বর্ষা ও বিভূতিভূষণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নেটফ্লিক্স নেই তখন, নেই ফেইসবুকের হাতছানিও। তখন বৃষ্টি এলে কী ভাবতেন বিভূতিভুষণ? তাঁর তাল নবমী গল্পটার কথা? সেই ঝমঝম করে নামা বৃষ্টির কথা? আমাদের জীবন হরিপদ কেরানীর মতো হলেও সেখানে ছেঁড়া ছাতার সঙ্গে রাজছত্রও আছে মনের ভেতরে। সেই ছাতার তলায় কত বৃষ্টিদিনের স্মৃতি। খাতাকলমের বর্ষাকাল আর মাথা চুলকানো কোনো আবহাওয়াবিদের বিব্রত ভবিষ্যতবাণী টপকে কদম ফুলে বৃষ্টির ছিটে লাগে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখতে পান সে বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ছে উন্মুখ গাছের শরীরে। পিঁপড়াদের বাড়িতে।বৃষ্টি আসে ধানক্ষেতের বিস্তার ছুঁয়ে। লঞ্চঘাটে করুণ চায়ের দোকানের তোবড়ানো চালে রিমঝিম রিমঝিম শব্দ তুলে কথা বলে। মিশে যায় ভিজে ক্লান্ত রিকশার বেলের টুং টাং শব্দের সঙ্গে। দাঁত বের করে পড়ে থাকা শহরের ক্লান্ত জেব্রাক্রেসিংয়ে।ঘর্মাক্ত পুলিশের শার্ট একদিন এ শহরে কি খুঁজতে যাবে গল্পের মাধুরী মাখা সেই বৃষ্টি? একদিন ছাতা মাথায় বৃষ্টিমুখর কোনো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নন্দিনী খুঁজবে কাউকে? তার চশমার কাচে ভেসে যাবে বৃষ্টি ছড়ানো কোনো বর্ষাক্লান্ত বিকেলের স্মৃতি?
বর্ষাকাল এমনই। গুছিয়ে রাখা সব গল্প এলোমেলো করে দেয়। বসে থেকে থেকে তখন আর ক্লান্ত হয় না মন। ডুবে যাওয়া পথঘাট, গাছের মাথায় একা বসে ভিজতে থাকা পাখি আর ছাইবর্ণ আকাশের দিকে চোখ রেখে মনের মধ্যে ভেসে ওঠে কত জলমগ্ন সিঁড়ি। বর্ষা বাঙালির জীবনে অদ্ভুত এক টান। এবার বর্ষাকালের সূচনায় প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘বর্ষা ও বিভূতিভূষণ’।

মেঘমল্লার শব্দটা উচ্চারণ করলে শুধু একটা রাগের কথা মনে পড়ে না। বাতাসে যেন উড়ে আসে গোটা একটা ঋতু, ঘনিয়ে আসা মেঘ আর বৃষ্টি। ভৈরবী কি শুধুই উদাস ভোর? দরবারি কানাড়া রাজার অশ্রুপাত?মেঘমল্লার যেন আর একটু এগিয়ে, কারণ এটি প্রায় এক স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতার মতো, ধ্বনি ও অক্ষরের গড়নে, যাতে মেঘগর্জন, বারিধারা, বিজলিচমক, রুপালি আঁধার, বিরহ, হয়তো আনন্দ, এবং প্রেম ছেয়ে আছে। এই অনুভূতিগুলো জড়িয়ে আছে আমাদের বর্ষাকালের সঙ্গে। এই ঝড় আর বন্যার দেশে মেঘ ও বর্ষার জন্য কী উপাসনা আমাদের! পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে তাঁর ‘হিন্দুস্থানী সংগীত পদ্ধতি’র দ্বাদশ ও শেষ খণ্ডে নয় প্রকার মল্লারের স্বরলিপি ও গান রেখেছেন। সেখানে মেঘমল্লারের গানের সংখ্যা সর্বাধিক এগারো।রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরে ঋতুসংগীত রচনা করেছেন সংখ্যায় কম, কিন্তু তার মধ্যেও বেশিটাই বর্ষা নিয়ে আর তার সবই মল্লারের ঘরের। পরের চল্লিশ বছরে ঋতুসংগীত লিখলেন অনেক এবং সেখানেও বর্ষার গানের প্রাধান্য, প্রয়োজনে নিজের মতো করে নিলেন মল্লারকে, যেমন রবিমল্লার, এবং এক সময় ইমন, ইমনকল্যাণ, সিন্ধু, সিন্ধুকাফি, ভূপালি, বেহাগ, ভৈরবীও জুড়ে গেল বর্ষায়। বর্ষা ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ।হয়তো নন্দিনীরও।
বর্ষার বৃষ্টি পতনের একটানা ছন্দ মনকে নিয়ে যায় দূর কোনো এক নির্জনতায়। সেখানে মাঠের পর মাঠ জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে, আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে আছে ধূসর মেঘের প্রেমে।ক্লান্ত ঘুঘু ডেকে যাচ্ছে কোনো আড়াল থেকে, হাওয়ার বেগে দুলছে সুপারি গাছের মাথাগুলো। আকাশ থেকে উড়ে আসা বৃষ্টি সাদা চাদর বিছিয়ে রেখেছে জলের উপর, অলস দিগন্তজুড়ে ঝুলে আছে বৃষ্টির পর্দা।বর্ষার সঙ্গে কত কী জড়িয়ে থাকে আমাদের! ইলিশ মাছ, গরম চা, মুড়ি, বাইরের বারান্দা থেকে ভেসে আসা হুকার তামাকের কটু ঘ্রাণ, বাগানে সাদা জবাফুলের গাছ, ঘরের কোণে আলস্যে জাল বুনতে ভুলে যাওয়া মাকড়সা, শহরের ভেজা গলিতে ড্রপ খেতে থাকে কিশোরবেলা, ভারী হয়ে যাওয়া ফুটবল, কোনো কোনো দিন স্কুলে রেইনি ডে-এর দরখাস্ত লেখা, দৃপুরবেলা হারিয়ে যাওয়া ছাতা…আরো কত কী?
