বলিভিয়ার বিশ্বাসঘাতকরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বলিভিয়ার সবুজ হয়ে থাকা এক পাহাড় চূড়া। নিচে তাকালে ঘন জঙ্গল। ১৯৬৭ সালের মার্চের এক বিকেল। পাশের আরেকটা পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উঠে আসছে দু’জন মানুষ। দূর থেকে তাদের অস্পষ্ট দেখায়। দু’জনের মধ্যে একজন পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া গেরিলা দলের নেতা। বাইরের পৃথিবীতে তার মৃত্যুর গুজব ভেসে বেড়াচ্ছে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায়। ক্রমশ দুই মূর্তি আরও স্পষ্ট হয় চড়াই উৎরাই পার হয়ে। দলনেতার কাঁধে ঝুলছে এম-২ রাইফেল, ব্যাগ। তার মাথায় প্রায় চোখ ঢাকা পড়ে এমন টুপি, গালে পাতলা দাড়ি ঠোঁটের কোণায় ধোঁয়া ওঠা পাইপ।মানুষটা চূড়ায় উঠে এসে হাঁফ ছাড়েন। কাঁধের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে সেটার গায়ে হেলান দিয়ে রাখেন রাইফেলটা। তারপর কয়েক পা এগিয়ে সামনে তার জন্য অপেক্ষমান আরেকজন মানুষকে গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরেন। তারা দু’জন কিছুক্ষণ একে-অপরকে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখেন।

চে ও চিরো বাস্টস কিউবায়

সেই দলনেতার নাম আর্নেস্টো চে গুয়েভারা। তিনি তখনও জানেন না ৭ মাস পরে তার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু। আর তাঁর সামনে দাঁড়ানো সেই আর্জেন্টাইন চিত্রশিল্পী চিরো বাস্টস চিহ্নিত হতে যাচ্ছেন একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।

চে গুয়েভারার বলিভিয়া বিপ্লব প্রচেষ্টার অপমৃত্যু ঘটেছিলো। পরে হত্যা করা হয়েছিলো চে গুয়েভারাকে। তাঁর বেশিরভাগ সহযোদ্ধা ধরা পড়েছিলেন বলিভিয়ার সেনা আর সি.আই.এ-এর এজেন্টদের হাতে।সেই ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের অনেকের লেখায় কয়েকজন মানুষের নাম উঠে এসেছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো বলিভিয়ায় চে’র অবস্থান ও পরিচয় প্রকাশ করে দেয়ার। চিরো বাস্টোসের পাশাপাশি এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তখন ফরাসী সাংবাদিক, দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক রিজেস ডেবরে ডাবরে ও চে গুয়েভারার কথিত প্রেমিকা তানিয়া। চে’র জীবনী লেখক পিয়েরে কালফন তো সরাসরি তার লেখায় চিরো বাস্টসকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।

কে এই চিরো বাস্টস? কে-ই বা রিজেস ডেবরে? তারা কী সত্যিই চে গুয়েভারার বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের মুখে? চিরো বাস্টস তো সেই কিউবা বিপ্লবের সময়ে যোগ দিয়েছিলেন চে গুয়েভারার সঙ্গে। ডেবরে চে মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে বলিভিয়ায় পৌঁছেছিলেন চে’র সঙ্গে রাজনীতি ও গোটা লাতিন আমেরিকায় বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে। আর তানিয়া? এই নারীটি তো বলিভিয়ায় সরাসরি চে গুয়েভারার গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাহলে এদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠলো কেনো?

তানিয়া

চিরো বাস্টসের বেলায়চে গুয়েভারাকে ঘিরে তার একান্ত নিজস্ব গল্পটা শুরু হয়েছিলো ১৯৫৮ সালে। বাস্টস তখন আর্জেন্টিনায়। একদিন রেডিওতে তিনি জর্জ মাসেটি নামে এক সাংবাদিককে দেয়া চে’র সাক্ষাৎকার শোনেন। চেগুয়েভারার কথা বলার ভঙ্গিতে আন্তরিকতা পলকেই বাস্টসের মধ্যে চে’র প্রতি আকর্ষণ তৈরি করেছিলো। তার মনে হয়েছিলো চে যেন একটা ক্যাফেতে বসে খুব সাধারণ ভঙ্গিতে কথা বলছেন। বাস্টস কিউবা বিপ্লবে অংশ নেয়ার জন্য ওই বছরই সমুদ্র পার হয়ে আর্জেন্টিনা থেকে কিউবা চলে গিয়েছিলেন।

