বইমেলায় প্রেম…

কথা আজো ওড়ে বইমেলার বাতাসে। ভাঙা কথা, বোকা কথা, স্মৃতির পাখি পিঠে নিয়ে উড়ে যায় কথামালা। কথার সঙ্গে ফেরে স্মৃতি। কেউ হাতে হাত রেখেছিলো, কেউ চলে গিয়েছিলো দূরে। কথা ছিলো কারো…কথা আছে হয়তো এখনো।

দুয়ার খুললো অমর একুশে বইমেলার। বইমেলা মানেই নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। পাঠক, লেখকের আসা যাওয়া। এই মেলাকে নিয়ে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘বইমেলায় প্রেমের গল্প’। জনপ্রিয় ফেইসবুক পেইজ পোস্টবক্স-এর লেখকরা লিখেছেন এই গল্পগুলো।   

সা’দ জগলুল আববাস

মেলার গপ্পো

অনেকক্ষন ধরেই মেয়েটি সৌরভের চোখে পড়ছিলো; বট তলা, চা’য়ের স্টল, বইয়ের স্টল যেখানেই সৌরভ যাচ্ছিলো, দৃষ্টি একটু নড়ে গেলেই সাদা-হলুদ কামিজ পরা মেয়েটি তার চোখে ধরা দিচ্ছিলো!
সৌরভের মাথায় প্রশ্নবোধক চিহ্নটা ঝুলে থাকলেও মনে একটা কৌতুহলও দানা বাঁধলো!

দেখতে মন্দ নয় স্নেহা, স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য স্থূল।
একটু চাপা রং, বেশ দীর্ঘ চুল! হাতে ক’টা বই; সম্ভবতঃ মেলা থেকে কেনা ! বইয়ের ঝোলা হাতে নীল পাঞ্জাবী পরা ছেলেটিকে কেন যেন বেশ চেনা মনে হচ্ছিলো।একবার একটা বইয়ের স্টলে একেবারে কাছ থেকে দেখে এসেছিলো, দারুণ এক জোড়া স্বপ্ন ভরা চোখ, চশমার পিছনে..তবে চিনতে পারলো না ! ছেলেটা বার বার তার দিকে তাকাচ্ছিলো, তাকে চেনে নাকি ?

শীত চলে গেছে, ফেব্রুয়ারীর দুপুরের রোদটা একটু চড়া লাগছিলো সৌরভের কাছে! সকাল থেকে বইমেলায় হাঁটাহাঁটি করে খিদেও পেয়েছিলো; দু’কাপ চা ছাড়া আর কিছুই খায়নি! তিনটে বই কেনার পর চা ছাড়া আর কোন কিছু কেনার উপায়ও ছিলো না ! রুমানার আসার কথা ছিলো, আসেনি; এলে বই কেনা হয়তো হতো না ! আরেকবার চারিদিকে তাকিয়ে একটা হাই তুললো, হাঁটা দিলো হলের দিকে; খিদেটা চাগিয়ে উঠেছে!
টি এস সি’র মোড়ে আসতেই পিছন থেকে একটা বামা কন্ঠ, শুনুন…!
সৌরভ এদিক সেদিক তাকালো, ঠিক পিছনেই সেই সাদা হলুদ মেয়েটি!
-আমি স্নেহা, আপনাকে কি কোথায়ও দেখেছি? বেশ সপ্রতিভ জড়তাহীন প্রশ্ন!
-আমার মনে হয় না.. আমি সৌরভ! ইকোনমিক্স দ্বিতীয় বর্ষ! আপনিও কি এই ভার্সিটির ছাত্রী?
-আমি বাংলা নিয়ে পড়ছি, আমারো দ্বিতীয় বর্ষ!
-বাহ্! মনে হয় করিডোরে দেখা হয়েছে।হেসে সপ্রতিভ হবার চেষ্টা চালালে সৌরভ..
-ইয়ে মানে আমি এখন হলের দিকে যাচ্ছিলাম, দেরী করে গেলে খাওয়া পাবো না, পকেটে যা ছিলো,বই কিনতে গিয়ে পকেট গড়ের মাঠ! হলের খাওয়া মিস করলে না খেয়ে থাকতে হবে!সৌরভ কাঁচুমাঁচু হয়ে বললো!
-তাই? একদিন না খেলে কি হয়,হাসতে বাসতে স্নেহা দুষ্টুমি ভরা চোখে প্রশ্ন করলো!
-না তা নয়… সৌরভ একটু অপ্রতিভ হলো!
-হা হা হা, ঠিক আছে … আপনাকে আটকাবো না, আমি রোকেয়া হলেই থাকি; আবার কি দেখা হবে?
-জানিনাতো …
একটু আনমনা মনে হলো সৌরভকে, রুমানার মুখটা ভেসে উঠলো, কেন এলোনা ? এমনতো হয়নি কখনো!
সৌরভ ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালো…হঠাৎ মনে হলো , মেয়েটির হাসিটিতো বেশ!
দু’বছর পর….
সন্ধ্যা হয়ে এসেছিলো, টিএসসির মোড়ে পৌঁছতেই শাড়ি সামলে স্নেহা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো,
-এ্যাই, এখান থেকেই না তুমি খিদার দোহাই দিয়ে কেটে পড়েছিলে?
-আরে নাহ্ , কেটে পড়িনি…আসলেই তখন বেশ খিদে পেয়েছিলো!স্নেহার হাতটা ধরে সৌরভ সামনে এগিয়ে গেলো, হাঁটতে হাঁটতে পা ধরে গেছে , রিক্সা নেবে!