বর্ষাকালের একাগ্র বিবরণ আছে বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসে লবটুলিয়া, নাঢ়াবৈহারের অরণ্য-প্রান্তরে আর ঝনঝরি পর্বতে ভাঁজে ভাঁজে।আছে পথের পাঁচালী উপন্যাসে অপু আর দূর্গার আটকে পড়া বৃষ্টির বিবরণে। ‘বর্ষা রীতিমতো নামিয়াছে। অপু মায়ের কথায় ঠোয় রায়েদের চণ্ডীমণ্ডপে পিওনের প্রত্যাশায় বসিয়া থাকে। সাধু কর্মকারের ঘরে চালা হইতে গোলা পায়রার দল ভিজিতে ভিজিতে ঝটাপট করিয়া উড়িতে উড়িতে রায়েদের পশ্চিমের ঘরের কার্নিসে আসিতেছে, চাহিয়া চাহিয়া দ্যাখে। আকাশের ডাককে সে বড় ভয় করে। বিদ্যুৎ চমকাইলে মনে মনে ভাবে-দেবতা কিরকম নলপাচ্চে দেখেচোঁ, এইবার ঠিক ডাকবে-পরে সে চোখ বুজিয়া কানে আঙুল দিয়া থাকে’।
বর্ষা শহরকে এলোমেলো করে প্রেমে পড়া যুবকের মতো। হয়তো সকালবেলা বৃষ্টি নেমেছে। কখনো রাতে নামা বৃষ্টি-ই শেষ হয়নি। ঝুপ ঝুপ করে ঝরছে তো ঝরছেই। রাস্তায় পানি জমেছে।বৃষ্টিতে ভিজে কেউ বাজারে যাচ্ছে, ভোরে দরজার তলায় ভেজা খবরের কাগজ, কোনো বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান-ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না…। বৃষ্টি কিন্তু থামার নাম নেই।স্যাণ্ডেল ভিজছে, ভিজছে শার্ট, ভিজছে একমনে কারো বাগান। কবি আবুল হাসান তাঁর কবিতায় লিখেছেন,
‘বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হয় তোমার পায়ের পাতার শব্দ
আকাশের ভ্রু চমকে জল নামেঃ জল আয়ুস্মতী।’
আকাশের ভ্রু চমকে জল নামে! এতো বজ্রপাত আর বৃষ্টির গল্প। আকাশের ভ্রু তো চমকায় বজ্রপাতের সময়। আর এমন বৃষ্টি তো বর্ষাকালেই মানায়।আর সেই বর্ষাতেই তো কবি কালিদাসের কাল থেকে হেঁটে আসছে প্রণয়িনী।
দিনগুলো যেন লিটমাস পেপারের মতো সব ভালোলাগা শুষে নিয়ে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে হয়তো কোনো নন্দিনীর স্মৃতিও। নন্দিনীর কথা ভাবতে ভাবতে আজো কেউ বাতাবিলেবুর গাছে সাইকেল হেলান দিয়ে চলে যায় কোন বিজন পথে। নন্দিনী বর্ষাকাল ভালোবাসতো, হয়তো আজো বাসে।নন্দিনীর চশমার কাচে সেই কবেকার বর্ষার বৃষ্টির ছাঁট লেগে আছে। কোথাও রেডিওতে গান বাজছে-আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন…।
বিভূতিভূষণ নন্দিনীকে জানতেন না। নন্দিনির কাছেও বিভূতিভূষণ অচেনা। তবু বর্ষা মিলিয়ে দেয় যেন সব ছন্দ পতন। বর্ষা এলে আলস্যে আড়মোড়া ভাঙে সুদূর মফস্বলের রেলস্টেশনের পূর্বজন্মের ঘড়িটা।সব হারিয়ে যেতে থাকে বৃষ্টি পতনের শব্দে অবিরাম।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box