বঙ্গবন্ধু : ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র আলোয়

আবদুল্লাহ আল মোহন

ইংরেজ কবির মতে এপ্রিল হলেও বাঙালির জীবনে আগস্টই নিষ্ঠুরতম মাস। কারণ ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডে স্বপরিবারে প্রাণ হারান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। বাংলার আকাশ-বাতাস-নিসর্গ প্রকৃতিরও অশ্রুসিক্ত হওয়ার মাস। বিনম্র শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে – যাঁর বিশাল অস্তিত্ব পড়ে আছে বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে, যাঁর জন্ম না হলে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এ কারণেই একথা বললে ভুল হবে না যে, বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরো জোর দিয়ে বলা চলে তিনিই বাংলাদেশ।
আমি নিজে শিক্ষক বলে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’পাঠ করে একজন প্রকৃত শিক্ষককে নিয়ে লেখা যে কথাগুলো অমোচনীয় কালির লেখনী হয়ে আমার মনের ক্যানভাসে স্থায়ীভাবে দাগ কেটেছে, সে অংশটুকু পাঠ করা যাক। বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “বেকার হোস্টেলে কতগুলি ফ্রি রুম ছিল ,গরিব ছাত্রদের জন্য । তখনকার দিনে সত্যিকার যার প্রয়োজন তাকেই তা দেওয়া হতো । আজকালকার মত টেলিফোনে দলীয় ছাত্রদের রুম দেওয়ার জন্য অনুরোধ আসতো না । ইসলামিয়া কলেজে গরিব ছেলেদের সাহায্য করবার জন্য একটা ফান্ড ছিলো । সেই ফান্ড দেখাশোনা করার ভার ছিল বিজ্ঞানের শিক্ষক নারায়ণ বাবুর । আমি আর্টসের ছাত্র ছিলাম ,তবু নারায়ণ বাবু আমাকে খুব ভালবাসতেন । তিনি যদিও জানতেন ,আমি প্রায় সকল সময়ই ‘পাকিস্তান,পাকিস্তান’ করে বেড়াই । ইসলামিয়া কলেজের সকল ছাত্রই মুসলমান । একজন হিন্দু শিক্ষককে সকলে এই কাজের ভার দিত কেন ? কারণ, তিনি সত্যিকারের একজন শিক্ষক ছিলেন । হিন্দুও না ,মুসলমানও না। যে টাকা ছাত্রদের কাছ থেকে উঠতো এবং সরকার যা দিত ,তা ছাড়াও তিনি অনেক দানশীল হিন্দু-মুসলমানদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে জমা করতেন এবং ছাত্রদের সাহায্য করতেন । এই রকম সহানুভূতিপরায়ণ শিক্ষক আমার চোখে খুব কমই পড়েছে” (পৃষ্ঠা : ৩৭)।

আমার কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীর ‘পৌরনীতি ও সুশাসন’পাঠক্রমে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম পড়াতে গিয়ে, ‘জনক’ শীর্ষক দেয়াল পত্রিকা প্রকাশনার প্রয়োজনে সম্প্রতি আবারো পাঠ করলাম তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। যতবারই গ্রন্থটি পাঠ করি ততবারই যেন নবরূপে, নতুন করে খুঁজে পাই বঙ্গবন্ধুকে। এ এক রহস্যময় পাঠ অভিযাত্রা। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে আমার কাছে তাই মনে হয়, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতার সংগ্রামী জীবন ও নান্দনিক কিছু ভাবনার অসাধারণ উপস্থাপন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ। এতে ১৯৪৭ সালের বিভাগ-পূর্ব বাংলা ও বিভাগ-উত্তর পাকিস্তানি শাসনের গোড়ার দিকের বঙ্গবন্ধুর জীবনঘনিষ্ঠ বিচিত্র ঘটনাবলি মূর্ত হয়েছে। নিজ নেতৃত্ব ও কর্মগুণে সমকালীন রাজনীতিকদের অনেকককে ছাপিয়ে তাঁর নেতৃত্বের উত্থান ইতিহাসের কালপর্ব গ্রন্থে দেদীপ্যমান।

পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথায় ব্যক্ত বিভিন্ন ঘটনার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক মানস-গঠন, নীতি-আদর্শ-নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দর্শন, ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্ব ও অনন্য ভূমিকা, তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কারাস্মৃতি ইত্যাদি বিষয় পূর্বাপর সময়ের ছবি আমরা পাঠ করে সঠিক ইতিহাসের কাছে আরো গভীরভাবে দায়বদ্ধ হয়ে পড়ি। পাঠ শেষে আমরা বলতেই পারি, মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা অকৃত্রিম ছিল বলেই তিনি হারিয়ে যাওয়ার নন, বরং সময়ের পথচলায় আরও বেশি জীবন্ত, আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে বারবার তিনি ফিরে আসেন মানুষের কাতারে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কবি রফিক আজাদের কবিতার একটি উদ্ধৃতি মনে পড়ছে, ‘এ দেশের যা-কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র তাঁর চোখে মূল্যবান ছিলো, নিজের জীবনই শুধু তাঁর কাছে খুব তুচ্ছ ছিল; স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর….’ (এই সিঁড়ি)।
বাংলাদেশের আবির্ভাবের পটভূমি তৈরি করে দেওয়া ভারত বিভাগ থেকে শুরু করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সূচনালগ্নে পাকিস্তানের রাজনীতির নানা রকম ঘটনা ও সেই সময়ের শাসকগোষ্ঠীর কূটচালের সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ যে ইতিহাস বঙ্গবন্ধু রচনা করে গেছেন, তাঁর সহজ ভাষা ও অলংকারবর্জিত বর্ণনার মধ্য দিয়ে সেই সময় ও রাজনীতির চিত্র সজীব হয়ে ওঠে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী একদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমূল্য দলিল। অন্যদিকে, একটি বইয়ের পাতায় পাতায় নিজের জবানিতে বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ইতিহাস। একটি ডায়েরিতে একটি জাতির জন্মের কথা অকপটে লিখেছেন একজন আলোকিত মানুষ।এই বইটির অনেক দিকই আমার ভাল লেগেছে। সবচেয়ে ভাল লেগেছে বঙ্গবন্ধু কি করে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন সেই হয়ে ওঠার ইতিহাসটি জানতে পেরে। বইটি থেকে জানা যায়, কলকাতায় দাঙ্গার সময় তিনি সৈনিকের মতো বন্দুক নিয়ে টহল দিয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুসলমান-হিন্দু সকল এলাকার মানুষকেই রক্ষায় নির্ভয়ে সেবায় কাজ করেছেন। বিভিন্নজনের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হচ্ছে, আবার থেমেও থাকছেন না সে কারণে। এই মানুষটি কিভাবে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলেন যে, আমাদের পাকিস্তানে স্থান নেই। যদিও বইটি ১৯৫৪ সালে এসে শেষ হয়েছে, তবুও বইটি পড়লে এই বিষয়টি সুন্দরভাবে বোঝা যায়। আমরা জানি, এই বইটির একটি বিরাট অংশ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কারাগারে বসে লেখা। কারাগারের খুঁটিনাটি সুন্দরভাবে বর্ণনা করা আছে। তাঁকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমরা ভালবাসি। বইটি পড়লে তাঁকে আমরা একজন মানুষ হিসেবে আরও বেশি ভালবাসব বলেই আমার বিশ্বাস। আমাদের নতুন প্রজন্ম বইটি পড়লে মানুষ বঙ্গবন্ধুকে জানবে। এই বইটি পড়লে সঠিক ইতিহাস জানা যাবে, আর প্রকৃত সত্য ইতিহাস না জানলে ভবিষ্যত অন্যরকম হবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম বইটি পড়ে রাজনীতির কবিকে হয়ে ওঠার ইতিহাস যেমন জানবে, তেমনি দেশের রাজনীতির অজানাকেও জানবে, ফলে তারা উপকৃত হবে- এ নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার কারণ নেই। অসমাপ্ত এই গ্রন্থে অসাধারণ দক্ষতায় বঙ্গবন্ধু রাজনীতির যে পাঠ রেখে গেছেন তা পাঠকদের মনে পাকিস্তানপূর্ব এবং পাকিস্তানকালের গোড়ার দিকের রাজনীতির ইতিহাস জানার যে আবেদন সৃষ্টি করে গেছে-তাই একদিন ইতিহাসকে পূর্ণতা দেবে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু স্বাভাবিক রাজনীতির জীবন পাননি। নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই তিনি অসাধারণ একজন মানুষ এবং রাজনীতির মহান নেতা হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখিয়ে তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। সবই তাঁর অসামান্য কীর্তি। আর তাই এই গ্রন্থটি অসম্পূর্ণ হলেও এটি রাজনীতির ইতিহাসের অসাধারণ দক্ষতায় লেখা ইতিহাসের আকরগ্রন্থ-যার পূর্ণতার দায়িত্ব নিতে হবে দেশের রাজনীতি সচেতন মহলকে।