মারুফ শমশের যাকারিয়া

আকাশলীনা

– চলো না দেখা করি।

– কেনো?

-কেনো না?

-দেখা করতেই হবে এমন কোনো কথা আছে?

 

-তা নেই। ম্যাসেঞ্জারে এত কথা বলতে পারো। সামনা-সামনি দেখা করতে এত আপত্তি কেন? আমি কি বাজে

লোক?

-বলেছি তুমি বাজে লোক?

-তোমার চেহারাটাও দেখলাম না আজ পর্যন্ত।

-চেহারা কি খুব ইম্পর্টেন্ট তোমার কাছে?

-না। কিন্তু তুমি তো আমাকে দেখছ ফেইসবুকে। আমারও দেখতে ইচ্ছে করে।

-তাহলে সুন্দর সুন্দর মেয়ের প্রোফাইল পিকচার দেখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাও। আমাকে অ্যাকসেপ্ট করলে কেনো?

– করেছি তোমার সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহ আর অনন্য ছদ্মনামটা দেখে।

-সেটা নিয়েই থাকো।

-আচ্ছা বাদ দাও। কাল ছুটির দিনে কি করবে? বই মেলায় যাবে?

-না। কাল অনেক ভীড় থাকবে।

-কিন্তু শুক্রবার ছাড়া তো দিনের বেলা যেতে পারি না।

-যাও, কে মানা করেছে।

-যেতেই হবে। আমার এক বন্ধুর প্রথম প্রকাশিত বইটির কালকে মোড়ক উন্মোচন হবে।

-কি বই?

-উপন্যাস। নাম – ফেরার।

-বন্ধুর নাম কি?

রুদ্রাদিত্য। ছদ্মনাম। তোমার মতো।

-মানে কি?

-মানে নির্ভীক সূর্য।

-বাহ!

-তোমার সঙ্গে মিল রেখে রেখেছে। ‘আকাশলীনা’ মানে তারা, আর ও সূর্য।

-আমার নাম লেখক পেল কোথায়?

-হা হা …। এমনি দুষ্টোমি করছিলাম।

-তুমি পড়েছ?

-হ্যা।

-কেমন?

-আমার তো ভালো লেগেছে।

-তাহলে তো ভালই হবে।

-আমার ভালো লেগেছে, আমার বন্ধু বলে। তোমার কেমন লাগবে বলতে পারছি না। তুমি তো আবার আঁতেল!

-আমি আবার কবে আঁতলামি করলাম?

-হয়তো পড়ে বলবে – ভালই … তবে শেষে একটা রিপল ইফেক্ট থাকলে ভাল হতো।

– হা হা …… । বেশ লেগেছিলে মনে হয়!

– একটু তো লেগেই ছিলো। আর আমার বন্ধুর উপন্যাস পড়েও তোমার মত উচ্চমার্গের পাঠকের মনে কোন ঢেউ তুলবে বলে আশাকরি না।

– না তুলুক। পড়ে দেখি, কেমন লেখা তোমার বন্ধুর। উনি কি লেখালেখি করতো সব সময়?

– না। তেমন না।

– হঠাৎ একেবারে উপন্যাস!

– হঠাৎই। আমার মতই ফেইস বুকে লেখালেখি করতো। সবাই সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করতো। উৎসাহ দিতো বই করার জন্য। তখন ওরও ইচ্ছে হলো। দেখি না কি হয় টাইপ আরকি।

– ভাল তো। তো তুমিও তো লিখতে পার।

– আমাকে দিয়ে হবে না। বহু চর্বিতচোষ্য গল্পের বাইরে নতুন কোনো কিছু আনা সম্ভব না আমার পক্ষে।

– তোমার বন্ধু তো ঠিকই লিখলো।

– ও বোকা তাই।

– হা হা ।।আচ্ছা। আমি কিনবো তোমার বন্ধুর লেখা প্রথম উপন্যাস মেলা থেকেই। স্টলের নাম্বারটা দিও।

– কালই আসো না! তোমাকে গিফট দিতাম বইটা। একটা সারপ্রাইজও পেতে।

বেশী সারপ্রাইজ দেখাতে যেও না। শেষ নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে বসে থাকবে। যাবো অন্য কোনো দিন।

– আচ্ছা।

– এখন ফুটি। কাল জানিও কেমন হলো বই মেলা।

সকাল সকাল বই মেলায় পৌছালো ফিদা। নিজের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে। কি যে আনন্দ আর চাপা উত্তেজনা! ছোট বেলায় ঈদের দিনে প্রথম সকালের মতো!

ছুটির দিনে সকাল দশটায়ও রাস্তায় লোকজন কম। ঢাকায় শীত পড়েইনি। চলন্ত রিকশায় ঠাণ্ডা হাওয়ায় এক আলাদা ভালোলাগা। মনে হচ্ছিলো রিকশাটা আরেকটু জোরে চালাতে পারে না?

একটু দুশ্চিন্তা ছিলো। সবাই সময় মত আসবে তো। বন্ধুরা আগেই এসেছিলো। স্যার, জনপ্রিয় কথাশিল্পী হক ভাই এলেন কিছুক্ষণ বাদে। শুধু বই-এর মোড়ক উন্মোচিতই হলো না। যেন ওর সাতাশ বছরের জীবন নতুন করে দরজা খুলে বের হয়ে এলো।

সারাদিন মেলা প্রাঙ্গনেই পড়ে রইলো। পরিচিত জন অনেকে এসেছে। বই কিনেছে। অটোগ্রাফ নিয়েছে। অপরিচিত কেউ কিনেছে কিনা বুঝতে পারছেনা। প্রকাশক অভয় দিয়েছেন – এই তো প্রথম দিন, অপেক্ষা করুন!

সিগারেট খেতে কোনায় গেলেও চোখ রেখেছিলো বুক স্টলে। বিকেলের দিকে একটু দূরে চলে গিয়েছিলো। বুক স্টলের ছেলেটা দৌড়ে এসে খবর দিলো যে একটা মেয়ে আপনাকে খুঁজছে স্টলে। ফিদা ভাবলো পরিচিত্ কেউ হবে। প্রফুল্ল চিত্তেই গেলো। আজকে তো ওর দিন! খামাখা ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে লজ্জায়।

স্টলে ঢুকে দেখলো এক অনিন্দ্য সুন্দরী ওর বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। মুখে মিটিমিটি হাসি, চোখে অন্তরভেদী চাহনি! নয়নে নয়ন মেলাতেই, মনে হলো ফিদার সব কিছু ধরা পড়ে গেলো ওর কাছে। কিন্তু কি ধরা পরলো তা ভেবে পেলনা! ফিদা একটু ঘাবড়ে গেলো। মেয়েটি বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো – অটোগ্রাফ দেবেন না?

মাথায় অগণিত প্রশ্ন– কে এই মেয়ে! ওর বই কেন নিতে এসেছে? হাজারো শব্দের মাঝে কোন কিছুই মুখে এলো না। অস্থির মন থেকে মুক্তি পেতে বললো –কি নাম লিখবো?

লেখেন – আকাশলীনা

ফিদার মাথায় হাজার ভোল্টের বাতি জ্বলে উঠলো। চমকে তাঁকালো ওর দিকে। ওর মুখে সেই হাসিই লেগে ছিলো!

 

ফারহানা নীলা

বইমেলায় প্রথম দেখা

এবার ইচ্ছা করেই ফেব্রুয়ারীতে দেশে এসেছে আজাদ রেহান।  দীর্ঘ প্রবাস জীবনে খুব মিস করে বইমেলা…  নতুন বইয়ের ঘ্রাণ।
আজাদ রেহান এক সময়ের দাপুটে নাম। ভার্সিটিতে দাপিয়ে বেড়াতো!
একটা পা হারিয়ে এক্সিডেন্টের পর থিতু হয়েছে প্রবাস জীবনে। ভীষন একটা দুর্ঘটনা… আজো দুঃস্বপ্নের মত তাড়িয়ে বেড়ায়। ভার্সিটিতে আবৃত্তি, বিতর্ক আর নাটক… সবখানে আজাদ রেহানের পদচারণা।

গায়ে কফি রঙয়ের শাল, মেরুন লাল পাঞ্জাবী, ক্র্যাচে ভর দিয়ে টি এস সি থেকে বইমেলায় আসে আজাদ রেহান। সব কেমন বদলে গেছে! কত বদলে গেছে….
অন্যপ্রকাশ স্টলে এসে দাঁড়ায়….  এখনো হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের ঢল! মানুষটা বেঁচে থাকলে আরো কতো বই বেরুতো!

প্রায় বিশ বছর… কতদিন আগে! সুনীতার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো বইমেলায়। সুনীতা শাড়ী আর কাঁধে চটের ঝোলা ঝুলিয়ে ডুবে থাকতো হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের ভিড়ে। প্রতিদিন মেয়েটা আসতো মেলায়…
সেদিন সুনীতা বই দেখছে আপনমনে। পাশে আজাদও বই নাড়ছে… দেখছে সুনীতাকে।
…. খুব হুমায়ুন আহমেদ পছন্দ বুঝি! আজাদ খুব মৃদুভাবে বলে!
…. ভীষন! একেকটা চরিত্রের মাঝে নিজেকে খুঁজি।  নিজেকে আঁকি! কেমন করে যে উনি এমন লেখেন! মনে হয় আমাকেই লিখেছেন!
…. আমি কিন্তু মিসির আলী! হাসে আজাদ রেহান।
… রহস্যময়তা একদম পছন্দ নয়! সুনীতার টোল পরা গালে হাসির ঝলক!

এভাবে কেটে যায় একটা বইমেলা! বিকেল হতেই অদ্ভুত একটা আকর্ষণ…. নিজের অজান্তেই আজাদ চলে যায় বইমেলায়। সুনীতাও অপেক্ষা করে মনে অজান্তে….
এরপর থেকে ভার্সিটিতে দু’জনের একসঙ্গে পথচলা…. সবাই জেনে যায়! ভালোবাসাটা হয়ে ওঠে ওদের চালিকা শক্তি!

সেই দুর্ঘটনা..  সেই আকস্মিকতা!  বদলে দেয় জীবন! ঘুরে যায় দিনলিপি! আজাদকে খুঁজে পায় না সুনীতা। ততোদিনে ভার্সিটির পাট চুকেছে।
সুনীতার বিয়ে হয়ে যায়। সংসারে চাপা পড়ে যায় সুনীতার প্রাক্তন ভালবাসা। আজাদ নিজেকে আড়াল রাখে….  ক্র্যাচে ভর দিয়ে সুনীতার সামনে যেতে মন চায়নি!

