বই আজও কাছে আছে

পর্দা উঠছে বাংলা একাডেমী আয়োজিত বই মেলার। মেলার মাঠের হাওয়ায় আবার ভেসে থাকবে নতুন বইয়ের গন্ধ, ভাসবে অনেক নতুন কথা। লেখকদের আড্ডায় ধারালো কথার কোপে কাটা পড়বে হতাশার মুন্ডু, কোন তরুণ লেখক তার সদ্য প্রকাশিত বইটি স্পর্শ করবেন কী গভীর মমতায়, শেষ বিকেলে শোনা যাবে কোকিলের হাঁকডাক, অনেক মানুষের ভীড়ে বেশ উৎসবের আমেজ-বই নিয়ে মাসব্যপী উৎসব।

বিভিন্ন সময় নানা আলোচনায় শোনা যায়, বইয়ের ব্যাপারটা পৃথিবীজুড়েই পরিবর্তনের হওয়ার মধ্যে পড়ে গেছে। মলাট দেয়া সংঘবদ্ধ কাগুজে বই বস্তুটি ধীরে ধীরে ঠাঁই করে নিচ্ছে কম্পিউটারের পর্দায়, স্মার্ট ফোন আর ট্যাবলেটের স্ক্রীনে। বলা হচ্ছে, এসবই হচ্ছে ইলেকট্রনিক বই।পাঠকের ছোট্ট্ একটা ক্লিক করার অপেক্ষা মাত্র-তারপর্ে নতুন যুগের পাঠকদের চোখের সামনে হাজির হাজার হাজার বই।বলছিলাম নতুন যুগের পাঠকদের কথা। তারা এখন সবাই এই ইলেকট্রনিক পুস্তকে আগ্রহী হয়ে পড়ছে। নতুন জমানায় বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছে নতুন ধরণের বই।

এই বই বিষয়টা আসলে এলো কোত্থেকে? ইতিহাস বলছে, রোমান সাম্রাজ্যের একেবারে প্রথমদিকে বড় বড় অক্ষরে লেখার প্রচলন ঘটেছিল। অবশ্য সেটা লেখা হতো মৃত ব্যক্তিদের কবরের নামফলকে। এরপর মিশরে তৈরী গোল করে মুড়ে রাখা প্যাপিরাস কাগজে লেখার প্রচলন হয় সর্বত্র। কিন্তু সেগুলো লম্বায় অনেক বড় হওয়ায় পাঠকরা পড়ার সুবিধা পেতো না। আবার প্যাপিরাস কাগজ খুব স্পর্শকাতর বস্তু হওয়ায় সেটাকে বেশীদিন গোল করে মুড়ে রাখাও যাচ্ছিলো না। কাগজগুলো খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। তাছাড়া এই কাগজের দুদিকে লেখাও সম্ভব হতো না।

প্রত্নত্বাত্তিকদের খোঁড়াখুঁড়ি আর অনুসন্ধানে পরবর্তী সময়ে জানা গেল, বই পড়ার অসুবিধা দূর করতে রোমানরা আরেক ধরণের প্যাপিরাস কাগজের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল। সে কাগজের আবার দুদিকেই লেখা সম্ভব হয়েছিল। রোমানরা এর নাম দিয়েছিল ‘কোডেক্স’। রোমান ভাষায় কোডেক্সের অর্থ হচ্ছে গাছের কান্ড। মার্তিয়াল নামে এক রোমান কবি সর্বপ্রথম নতুন ধরণের প্যাপিরাস কাগজে তার কবিতা গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। সে বইয়ের নির্দশন গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন। সে সময়ে সেই কবি তার বইয়ের প্রচারণায় বলেছিলেন, তার বই এক হাতে নিয়ে পড়া সম্ভব এবং এর পৃষ্ঠার আকারও ছোট।রোমানরা এই নতুন ধরণের কাগজের নাম দিয়েছিল ‘পার্চমেন্ট’। তবে ঠিক কোন সময়ে, কারা এ ধরণের কাগজ আবিষ্কার করেছিল তা খুব নিশ্চিত করে ইতিহাস বলতে পারছে না। গ্রীকরাও সেই সময় বইয়ের ব্যবহার শুরু করেছিল। তখন ধীরে ধীরে বইতে মলাট অথবা প্রচ্ছদ যুক্ত করার প্রচলন শুরু হয়েছিল। প্যাপিরাস অথবা পার্চমেন্ট কাগজের উদ্বৃত্ত অংশকে গাছের েকাঠের ওপর আঠা দিয়ে সেঁটে বইয়ের মলাট দেয়ার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হওেচ্ছ বইতে মলাট লাগার পর থেকে পৃষ্ঠার ক্রমিক নম্বর আর বিষয়বস্তুর সূচী তৈরীর কথা ভাবতে শুরু করলো মানুষ। শুরু হলো বইতে এই কৌশলের ব্যবহার।

শুরু করেছিলাম কাগজে ছাপা বইয়ের জনপ্রিয়তা হারানোর প্রসঙ্গ নিয়ে। ইতিহাসের পথ ধরে আবার ফিরে আসি বর্তমানের দরজায়। বইমেলার আলো ঝলমলে অবয়ব দেখলে কিন্তু মনে হয় না কাগুজে বই কাগুজে বাঘ হয়ে চলে যাচ্ছে অন্তরালে। আমাদের এখনও ভালো লাগে মেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে খুঁজে কিনে নিতে নিজের প্রিয় বই। তারপর বাড়ি ফিরে আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে ডুব দেয়া বইয়ের জগতে। এই আয়েশের জায়গাটা আমরা পাঠকরা বোধ করি এখনো বিসর্জন দিতে রাজি নই। প্রিয় বই মাথার কাছে রাখা আর অলস দিনে যখন খুশী পাঠের আনন্দ নেয়া আজও আমাদের খুব প্রিয় অভ্যাস। কাছে থাকুক ছাপার অক্ষরে বই।

সাজিদ হাসান রেজা

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি

ছবিঃ গুগল