বাবা-মায়ের সঙ্গে

বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন, একটি চেতনা। যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজও আমরা এগিয়ে চলেছি একটি শোষিত-বঞ্চিত জাতির সার্বিক মুক্তির দিকে। বঙ্গবন্ধু হলেন বিশ্বাস, ধ্যান ও জ্ঞানে মুক্তিকামী জনতার মূলমন্ত্র। অপরের দু:খ-কষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সর্বদাই আবেগাপ্লুত করত। বাঙালি জাতির মুক্তি ও উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেও জেলগেটে সহধর্মিনীর কাছে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ এমনই আত্মসচেতন ছিলেন তিনি। বিশ্বখ্যাত ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিনের ১৯৭১ সালের এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বা ‘রাজনীতির কবি’ বলা হয়েছিল। আমার প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণও ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এসবই তো রূপকার্থে। কিন্তু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এবার আমরা বঙ্গবন্ধুকে আবিষ্কার করলাম একজন চমৎকার লেখক হিসেবে, গল্পের কথক হিসেবে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল, কী সুন্দর করে গল্প বলতে পারেন তিনি, তাঁকে বলা যায় একজন অনবদ্য গল্পকার, একজন অসাধারণ কথাকার—‘এ গ্রেট স্টোরিটেলার।’ সেই অমর কথাশিল্পী বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’যেন দেশপ্রেমেরও এক অনুপম কাব্যকথা।বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীটি যেন বাংলার সংগ্রামমুখর ইতিহাসের একটি অসামান্য দলিল, আমাদের সাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। আত্মকথা লেখা বড় কঠিন। সত্য কথা স্পষ্ট করে বলতে পারাটাই একটা মহৎ কাজ। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা থেকে বাঙালি জাতির জনক হয়ে ওঠেন এবং বাংলাদেশের স্রষ্টাও তিনি। তাঁর এই মহত্তর হয়ে ওঠার তথ্য, ঘটনা এবং ব্যক্তিজীবনের কথা তিনি তাঁর প্রিয় সহজ, সরল, আপামর শোষিত সাধারণ জনগণের দিকে তাকিয়ে করে গেছেন। ইতিহাস তাই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে, ইতিহাস তাঁর এই শ্রেষ্ঠ কীর্তিকেও অমূল্য সম্পদ হিসেবে রক্ষা করবে। নতুন প্রজন্মকে আদর্শ ও সততায় আলোকবর্তিকা হয়ে উজ্জীবিত করবে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাঙালির ও বাংলার সংগ্রামমুখর ইতিহাসের একটি অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বাঙালির জীবনে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। স্বামী বিবেকানন্দ একটা কথা বলতেন ও বিশ্বাস করতেন, ‘ফাঁকি দিয়ে চালাকি করে বৃহৎ ও মহৎ কাজ করা যায় না।’ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে এবং তাঁর মাত্র ৫৫ বছরের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, শেখ মুজিব তাঁর জীবনের প্রতিটি কালপর্বে সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ, শ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রেখেই অগ্রসর হয়েছেন। তাই তিনি বাঙালি চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীর মতো অগ্রজ নেতাদের ছাড়িয়ে শ্রেষ্ঠ বাঙালির মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনের এই অসমাপ্ত কিন্তু অসামান্য আত্মজীবনী এমন অসংকোচ সত্যেরই এক অনন্য নিদর্শন এবং জাতির জন্য একটি অনিঃশেষ আলোকবর্তিক বিশেষ।

জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে

কারাগারে বসে লেখা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী অসমাপ্ত হলেও আত্মজীবনী রচনার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। তার আত্মজীবনী শুধু এক রাজনীতিকের স্মৃতিকথা নয়, উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক অনন্য স্মৃতিভান্ডার। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শত শত বই বের হয়েছে, কিন্তু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র সঙ্গে অন্য কোনো বইয়ের তুলনা হয় না। বস্তুত, একটি জাতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা ভিত্তি রচনা করে তার যথার্থ আত্মপরিচয়, এমন কিছু মানুষের অভ্যুদয় হয়, যারা হন সেই জাতির নবজন্মের দিশারী। এ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গোপালগঞ্জের প্রান্তিক এক জনপদে ক্রমে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ।নিজস্ব প্রচেষ্টায়, কর্ম যোগ্যতায়, নেতৃত্বের দক্ষতায় সমকালীন আরো অনেক প্রথিতযশা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পতিতদশায় ফেলে রেখে এগিয়ে এসেছিলেন ভাবি বাংলাদেশের জনক হিসেবে। তাঁরই সুযোগ্য আত্মজা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উৎসাহে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ৩২৯ পৃষ্ঠার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ৩২৩ পৃষ্ঠার ইংরেজি অনুবাদের প্রকাশ আমাদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণার বিষয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য লাভ করেছে এক ‘গ্রেট স্টোরিটেলার’কে, শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রখ্যাত প্রকাশনী ইউপিএল বের করেছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। বইয়ের ভূমিকা থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলি অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। মূল্যবান সেই খাতাগুলি পাঠ করে জানা গেল এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৬-৬৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। জেল-জুলুম, নিগ্রহ-নিপীড়ন যাঁকে সদা তাড়া করে ফিরেছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসর্গীকৃত-প্রাণ, সদাব্যস্ত বঙ্গবন্ধু যে আত্মজীবনী লেখায় হাত দিয়েছিলেন এবং কিছুটা লিখেছেনও, এই বইটি তার সাক্ষর বহন করছে। বইয়ের ভূমিকায় শেখ হাসিনা জানাচ্ছেন, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় কারাগারে বসে শেখ মুজিব এই আত্মজীবনী লেখেন। লেখার জন্য খাতা সরবরাহ করেছিলেন বেগম মুজিব, বঙ্গবন্ধু যাঁকে ডাকতেন রেণু বলে। শেখ মুজিবের ভাষায়, ‘বন্ধুবান্ধবরা বলে, “তোমার জীবনী লেখ।” সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাগুলি লিখে রাখ, কাজে লাগবে।” আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।” বললাম, লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যে লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। ‘একদিন সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে জমাদার সাহেব চলে গেলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা… ।আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু—আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’ তখনো বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি। কিন্তু এই যে বিনয়—‘লিখতে পারি না’, কিংবা ‘এমন কি করেছি যে লেখা যায়!’ এটা খুবই আন্তরিক উক্তি; এই বইয়ে তিনি তাঁর জন্ম, তাঁর পরিবারের ইতিহাস ও কিংবদন্তি, শৈশব, ছাত্রজীবন, বেড়ে ওঠা, ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে ১৯৫৪-৫৫ সাল পর্যন্ত জীবনকাহিনি বর্ণনা করেছেন; তাতে সবচেয়ে আড়াল করে রেখেছেন নিজের গৌরব বা কীর্তি, একজন নিপুণ কথাকারের মতো গল্প বলে গেছেন, ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, পরিবেশ ফুটিয়ে তুলেছেন, চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন, সংলাপ তৈরি করেছেন, এর ফলে মনেই হয় না এটি একজন লেখকের প্রথম বই, কিংবা লেখক আসলে পেশাদার লেখকই নন।

