বন্দে ভারত এক্সপ্রেস…

বিজয়া পুরকায়স্থ

(দিল্লি থেকে): আজকের লেখাটা বেনারস নিয়ে নয়…বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিয়ে । নিউ দিল্লি থেকে বেনারস আট ঘন্টায় পৌঁছে দিচ্ছে । কানপুর সেন্ট্রাল আর এলহাবাদ দুটো স্টপেজ মাত্র । যখন আমাদের বেনারস যাওয়া ঠিক হলো তখনও এই ট্রেন চালু হয়নি। অন্য ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছিলো কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার .. সব ট্রেনের মধ্যে শুধু আমাদের ট্রেনটা ক্যানসেল হয়ে গেলো। এদিকে 15th February বন্দে ভারত চালু হলো। পুরকী চট করে চারটে টিকিট কেটে ফেললো। তারপর অধীর আগ্রহে শুধু অপেক্ষা । গত ষোল মার্চ দিল্লি থেকে ভোর ছয়টায় ট্রেন ধরবো । প্ল্যাটফর্মে বন্দে কে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। ঝকঝকে তকতকে একটা অত্যাধুনিক ট্রেন..অনেকটা দিল্লি মেট্রো স্টাইলের। ধবধবে সাদা কাপড় আর টিন্টেড গ্লাস( জানালা ) পরে যেন কোনো সুন্দরী দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকলাম..আহা, মনে হলো প্লেনে সফর করতে এসেছি। পুরো ট্রেনই এসি চেয়ার কার। শুনেছিলাম ট্রেনটি ড্রাইভার-লেস তাই ইঞ্জিনের দিকটা দেখতে গিয়েছিলাম। ও হরি, ইঞ্জিন বলে আলাদা কিছু নেই। মেট্রো মতো আরকি। আর দেখলাম অতি সুদর্শন, কমবয়সী, স্মার্ট, কোট টাই পরা দু’জন সিটে বসা। মনে হলো দু’জন পাইলট ককপিটে বসে আছে। নক করায় ওরা দরজা খুললো। বললাম…শুনেছি ট্রেনটা ড্রাইভার-লেস .. তাহলে আপনারা কি করেন ? শুনে খুবই ক্ষেপে গেলো ওরা..” ক্যায়া, ট্রেন ড্রাইভার লেস ? কিসনে বোলা আপকো ? কাঁহা সে ইয়ে সব গুজব রটতা হ্যায়। বিলকুল ড্রাইভার চলাতা হ্যায়। ” আক্কেল গুড়ুম করে ফিরে এলাম। পুরকীকে বললাম দু’জন ড্রাইভার খুব সুন্দর করে হেসে হেসে মিষ্টি করে কথা বললো আমার সঙ্গে ।
এবার ট্রেনের ভেতরের গল্প করি। তুমি তোমার সিটে বসলে…সামনের ওয়ালে একটা ডিসপ্লে বোর্ড । ওটাতে কনটিনিউয়াস দেখাতে থাকবে… নেক্সট স্টেশন কি ? লেট আছে কি নেই ? কত মিনিট লেট ? কত স্পিডে চলছে ? সামনের স্টেশনে কোনদিকে দরজা খুলবে ? স্টেশন আসার আগে অ্যানাউন্সমেন্টও হয়। আগলি স্টেশন এলহাবাদ..দরওয়াজা ডাইনে তরফ খুলেগা। দো মিনিটকা স্টপেজ। দরজা বন্ধ হওয়ার আগেও অ্যানাউন্সমেন্ট হয়..এক মিনিট মে দরওয়াজা বন্ধ হোগা.. ছোড়নে আনেওয়ালে সজ্জন ট্রেন সে উতর জায়িয়ে। দরজাগুলো কিন্তু মেট্রোর মতো…ফসফস শব্দ করে খোলে। তুমি নিজে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ফুরফুর করে হাওয়া খেতে আর ধোঁয়া টানতে পারবে না আগেই বলে দিলাম। 