আজাদ রেহান হাঁটতে হাঁটতে তাম্রলিপি স্টলের খুব কাছে চলে আসে। ওই তো সুনীতা..  এবার সুনীতার গল্পের বই এসেছে মেলায়। অটোগ্রাফ দিচ্ছে হেসে হেসে….
আজো আজাদ সামনে যেতে পারে না! দূর থেকে দেখে চলে আসে আজাদ…. বইটা কিনে নেয় সুনীতা চলে যাবার পর।

বইটার নাম ” বইমেলায় প্রথম দেখা”। আজাদ পড়তে শুরু করে!
..  খুব পছন্দ বুঝি হুমায়ুন আহমেদ!
…. ভীষন!
আর পড়তে পারে না আজাদ। বইটা বন্ধ করে চোখ বুঁজে থাকে।
সুনীতা কি আঁকতে পেরেছে নিজেকে! এতদিনেও সুনীতার মনে আজাদের ছায়া… পেরেছে কি ভালবাসা আঁকতে!
সুনীতা কি তবে এঁকেছে বিরহ!
আজাদ রেহানের বুকটা ভারী হয়… একটা কাঠুরে কোদাল চালায়! আজাদ রেহান বুকের ভেতর শুনতে পায়…  ঠক ঠক আওয়াজ! কাঠ ঠোকরা একটা লাল ঠোঁটে উড়ে যায় অন্য ডালে!

হুমায়ুন বাদশাহ্

চিরকুট

আজ বইমেলায় অনিকের প্রথম কবিতার বই ‘চিরকুট’-এর মোড়ক উন্মোচন। তাই একটু আগেভাগেই মেলা চত্ত্বরে হাজির অনিক।একটু দূরে একটা বইয়ের স্টলে এক ভদ্রমহিলাকে দেখে চমকে উঠে অনিক। পরনে নীল শাড়ি সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। কপালে ছোট্ট  কালো টিপ। একমনে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে। বেশ অবাক হলো অনিক। ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠলো। এতোবছর পর হঠাৎ অনিন্দিতা’র দেখা । মনে মনে ভাবছে, একবার সামনে যেয়ে দাঁড়াবে নাকি? পরে ভাবলো, না থাক। কাউকে অযথা অস্বস্তিতে ফেলে কী লাভ! যার স্মৃতি মন থেকে মুছে গেছে তাকে আজ আর বিব্রত নাইবা করলাম।

সেই কবে ফাগুনের এক দুপুরে রাকসু’র সাহিত্য আসর বসেছিল কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামে। জমজমাট পরিবেশ। অনিক অংশ নিয়েছিল বিতর্ক, বক্তৃতা, স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তিসহ সাহিত্যের সবক’টি ইভেন্টে। শ্যামলা করে দেখতে মিষ্টি একটা মেয়ে নজর কেড়েছিল সেই আসরে। নাম তার অনিন্দিতা। আসতো বান্ধবীদের সঙ্গে। বসতো দ্বিতীয় সারিতে। শেষদিন সন্ধ্যায় পুরষ্কার বিতরণী। অনিন্দিতার বান্ধবী লীনা এগিয়ে এসে বললো, ‘আপনি তো ভীষন গুনি! এতোগুলো পুরষ্কার একাই জিতে নিলেন।’ অনিন্দিতা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো। অন্য বান্ধবীরা হাসছিলো। সেদিনই প্রথম অনিন্দিতাকে কাছ থেকে দেখা।  অনিক বললো- ‘ধন্যবাদ, কিছু গুনমুগ্ধ শ্রোতা পাওয়া গেল।’এবার অনিন্দিতার দিকে অনিকের  প্রশ্ন- ‘আপনি বোধহয় শহরে থাকেন। বাস স্ট্যান্ডে দেখেছি অনেকবার।’ অনিন্দিতা মাথা নাড়ে। ‘আমিও শহরে থাকি’- অনিক জানালো। কথা সেদিন আর বেশীদূর এগোয়নি। এরপর মাঝে মাঝেই দু’জনের দেখা। কলা ভবনের সামনে, লাইব্রেরীর গেটে কিংবা বাস স্ট্যান্ডে। দেখা হবার জন্যই দেখা হতো, দেখা করার ছলেও দেখা হতো। অনিন্দিতাকে দেখার ইচ্ছেটা অনিকের বাড়তে লাগলো। নানা উছিলায় দেখা করতে মন চাইতো। দেখা হলে মুখে তেমন কথা হতোনা। সামনা সামনি দেখা হলে শুধুই শুভেচ্ছা বিনিময়, এর বেশী কিছু নয়। এরপর মনের সিঁড়ি বেয়ে একটু একটু করে উপরে উঠে যাওয়া। অতঃপর সম্বোধনে আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসা।

অনিন্দিতা বরাবরই ভীষণ চাপা স্বভাবের মেয়ে। একদিন কলা ভবনের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে অনিক। হঠাৎ লীনা কাছে এসে বললো-‘কি অবাক কান্ড! আপনিতো দেখছি সাংঘাতিক মানুষ! চিরতার ডালে যষ্ঠ্যি মধু লাগালেন কি করে! কি ভাবে আঁচড় কাটলেন অমন কষ্টিপাথরে? তলে তলে এতদূর!’ সেই থেকে শুরু। ফাগুনে ফাগুনে বেশ ক’টা বছর কেটে গেলো। দিন গড়াতে লাগলো। দুজনের মধ্যে চিঠি আর চিরকুট চালাচালি হতো। অনিককে লেখা চিরকুটের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। লীনার হাত দিয়ে সতেরটি চিরকুট অনিক পেয়েছিলো। কোনটাই দু’তিন লাইনের বেশী নয়-

– ‘আজকে দেখা করতে পারবো না, বিশেষ অসুবিধা আছে, কিছু মনে করোনা প্লীজ।’

– ‘শাড়ী পরে ভার্সিটি যেতে ভীষণ লজ্জা লাগে, সবসময় অমন জেদ করোনাতো।’

– ‘এই রে! গোস্সা হলেন নাকি বাবু মশাই? সামনে এলে কী কান ধরে দাঁড়াতে হবে?’

– ‘আজ ভার্সিটি যাচিছ না, মা’র শরীরটা তেমন ভাল নেই, আমাকে বাসার রান্না করতে হবে।’

– ‘যখন তখন বাসায় ফোন করোনাতো, অস্বস্তি লাগে। সবাই কি ভাববে খেয়াল আছে?’

-‘আমার মনে হয় ভার্সিটির অনেকেই আঁচ করছে আমাদের ব্যাপারটা, তুমি ভার্সিটিতে সবার সামনে আমার সঙ্গে কথা বলবেনা।’

– ‘বাসস্ট্যান্ডে এসে প্লীজ ওভাবে আমার দিকে তাকাবেনা, আর তুমি কখনও আমার বাসে উঠবেনা।’

ছোট ছোট সব কথার ফুলঝুরি। হোমিওপ্যাথি ওষুধের পুরিয়ার মতো ভাঁজ খুলে খুলে অনিক চিরকুটগুলো পড়তো। বার বার পড়তো। পরে চিরকুটগুলো ধুসর হয়েছে। তবুও অনিকের কাছে সেগুলো কুবেরের ধন। পরম যত্নে সেগুলো উঠিয়ে রেখেছিলো। অনিকের মনে হতো এগুলো অপ্রকাশিত কোন এক গল্পের খন্ড খন্ড বাক্য। কোন সম্বোধন নেই, কোন ইতি নেই। নেতিকথায় ভরপুর অসামান্য সব চিরকুট। মুক্তোর মতো হস্তাক্ষর। তাতে রোমান্টিকতা নেই, প্রেমের উচ্ছ্বাস নেই। তবু অনিকের মনে হতো এগুলোর মধ্যে ভালবাসা লুকিয়ে আছে। অনিক সময়ে অসময়ে চিরকুটগুলো খুলে খুলে পড়তো।

