বছর চল্লিশেক আগের কথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিজানুর রহমান খান (বিবিসি সাংবাদিক)

আমি তখন দাদার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। বছরে সাকুল্যে দু’বার। স্কুল ছুটি হলে যাওয়া হতো। একবার যেতাম গরমের কালে, আমরা বলতাম আম কাঁঠালের ছুটি। এটাই সবচেয়ে লম্বা ছুটি ছিলো। আরেকবার যেতাম কোরবানির ইদের সময়। সারাদিন মাঠে দৌড়াদৌড়ি আর পুকুরে দাপাদাপি করে, জমিতে ফুটবল আর বাড়ির পেছনে জাম গাছের তলায় ডাংগুলি হা ডু ডু খেলে। গাছে ঝুলোঝুলি করে। দিঘিতে মাছ ধরে আর সন্ধ্যে নামলে হারিকেনের হলুদ আলোতে দাদীর মুখে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ছুটি পার হয়ে যেতো টেরও পেতাম না।

আমার অনেক বন্ধু ছিলো গ্রামের বাড়িতে। আসলে ওরা ছিলো চাচাতো জ্যাঠাতো ভাই বোন। ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে সারাদিন টই টই করে সারা গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। ওরা ছাড়াও আরও কিছু বন্ধু ছিলো আমার। দিনের শুরুতে আর দিনের শেষে ওদের সঙ্গেই প্রথম ও শেষ দেখা হতো।

ঘুম থেকে ওঠে আমি ওদের ঘরের দরজা খুলে দিতাম। ওদের মধ্যে একদল তখন দৌড়ে বাঁশ ঝাড়ের দিকে চলে যেতো। আরেক দল হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে নেমে যেতো পুকুরের পানিতে।

দুপুর বেলায় ওদের জন্য দিঘি ও পুকুর থেকে আমি খাদ্য সংগ্রহ করতাম। ওই খাদ্য ছিলো শামুক আর ঝিনুক। চালুন, কুনি জাল, আনতা, হেলুন জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় সেগুলোও ওঠে আসতো। জালে নানা রকমের শামুক ধরা পড়তো। মাছের সঙ্গে সেগুলোও আলাদা একটি ডুলায় তুলে রাখতাম।

দাদী এগুলোকে দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটতো। এজন্যে ছিলো কাঠের একটা গাদা। আসলে ওটা ছিলো গাছের কান্ড অথবা ডাল। দায়ের কোপ পড়তে পড়তে উপরের দিকে একটু ঢালু হয়ে মসৃণ একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। দাদী এক হাত দিয়ে ধরে শামুকটাকে রাখতেন ওই মসৃণ জায়গাটা ওপর। তার পর ডান হাত দিয়ে কোপ দিতেন। শামুকের খোলস ভেঙে তার ভেতর থেকে নরম একটা মাংস বের হয়ে আসতো। ওটাই ছিলো তাদের অতি প্রিয় সুস্বাদু খাবার।

সন্ধ্যা নামার আগেই ওরা দল বেঁধে বাড়িতে ফিরে আসতো। কখনও যদি একটু দেরি হতো, দাদী পুকুর পারে দাঁড়িয়ে তই তই করে এমন একটা ডাক দিতো, কিছুক্ষণ পর দেখতাম ওরা সুবোধ বালক বালিকার মতো গৃহের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে।

কিন্তু প্রতিবার যখন বাড়িতে যেতাম তাদের একজন আমাদের খাদ্য হতেন। আমাদের যাওয়ার আগে থেকেই তেল চর্বিওয়ালা একটাকে দাদী টার্গেট করে রাখতো। যেটা একটু বেশি মোটা তাজা হয়ে উঠতো সেটারই জীবনের সমাপ্তি ঘটতো। সেদিন দাদী ওদের ঘরের দরজা খুলে দেয়ার সময় কেমন করে জানি ওইটাকে রেখে দিতো ভেতরে।

– কী নাতি, আরেকটু গোস্ত দেই?

রাতের বেলায় পাটি পেতে যখন গোল হয়ে খেতে বসতাম দাদী আমার বাসনে ওদের মাংস তুলে দিতেন।

– দাদী এইটা কোনটা?

– লাল রাতাডা। তোমার লাইগা রাইখা দিসিলাম।

– ওহ।

– ওইডার কথা তোমার মনে আছে বাপ?

– হ দাদী, আমারে ঠোক্কর মারতে আইছিলো। আমি এমন দৌড় দিছি যে পুশকুনিতে গিয়া পড়ছিলাম।

পাশ থেকে দাদা হাসতে হাসতে বললেন, ওরে বুকের মাংসডা দাও।

আহারান্তে মাটির বিছানায় দাদীর গলা জড়িয়ে শুয়ে পড়ি আমি। আমাদের শিয়রের কাছে মিট মিট করে জ্বলে কুপি বাতি। বাতাসে কেরোসিনের গন্ধ। বাইরে দূরের ডোবা থেকে শোনা যায় ঝিঝি পোকার বিরামহীন ডাক। দাদী বলতে থাকেন গত মাসে কোনটা দুই হালি ডিম দিয়েছে, তার মধ্যে কয়টা বাচ্চা ফুটেছে, আর কোনো এক বৃষ্টির রাতে একটা গোখরা সাপ কেমন করে একটা ছানা চুপ করে নিয়ে গেল।

আমি নিশ্চুপ হয়ে শুনতে থাকি দাদীর কথা আর ভাবি রাত পার হয়ে কাল যখন ভোর হবে দরজাটা খুলে দিলে ওই লাল রাতাটা আমাকে আর তাড়া করতে ছুটে আসবে না।

ছবি: লেখক ও গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box