ট্রেনটার ম্যাক্সিমাম স্পিড 170km/hr কিন্ত 130 এর বেশী ওঠে না দেখলাম। মনেহয় উপযুক্ত ট্র্যাক তৈরী হলে ঐ স্পিডে যেতে পারবে। খাবার দাবারের কোয়ালিটি খুব ভালো। ব্রেকফাস্টে অনেক কিছুর সঙ্গে টার্ট দেখে আমাদের দুই মা রিসার্চে বসে গেলেন। এটা কি বস্তু ? খাওয়া উচিত কি না? ওদেরকে টার্টের রেসিপি বোঝাতে বোঝাতে আমার চা ঠান্ডা হয়ে গেল। লাঞ্চ এলো পিন্ড বালুচি থেকে।
বাইরে বেরোলে আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা হলো টয়লেট । সেটা দেখে তো আমি আহ্লাদিত। খুব আহ্লাদ এলে আমার আবার টয়লেট ব্যবহার করার উপক্রম চলে আসে। ব্যবহার করলাম…টয়লেট তোমাকে একবারে অজস্র জল ব্যবহার করার অনুমতি দেবে না। কিছু সময় পরই টয়লেট স্প্রে বন্ধ হয়ে গেলো। আমি তো পড়লাম বিপদে। ভাবলাম অন্য ট্রেনের মতো শালার এই ট্রেনেও বোধহয় জল শেষ হয়ে গেছে। স্প্রে তার জায়গায় রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি। কি করি ? কি করি ? পুরকীকে ফোন করে কি বলবো ..এক বালতি জল নিয়ে এসো ? একটু পর আবার স্প্রে চেক করলাম। দেখলাম ফুল স্পিডে জল বেরোচ্ছে। বুঝলাম ব্যাটাকে একটু পর পর স্বস্থানে না রাখলে সে জল দেবে না। ফালতুতে জল নষ্ট করা আটকাচ্ছে সে। কমোড ফ্লাশ করতেই এমন গোঁ গা, গাঁক গাঁক ঘড়ঘড় শব্দ হলো যে আমার হার্ট অ্যাটাকের অবস্থা…ভাবলাম কিছু নষ্ট করে ফেললাম না তো ? চেয়ে দেখি অল ক্লিয়ার । আমি এসব বলছি তাদের জন্য যারা আমার মতো হাবাগোবা অগা।
ফেরার সময় আমাদের কোচটা একদম সামনে। একটু উঁকি দিলেই গ্লাস উইন্ডো দিয়ে ড্রাইভারদের দেখা যায়। এই কোচে একটা সিট আছে differently abled person এর জন্য আর একটা টয়লেট পুরোপুরি ওদের সুবিধানুযায়ী বানানো। সব কিছুই ফেদার টাচ। সেই টয়লেটের ধরণধারণ দেখে আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ব্যবহারের জন্য মরিয়া হয়ে গেলাম। কিন্তু বেশী উত্তেজিত হলে আমার আবার সব উল্টো চলে। তাই শুধু চোখে দেখেই আশ মেটালাম।
তোমরা তাড়াতাড়ি এই ট্রেনে সফর করে নাও। এটা ভারত তো…কতদিন আমরা এই ট্রেনকে ঠিক করে রাখতে পারবো সেটা ভগবানও জানেন না । টিকিটের দাম একটু বেশী আর সিনিয়র সিটিজেনের জন্য নো অফ।
শেষে একটু নিন্দে না করলে মনটা হালকা হচ্ছে না…যতই হোক শরীরে ভারতের রক্ত বইছে তো…ভারতের একটু নিন্দে না করলে লোকজনের আমার সিটিজেনশিপ নিয়ে সন্দেহ করবে । ট্রেনের সিটগুলো রিক্লাইন করা যায় না। আটঘন্টা সোজা হয়ে বসাটা একটু কষ্টকর । রেলওয়ে ট্রেকে নীলগাই এসে পড়ে …রেলিং মেলিং দিয়ে ওদের আটকাতে হবে। আর পুরকী বললো…সবই যদি প্লেনের মতো তাহলে এয়ারহোস্টেসের মতো মেয়েরা এসে খাবারদাবার সার্ভ করেনা কেন ? এই গোঁফ দাঁড়িওয়ালাগুলোকে পুরকীর মনে হয় পছন্দ হয়নি।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে