচে ওঠে। তখন ইশকুলের ক্লাসে বসে, কবিতার ছন্দে তাল মেলাতে, নামতার উঠা নামায় মেয়েরা ছেলেরা দেখে নেয় গাছের মাথায় অবাক পাতার নাচন। বাতাসে ডানা পাওয়া পাতাদের তখন মনে হয় এক একটা পঙ্খিরাজঘোড়া। সেই ঘোড়ায় চড়ে অনেকে পড়তে চলে যায় ‘মেঘের ইশকুলে’। মনে মনে।
স্কুল থেকে ফিরে এসে আবার দুপুর, আবার বিকেল। উঠানের পশ্চিম দিকে রান্না ঘর। সেই ঘরের কোণে একটা ডুমুর গাছে। খসখসে তার পাতারা। মোটা সবুজ পাতা। সেই পাতা জোড়া দিয়ে বাসা করেছে টুনটুনি। দুজনের ঘর। একজন এই যায় এই আসে। অন্যজন ঘরে থাকে। ছেলেটা স্কুল থেকে ফিরে দুপুর থেকে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত দেখে টুনটুনির খেলা। সে শুনেছে মা টুনটুনি এই বাসায় ডিম দেবে। সেই ডিম থেকে হবে টুনটুনিছানা। ছেলেটা অপেক্ষা করে টুনটুনিশিশুর জন্যে।

এই অপেক্ষা আর শেষ হতে চায় না। এরই মধ্যে অন্য কাজ এসে ডাক পাঠায় ছেলেটাকে। গরমকালের দিন। বিকালের আগে রোদ থাকে চড়া। গ্রাম ভর্তি গাছ। গাছেরা সারাদিন ছায়া দিয়ে রাখে গ্রামটাকে। তবে মাঠের রোদ শেষ হতে চায় না। তাই বন্ধুদের খেলা জমতে জমতে বিকাল গড়িয়ে যায়। মাঠে একদল খেলায় ডাকে। অন্যদল খালের ওপর বাঁশের সাকো পেরিয়ে যায় ওপারে। ছোট্ট একটা বন। ঠিক বন নয়, বনের মতো। জঙ্গল। সেখানে ছোট-বড় কত কত গাছ। নটার ঝোপ আছে খালের পাড় ঘেষে। সেখানে নটা ঘাসের ওপর অনেক বর্ণের ফড়িঙরা নেচে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায়। উড়ে বেড়ায়। এ গ্রাম থেকে, ও গ্রাম থেকে ছেলেরা, মেয়েরা ফড়িঙ দেখতে আসে। ধরতে আসে। উড়ালডানার ফড়িঙ কেনো মানুষ ধরে, তাদের লেজে সুতো বেঁধে আবার উড়তে দেয় তা ভেবে পায় না ছেলেটা। পাখিদের খাঁচায় আটকে রাখা পছন্দ নয় ছেলেটার। ফড়িঙ দেখতে খুব ভালো লাগে তার। ফড়িঙদের ওড়াউড়ি দেখে মন ভরে যায় ছেলেটার। পাটকাঠির এক মাথায় নারকেল পাতার শিড়-শলা বাঁকা করে তাতে মাকড়শা জাল পেচিয়ে তৈরি করা হয় ফাঁদ। দেখতে অনেকটা লং টেনিস ব্যাটের মতো। লম্বা পাঠকাঠির মাথায় ফাঁদ। দূর থেকে সেই ফাঁদে আটকে ফেলা হয় ফড়িঙদের। নরম শরীর। রঙিন পাখায় কত কারুকাজ। সেই পাখায় মানুষের হাতের স্পর্শ লাগতেই আহত হয়। ছেলেটা ভাবে সবাইকে বারণ করতে হবে ফড়িং ধরায়। কিন্তু বলতে গিয়ে দেখেছে কেউ তার কথায় পাত্তাই দেয় না। তাই অনেক অনেক কষ্ট নিয়ে সন্ধ্যার নামার একটু আগে ঘরে ফেরে সে। বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া খালের পানিতে হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসে।
আর বইয়ের পাতায় তখন কেবল হাজারটা রং-বেরঙের ফড়িঙ। মাথার ওপর বিশাল এক আকাশ। সেই আকাশের একটু উচুতে উড়ে বেড়াচ্ছে, নেচে বেড়াচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে ফড়িঙ। সেখানে ফাঁদ হাতে একজনও নেই। আরো একটু উঁচুতে সাদা-কালো-নীল অনেক অনেক রঙের মেঘ। সেই মেঘপাহাড়ে, মেঘেদের পাড়ায় ইশকুল বসেছে। ছেলেটা দেখছে সেই ইশকুলে দল বেঁধে পড়তে যাচ্ছে ফড়িঙরা।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]