বন্ডদাদুর সঙ্গে দেখা

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): শকুন্তলা সানাইকে ঘুম পাড়িয়ে আমার কাছে রেখে মাম্মাকে নিয়ে গেছে কেমব্রীজ বুক স্টোরে বন্ডদাদুর সঙ্গে দেখা করতে। রাস্কিন বন্ড। প্রতি শনিবার এই বৃদ্ধ বয়সেও মুসৌরীতে থাকলে সরল গদ্যের দেবতা ভক্তদের দেখা দেন। বইয়ে সই দেন। গল্পও করেন। আমার না যাওয়ার কারণ হল মচকানো পা। আমার ডান পা টা গত পনেরো বছর ধরেই বিশ্বস্ততার সঙ্গে মোক্ষম মোক্ষম সময়ে টুইস্ট হয়েছে। প্রথম হয় রাজস্হানে। ফুলে ঢোল। তারপরে একবার মানসের জঙ্গলে। একবার সবাই মিলে নর্থ সিকিম যাব, তার ঠিক আগে আগেই। বিপ্লব’দা তো প্লাস্টার করে দেবেই। আমি জোর করে প্লাস্টার না করে একুশ জনের সঙ্গে জিরো পয়েন্টে গিয়ে বরফ দেখে এলাম।

রাস্কিন বন্ড

এবারের মুসৌরী আসাটা একদমই বেড়াতে আসা নয়। মাম্মা যবে থেকে রাস্কিন বন্ড পড়া শুরু করেছে এই দুন ভ্যালি, ল্যান্ডোরের ওই ঘন, আলো আটকানো দেওদার ফরেস্ট বা পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া লুকনো ঝর্ণার মতই রাস্কিন বন্ড ওকে আকর্ষণ করেছে। মেয়েটা কখনো কিছু চায় না আমাদের কাছে। মাঝেমধ্যে একটা নীল চিপসের প্যাকেট দাবী করে। আর গোপনে গোপনে একবার রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে দেখা করার অদম্য ইচ্ছে মনের মধ্যে রেখে দেয়। সুনীল গাঙ্গুলির সঙ্গেও দেখা করার প্রবল ইচ্ছে ছিলো। কাকাবাবু সারাক্ষণ মাথার পাশে নিয়ে ঘুমাতো। আমিও নীললোহিত নিয়ে ঘুমোতাম। শকুন্তলা সুনীলের কবিতা নিয়ে। হলো না। সুনীল চলে গেলেন। রাস্কিন বন্ডও যদি এরকম ফাঁকি দিয়ে চলে যান! আমি প্রতিবার বাইরে থেকে ফেরার সময় একটা করে রাস্কিন বন্ডের বই নিয়ে আসি আর মাম্মাকে বলি, দেখিস এবার ছুটিতে ঠিক মুসৌরি যাবো। তোকে বন্ডদাদুর সঙ্গে দেখা করিয়ে নিয়ে আসবো।
অনেকক্ষণ হলো শকুন্তলারা চলে গেছে। আমার কনফাইনমেন্টে রেখে গেছে ঘুমন্ত দেড়বছরও না হওয়া ছেলে আর দেওয়ালজোড়া কাঁচের জানলা। জানলার ঠিক বাইরেই একটা রোডোডেনড্রন গাছ। এখন মার্চের মাঝামাঝি। ফুলে ভর্তি হয়ে থাকার কথা সব রোডো। কিন্তু এই ঝাঁকড়া গাছে একটাও ফুল নেই। গাছের পরে খাদ। পেরোলেই সবুজে ঢাকা পাহাড়। বাঁদিকটায় দুন ভ্যালি। পুরো দেহরাদুন শহরটাই দৃশ্যমান জানলা দিয়ে। কাল রাতের বেলা মাথা ঘুরে গেয়েছিলো যখন প্রথম দেখলাম। হাজার হাজার লাইটে উতরাখণ্ডের রাজধানী ঝলমল করছে আর শহরের একটু উপরেই দোলের চাঁদ উঠেছে। মুসৌরী একটা অদ্ভুত পাহাড়ী শহর। প্রায় দার্জিলিংয়ের উচ্চতায়, কিন্তু অতবড় দুন ভ্যালিও দেখা যায়।

আমার মেয়ে ও তার মা রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে

বাইরে রোডোডেনড্রনের পাতাগুলো হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে। ফিক্সড্ গ্লাসের জানলায় শুধু ছবি আসে। হাওয়া আসে না, গন্ধ আসে না। ঠান্ডাও আসে না। গ্লাস ফিক্সড্ হলে জানলা উইন্ডো হয়ে যায়।
ছেলে এখনো ঘুমাচ্ছে। দু’একবার ঠেলে উঠছিলো। বর্গীর গান শুনিয়ে কান চাপড়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। মোবাইলে কোনও টাওয়ার নেই। হোটেলের ওয়াই ফাইতে নেট চলছে। মাম্মা এইমাত্র ফোন করেছিলো। হোয়াটস্ অ্যাপে। প্রচন্ড ইমোশনাল। ও বাবা ও বাবা, বলে আর কিছু বলতে পারছে না। আমি বললাম, ছুঁয়ে দেখেছিস বন্ড দাদুকে? বললো, ভেতরে বসে থাকায় প্রণাম করতে পারিনি। হ্যান্ডশেক করলেন উনি আমার সঙ্গে। আর বলেছেন আমার চিঠিগুলো পড়ে দেখবেন। পারলে উত্তরও দেবেন। আমি বললাম, তাড়াতাড়ি চলে আয়। মাকে বলিস একটা ক্র্যাচ নিয়ে আসতে।
ফোন ছেড়ে জানলার দিকে তাকালাম, দেখি একটু আগে একটাও ফুল না থাকা রোডোডেনড্রন গাছটা লাল থোকা থোকা ফুলে নুয়ে পড়েছে। পাহাড়গুলো সব টাটকা সবুজ হয়ে উঠেছে। যেন এইমাত্র খুব বৃষ্টি হয়ে গেলো। বৃষ্টির পরের রামধনুটাও ঠিকঠাকই দেখা যাচ্ছে আকাশে। কয়েকজন প্যারাগ্লাইডার গ্লাইড করতে করতে নীল আকাশের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। আমার জানলাটাও ওপেনএবল হয়ে গেছে জানিনা কিভাবে। আমি খাট থেকে নেমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে জানলা খুলে দিলাম। আহ্, ঠান্ডা। আমি খোলা জানলা পেরিয়ে আরও অনেকদূর দেখতে পাচ্ছি। দুন ভ্যালিরও পরে ঋষিকেশের গঙ্গা পেরিয়ে ট্রেনলাইন। আমি ট্রেনলাইন দেখতে পাচ্ছি। বনগাঁ লোকাল ছাড়ছে শিয়ালদা থেকে। আমার বাবার জন্য মনখারাপ করছে। মার জন্য। সুজিতের জন্য। মাম্মারা ফিরে আসলেই আমরা সবাই ঘুমন্ত শিশু নিয়ে প্যারাগ্লাইড করতে করতে বাড়ি চলে আসবো। হোম। সুইট হোম।

ছবি: গুগল আর লেখকের ফেইসবুক থেকে