৭ই মার্চের ভাষন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপন কথার পাঠে একটু নজর দেওয়া যাক। রাজনীতির পাঠ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন, “বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, “sincerity of purpose and honesty of purpose” থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না। একথা কোনোদিন আমি ভুলি নাই” (পৃষ্ঠা : ২১)। আবার নিজের সম্পর্কে অকপটে বলছেন, ‘আমি খুব রাগী ও একগুয়ে ছিলাম, কিছু বললে কড়া কথা বলে দিতাম। কারও বেশি ধার ধারতাম না। আমাকে যে কাজ দেওয়া হত আমি নিষ্ঠার সাথে সে কাজ করতাম। কোনোদিন ফাকি দিতাম না। ভীষণভাবে পরিশ্রম করতে পারতাম। সেইজন্য আমি কড়া কথা বললেও কেউ আমাকে কিছু বলত না। ছাত্রদের আপদে বিপদে আমি তাদের পাশে দাড়াতাম। কোন ছাত্রের কি অসুবিধা হচ্ছে, কোন ছাত্র হোস্টেলে জায়গা পায় না, কার ফ্রি সিট দরকার, আমাকে বললেই প্রিন্সিপাল ড. জুবেরী সাহেবের কাছে হাজির হতাম। আমি অন্যায় আবদার করতাম না। তাই শিক্ষকরা আমার কথা শুনতেন। ছাত্ররাও আমাকে ভালবাসত’(পৃষ্ঠা : ৩৭)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন প্রখর আত্মসচেতন ছিলেন, তেমনি দেশের উন্নয়ন ও নিজের কাজ এবং দেশের ভবিষ্যত নিয়েও ভাবতেন, লিখছেন, “আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগনের ছিল, পাকিস্তান পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করেছে। আর চীনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করেছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এদেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন। ফলে দেশের জনগণের মধ্যে ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। একটা মাত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল সাদা চামড়ার জায়গায় কালা চামড়ার আমদানি হয়েছে”(পৃষ্ঠা : ২৩৪)।
বাঙালির চরিত্র অনুসন্ধান করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান, আরেকটা হল, আমরা বাঙালি।’ পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে আছে … ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজেকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।’ অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি, ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ’ (পৃষ্ঠা : ৪৭)। আবার, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ে জাতির জনক লিখছেন,”১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়েছে । লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে । এই সময় আমি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হই।জনাব আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের সম্পাদক হন । তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মনোনীত ছিলেন । আর খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন খুলনার আবুল কাশেম সাহেব । হাশিম সাহেব তাঁকে পরাজিত করে সাধারণ সম্পাদক হন । এর পূর্বে সোহরাওয়ার্দী সাহেবই সাধারণ সম্পাদক ছিলেন । এই সময় থেকে মুসলিম লীগের মধ্যে দুইটা দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে । একটা প্রগতিবাদী দল, আর একটা প্রতিক্রিয়াশীল । শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শেণীর লোকেরা মুসলীম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই ,জনগণের প্রতিষ্ঠান করতে চাই । মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই । জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল । কাউকেও লীগে আসতে দিত না । জেলায় জেলায় খান বাহাদুরের দলেরাই লীগকে পকেটে করে রেখেছিল’ ( পৃষ্ঠা :১৭ )
১৯৪৯ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৫২ এর মার্চ এর শুরু পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান কারাগারে বন্দি ছিলেন । এখানে একজন সমাজকর্মী চন্দ্র ঘোষের সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা জানা যায়। এই চন্দ্র ঘোষ ছিলেন একজন সমাজকর্মী। রাজনীতি করতেন না। তার সাথে শেখ মুজিবের কারাগারের একটি ঘটনা তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম। দেখি চন্দ্র বাবু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, অবস্থা খুবই খারাপ। তার হার্নিয়ার ব্যারাম ছিল। পেটে চাপ দিয়েছিল, হঠাৎ নাড়ি উলতে গেছে। ফলে গলা দিয়ে মল পড়তে শুরু করেছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। সিভিল সার্জন সাহেব খুব ভাল ডাক্তার। তিনি অপারেশান করতে চাইলেন, কারন মারা যখন যাবেনই তখন শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান। আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নাই যে, তার পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র লিখে দিবে। চন্দ্র ঘোষ নিজের লিখে দিতে রাজি হলেন। বললেন, “কেউ যখন নাই তখন আর কি করা যাবে।” সিভিল সার্জন সাহেব বাইরের হাসপাতালে নিতে হুকুম দিলেন। চন্দ্র ঘোষ তাকে বললেন, “আমাকে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন । আমার তো কেউ নাই। আমি শেখ মুজিবুর রাহমানকে একবার দেখতে চাই, সে আমার ভাইয়ের মত। জীবনে তো আর দেখা হবে না। ” সিভিল সার্জন এবং জেলের সুপারিন্টেনডেন্ট, তাদের নিরদেশে আমাকে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল। চন্দ্র ঘোষ স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন। দেখে মনে হল আর বাঁচবেন না, আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “ভাই, এরা আমাকে “সাম্প্রদায়িক” বলে বদনাম দিল; শুধু এই আমার দুঃখ মরার সময়। কোনোদিন হিন্দু মুসলমানকে দুই চোখে দেখি নাই। সকলকে আমায় ক্ষমা করে দিতে বোলো। আর তোমার কাছে আমার অনুরোধ রইল, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখো। মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য ভগবান ও করেন নাই। আমার তো কেউ নাই, আপন ভেবে তোমাকেই শেষ দেখা দেখে নিলাম। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক।” এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে সুপারিন্টেনডেন্ট, জেলার সাহেব, ডিপুটি জেলার, ডাক্তার ও গোয়েন্দা কর্মচারী সকলের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল।

দেশ-গড়ার সংগ্রামে ছাত্রীদের শপথবাক্য উচ্চারণ-
জাতির জনকের সামনে।

আর আমার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। বললাম, “চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।” আর কথা বলার শক্তি আমার ছিল না। শেষ বারের মত বললাম। “আল্লাহ করলে আপনি ভাল হয়ে যেতে পারেন। ” তাকে তারপর নিয়ে গেল। (পৃষ্ঠা : ১৯১)

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিনে এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী? উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর তিনি বেদনার্থ স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কী, আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু।’ এ কথার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় বঙ্গবন্ধু কত বিশাল হৃদয় ও মহৎ মনের অধিকারী ছিলেন! আর তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যথার্থই লিখছেন, ‘আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়গুলো কারাবন্দি হিসেবেই কাটাতে হয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়েই তাঁর জীবনে বার বার এই দুঃসহ নিঃসঙ্গ কারাজীবন মেনে আসে। তবে তিনি কখনও আপোস করেন নাই। ফাঁসির দড়িকেও ভয় করেন নাই। তাঁর জীবনে জনগণই ছিল অন্তঃপ্রাণ। মানুষের দুঃখে তাঁর মন কাঁদত। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবেন, সোনার বাংলা গড়বেন- এটাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য- এই মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবে, সেই চিন্তাই ছিল প্রতিনিয়ত তাঁর মনে। যে কারণে তিনি নিজের জীবনের সব সুখ আরাম আয়েশ ত্যাগ করে জনগণের দাবি আদায়ের জন্য এক আদর্শবাদী ও আত্মত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন স্বাধীনতা। বাঙালি জাতিকে বীর হিসেবে বিশ্বে দিয়েছেন অনন্য মর্যাদা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে বিশ্বে এক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন সফল করেছেন। বাংলার মানুষের মুক্তির এই মহানায়ক স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষে যখন জাতীয় পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন নিশ্চিত করছিলেন তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট তাঁকে জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। স্বাধীন বাংলার সবুজ ঘাস তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বাঙালি জাতির ললাটে চিরদিনের জন্য কলঙ্কের টিকা এঁকে দিয়েছে খুনিরা।’

শিশুদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু

‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’- দুটি নাম, একটি ইতিহাস। এক এবং অভিন্ন সত্ত্বা। যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস রচনায় রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠন, আটান্নর সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রাণপ্রিয় এ নেতা ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করলে তাঁর ওপর নেমে আসে দু:সহ কারাজীবন, অমানুষিক নির্যাতন। নি:সঙ্গ কারা নির্যাতনের সেই কথা এখানে বলে শেষ করা যাবে না। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি কখনো পাকিস্তানি শাসকদের সাথে, অন্যায়ের সাথে আপোস করেন নি। ফাঁসির দড়িকেও ভয় পান নি। দু’দু’বার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চেও যে বাঙালির জয়গান গেয়েছেন, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তাঁর ভালোবাসা ও হৃদয়ের দরদ ছিল অপরিমেয়। বঙ্গবন্ধুর কথা এবং বক্তৃতায় প্রায়ই উদ্ধৃত হতো বাঙালি কবিদের কবিতার চরণ। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছিলেন তাঁর অভয়মন্ত্র। দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন কারাবাসের পর পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সের ঐতিহাসিক গণসমুদ্রে তিনি বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ অশ্রুসিক্ত নয়নে উচ্চকিত হন এই বলে, ‘কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তুমি ভুল প্রমাণিত হয়েছো, তোমার কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে…।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটির সুবিখ্যাত চরণ চারটির শুদ্ধ পাঠ নিয়ে বিভিন্ন রচনায় বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। শুদ্ধ পাঠ নিম্নরূপ-
‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’
উল্লেখ্য, উপরের ‘বঙ্গবন্ধু’নামের ছড়াটি অন্নদাশঙ্কর রায় এর বিখ্যাত ছড়াগ্রন্থ ‘শালি ধানের চিঁড়ে’থেকে নেওয়া হয়েছে। অন্নদাশঙ্কর রায় কবিতাটি লিখেছিলেন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের ‘কিছুদিন আগে কি পরে। এ সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় স্মৃতিচারণা করেছেন, ‘তারিখটা ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারত দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি। আমরা কজন সাহিত্যিক যাচ্ছি সব স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান পুরুষদের অভিনন্দন জানাতে মুজিবনগরে।… শেখ মুজিবুর রহমান যদিও মুজিবনগর সরকারের শীর্ষে তবু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার মুজিবনগরে গিয়ে সম্ভব হতো না। সেদিন মুজিবনগর থেকে ফিরে আসি তাঁর জন্যে ভয় ভাবনা ও প্রার্থনা নিয়ে। যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, তার সবে আরম্ভ। যুদ্ধে হেরে গেলে পাকিস্তানিরা কি শেখ সাহেবকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে দেবে? প্রতিশোধ নেবে না? এর মাস চার-পাঁচ আগে থেকেই তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্যে আবেদন বিশ্বময় ধ্বনিত হয়েছিল। তার জন্যে কলকাতার ময়দানে আমরা সাহিত্যিকরাও জমা হয়েছিলুম। তার কিছুদিন আগে কি পরে আমি রচনা করি “যতকাল রবে…”।’[অন্নদাশঙ্কর রায়: কাঁদো প্রিয় দেশ, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ, অন্বেষা, ঢাকা ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৮-৬০]। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর কবিতাটি অসাধারণ হয়ে ওঠে এবং এর তাৎপর্য নতুন করে পাঠকের কাছে ধরা পড়ে। বিশেষ করে, ‘ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ চরণটি অধিকতর বাঙ্ময় হয়ে আসে। আরেকটি স্মৃতিচারণায় অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, ‘শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, ” বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এল?” “শুনবেন?” তিনি মুচকি হাসলেন। “সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে। তিনি ও শরতচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙ্গালীর এক দেশ। বাঙ্গালীরা এক হলে কী না করতে পারতো। তারা জগত জয় করতে পারতো। They could conquer the world”. বলতে বলতে তিনি উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেন। তারপর তিনি বিমর্ষ হয়ে বলেন, “দিল্লী থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সোহরাওয়ার্দী আর শরত বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজী নয় তাদের প্রস্তাবে। তারা হাল ছেড়ে দেন। আমিও দেখি আর কোন উপায় নেই। ঢাকায় চলে এসে নতুন করে আরম্ভ করি। তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নেই, কিন্তু আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা। সে স্বপ্ন কেমন করে পূর্ণ হবে এই আমার চিন্তা। হবার কোন সম্ভাবনাও ছিলো না। লোকগুলা যা কমিউনাল ! হঠাৎ একদিন রব উঠলো, আমরা চাই বাংলা ভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দেই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে, যেদিন আমি আমার দলের লোকদের জিজ্ঞেস করি, আমাদের দেশের নাম কি হবে? কেউ বলে পাক বাংলা, কেউ বলে পুর্ব বাংলা। আমি বলি না, বাংলাদেশ। তারপর আমি শ্লোগান দেই, জয় বাংলা। তখন ওরা বিদ্রুপ করে, জয় বাংলা না জয় মা কালী ! কী অপমান ! সে অপমান আমি সেইদিন হজম করি। আসলে ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি। জয় বাংলা বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির জয়। যা সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে। ‘জয় বাংলা’ আসলে একটি মন্ত্র। যেমন বংকিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ বা, দাদাভাই নওরোজীর ‘স্বরাজ’ বা, গান্ধীজির ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বা, নেতাজি সুভাষের ‘দিল্লী চলো’। এ হলো শব্দ ব্রহ্ম। একটি শব্দের বা শব্দের সমষ্টির মধ্যে অসীম শক্তি নিহিত। সে শক্তি অসাধ্যসাধনপটিয়সী।’( ইন্দ্রপাত- অন্নদাশঙ্কর রায়, ‘বঙ্গবন্ধু’- সম্পাদনায়ঃ অভিনয় কুমার দাশ)।

(তথ্যসূত্র : অসমাপ্ত আত্মজীবনী : শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাপিডিয়া, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, চিন্তা-চেতনা, মন ও মননে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু- ড. আতিউর রহমান, ইন্টারনেট)

ছবি: গুগল