বন্ধুতা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নুসরাত নাহিদ
লেখক

আমার কোনও বন্ধু নেই….আজ বন্ধুদিবসে কেউ হয়তো চাঁদের নীচে শিরিষবনে হাঁটতে হাঁটতে এটাই ভাবছেন আর বুক ঠেলে উঠে আসা বাষ্পগুলি বার বার ফিরিয়ে দিচ্ছেন অতলান্তে। সেই পিচ্চিবেলার বন্ধু মীরা, নাফিসা, রিমি, অপরাজিতা একটু বড় হতে হতেই কেমন যেন বদলে যায়। তারপর পড়াশুনোর ধারা একেকজনের একেকরকম হওয়াতে যোগাযোগেও এসে পড়ে ভাটা।তারপর শুরু হয় সংসারের সাতকাহন।

স্কুলের প্রিয় শিক্ষকের অমোঘ বাণী- ‘ক্লাস নাইন পর্যন্ত বন্ধুতা নিষ্কলুষ, এরপর তৈরি হয় ব্যক্তিত্ব, সঙ্গে শুরু হয় ব্যক্তিত্বের সংঘাত।’ এক লহমায় সে-ই পর হয়ে যেতে পারে যাকে একটু আগেও না দেখে থাকতে পারাটা দুরূহ ছিলো। আত্মার পাশের যে জন, সেও কি মনের সব খবর রাখে, না রাখতে পারে?

তবু কিছু কিছু মানুষের বন্ধুভাগ্য বেশ ঈর্ষনীয়। সারাক্ষণ তারা হা হা হি হি’র মধ্যেই। একটু পেছন ফিরলে তারাই আবার একজন অন্যজনের পিঠে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছেন। বয়সে বেড়ে ওঠার এ এক অভিসম্পাত। বন্ধু নামগুলি বদলে গিয়ে কখনো খুব দ্রুতই শত্রু হয়ে যায়। তবুও ব্যতিক্রম থাকে, এবং থাকে বলেই ধরিত্রী এখনো হরিৎ।

আবার ইন্দ্রজালিক বিশ্বে শত সহস্র বন্ধু শুধুই ‘কন্ট্যাক্টস’- তারা আসেন, মুখবইয়ের পাতা খুলে খানিক তামাশা দেখেন, কখনো ঈর্ষিত (ঈর্ষা-মিশ্রিত ভালোবাসায় সিক্ত) হন, কখনো হিংসেয় জ্বলে পুড়ে যান, কখনো করুণায় গলে যান, কখনো ভালোবাসার পাত্র উপুড় করে ঢেলে দেন, কখনো অন্ধ ভক্ত বনে যান, কখনো আবার বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নৈশব্দের কাঁথা মুড়ে হারিয়ে যান। কিছু আমরা জানি, আর অনেকটাই জানিনা।

স্বামী বা স্ত্রীও কিংবা ভালোবাসার মানুষটি কারও কারও ক্ষেত্রে পরম সখা- এরকমটা হাতে গোনা। কেউ হয়তো আজীবন ভেবে যায় তার সঙ্গীর কাছে মনবইয়ের সব পাতা মেলে দেবে, কিন্তু সে আর পেরে ওঠেনা, যখন সঙ্গী তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, কিংবা যথাযোগ্য সম্মানটুকু ধরে রাখতে পারেনা। অনুভূতিগুলি হোঁচট খেয়ে ফিরে গেলে প্রত্যাবর্তন কঠিন হয়ে পড়ে। তখন হাজারবার ভালোবাসি বললেও ক্ষত সেরে উঠতে সময় লেগে যায়, অনেক।

ইনবক্সে, ক্ষুদে বার্তায় বন্ধুদিবসের বার্তায়, ভিডিওক্লিপে, ছবিতে আজ টইটুম্বুর। একটু ভাবুন তো, এই শত শত বন্ধুর ভিড়ে আপনি নিজে কি একটু খেই হারিয়ে ফেলছেন না? এতো এতো বন্ধু কিংবা শত্রুর মাঝে আপনি নিজে কি নিজের বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছেন? যখন নিজের ভুলভ্রান্তি কিংবা অভিমানে নিজের উপরই অকল্পনীয় রাগ হয়, নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়, তখন কি বন্ধুর মতো নিজেই নিজেকে সামলে নিতে পারেন? না কী নিজেকে আরও উস্কে দেন নিজের ক্ষতি করার নিমিত্তে?

সময় বদলে যায়, সঙ্গে বদলায় পারিপার্শ্বিকতা। সেই বদলের রঙ এসে ধরে বন্ধুজ্ঞান করা মানুষটির মুখছবিতেও। এমন অস্থির সময়ে যে বন্ধুটির উপর সব চেয়ে বেশি ভরসা রাখতে পারতেন, সে যদি আপনাকে ব্যর্থ করে দেয়, তখন নিজের উপরও ভরসা হারালে ষোল আনাই হারিয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও আমরা নিজেরা নিজেদের বন্ধু হয়ে উঠতে পারি কী, কখনো?

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]