ফাগুনে ফাগুনে অনেকগুলো বসন্ত ঝরে গেল। অনিন্দিতা শেষ চিঠিতে অনেককিছু লিখেছিলো। মনের অজান্তে লুকিয়ে থাকা স্মৃতির সূতোয়বোনা অপেক্ষার সেই নকশীকাঁথা আজও মসৃণ বুননে অটুট। অনিন্দিতা লিখেছিলো- ‘তুমি কী আজও যত্ন করে উঠিয়ে রেখেছো আমার লেখা সেই চিরকুটগুলো?’ তুমিতো ওগুলো নিয়ে ঠাট্টা করতে। বলতে, ওগুলো আমার এলোমেলো ভাবনার বিচ্ছিন্ন প্রলাপ। ওগুলো নাকি, অনূঢ়া প্রেমের অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি। তোমার কী মনে আছে ক্যাম্পাসের সেই বসন্তদিনগুলোর কথা। হৃদয়ে দোলা দেয়া হারিয়ে যাওয়া সেই কথার মালা? অনিন্দিতা প্রশ্ন করেছিলো- ‘অষ্ফুট বাসনা নিয়ে বৃষ্টিতে না ভেজা কদম ফুলও কী ভালবাসা না পেলে শুকিয়ে যায়? নীড়হারা আহত পাখীর মতো মানুষের মনও কী নিভৃতে  ডানা ঝাপটায়? চঞ্চল হৃদয় কী স্রোতহারা নদীর মতো কখনো মোহনায় আটকে যায়? পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণা কী কখনো মাঝ পথে থেমে যায়? যদি তাই হয়, তবে তার পথ কেন হয়না কোন কাঙ্ক্ষিত পথের প্রান্তে কিংবা চেনা কোন লোকালয়ে? এসবই আমার মনের কথা। শুধুই তোমাকে ভেবে।’

মোড়ক উন্মোচনের সময় এগিয়ে এলো। সম্মানিত অতিথি মঞ্চে উঠে গেছেন। সন্বিত ফিরে পেলো অনিক। সেই বুকস্টলের দিকে আরও একবার তাকালো অনিক। কিন্তু এ কি! অনিন্দিতাতো ওখানে নেই। আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো। নাহ্ কোথাও নেই। একদিন এভাবেই হঠা্ৎ করে অনিন্দিতা তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। আজও সে সেভাবেই হারিয়ে গেলো। আজ অনিকের মনে পড়লো অনিন্দিতাকে লেখা তার চিঠি আর কবিতার কথা। আজ যদি সেই চিঠি আর কবিতাগুলো অনিন্দিতার কাছ থেকে ফেরৎ পাওয়া যেতো তবে হয়তো একুশের এই বইমেলায় চিঠির সংকলন বা কবিতা নিয়ে বই বের করা যেতো। তাহলে অনেক আগেই অখ্যাত এক লেখকের জন্ম হলেও হতে পারতো। আজ এতোবছর পর এই বইমেলায় অনিকের বলতে ইচ্ছে করছে- ‘ভয় পেয়োনা অনিন্দিতা, আমি সেইসব চিঠি বা কবিতার সর্বস্বত্ত্ব দাবী করছি না, দাবী করার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। অখ্যাত এক মানুষের লেখা প্রেমপত্র বা কবিতা নামের ছাইপাস লেখার কপিরাইট স্বত্ত্ব কখনও বিক্রি হয়না। ওগুলো আজ তোমার সম্পত্তি। যেমন তোমার বিষন্ন হয়ে যাওয়া চিরকুটগুলো আজ আমার সম্পত্তি।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মঞ্চের দিকে আগায় অনিক। মনে বার বার একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো, আজ যে তা্র বইয়ে মোড়ক উন্মোচন সেটা কি অনিন্দিতা কোনভাবে জানতে পেরেছিলো!

ছবি: শম্পা রেজা