কিউবায় বাস্টস নজরে পড়ের চে’র বন্ধু ড. আলবার্তো গ্রানাদোর। এই বন্ধুই চে গুয়েভারার সঙ্গে মটোরসাইকেলে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা চষে বেড়িয়েছিলেন। ড. গ্রানাদোই চিরো বাস্টসকে নিয়ে গিয়েছিলেন চে গুয়েভারার কাছে। বাস্টসের ভাষায়, চে এক সন্ধ্যায় তার সঙ্গে রাস্তার পাশে একটি ক্যাফেতে বসে কথা বলেছিলেন। বাস্টসের মনে হয়েছিলো, আর্জেন্টিনার দু’জন মানুষের বহুদিন পর দেখা হয়েছে। তারা গল্পে বিভোর হয়ে গেছে।

চিরো বাস্টস চে গুয়েভারার সঙ্গে তার সব স্মৃতি এক জায়গায় জড়ো করে ২০০৭ সালে একটি স্মৃতিকাহিনি প্রকাশ করেন। ‘চে ওয়ান্টস টু সি ইউ’ নামে। এই স্মৃতিকাহিনি বাস্টসের আত্মপক্ষ সমর্থন বললে ভুল বলা হবে না। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগকেও বইতে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন বাস্টস। বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাস্টস লন্ডন যান রিচার্ড গট আর ক্রিস্টোফার রোপারের আমন্ত্রণে। এই দুই সাংবাদিক ১৯৬৭ সালে প্রথম চে গুয়েভারার মৃত্যুর খবরটা প্রকাশ করেছিলেন বলিভিয়ার ভিলাগ্রান্দা থেকে।

সেই সন্ধ্যায় বাস্টসের সঙ্গে অনেকটা সময় ধরে কথা বলেন চে। তিনি তখন গোটা লাতিন আমেরিকায় বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি নিজে নেতৃত্ব দেবেন সেই বিপ্লবের। নিজের জন্মভূমিতে সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা করতে চে গুয়েভারা কিন্তু চিরো বাস্টসকেই বেছে নিয়েছিলেন। দুজনের দীর্ঘ আলোচনার পর চে আর্জেন্টিনায় প্রাথমিক কাজ শুরু করার জন্য বাস্টসকেই বেছে নেন। কথা হয় সেখানে বাস্টসের পাশাপাশি কাজ করবে সেই সাংবাদিক জর্জ মাসেটি।এই সাংবাদিকও তখন পেশা ছেড়ে দিয়ে চে গুয়েভারার সঙ্গে কাজ করছিলো। কিন্তু বাস্টসের  বিরুদ্ধেই কেন বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠলো? কেউ কেউ বলেন, ১৯৬৭ সালের ১৯ এপ্রিল বাস্টস আর ডেবরে চে গুয়েভারাকে শেষবারের মতো বিদায় জানান। চে তাদেরকে চলে যেতে নির্দেশ দেন। কারণ বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী পাহাড়ে প্রায় ঘেরাও করে ফেলেছে বিপ্লবীদের। নির্দেশ অনুয়ায়ী তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে গেলেও কয়েক ঘন্টার মধ্যে ধরা পড়েন সেনাবাহিনীর হাতে।

জিঞ্জাসাবাদের মুখে বাস্টস প্রথমে বলেছিলেন, তার নাম কার্লোস আলবার্তো ফ্রুটোস। পেশায় সাংবাদিক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু ২০ দিন পর আর্জেন্টিনা থেকে তার আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে আনার পর ধরা পড়ে যান বাস্টস। তার পরিচয় পেয়ে সামরিক গোয়েন্দারা তাকে চে গুয়েভারাসহ দলের অন্যান্য সদস্য এবং মূল ক্যাম্পের ছবি এঁকে তাদের দিতে। বাধ্য হয়েছিলেন বাস্টস ছবিগুলো আঁকতে। তিনি তখন জানতেন, গোয়েন্দারা যা খুঁজছে সে সম্পর্কে তাদের মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। তাই বাস্টস দাড়িগোফওয়ালা কিছু গেরিলা সদস্যের ছবি তাদের এঁকে দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না বিপ্লবীদের। কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস তাকে ক্ষমা করেনি।

বাস্টস কিন্তু তার স্মৃতিকাহিনিতে অভিযোগ খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। অনেক পরে সুইজারল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার সম

রেজেস ডেব্রে

য় এক সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি যাদের স্কেচ করেছিলেন তাদের সবার পাসপোর্ট বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তখন চলে এসেছে। চে ছাড়া বাকিদের অনেকের পরিচয়েই তারা জেনে গেছে। তাই নিজের আর্জেন্টিনা কানেকশন আড়াল করতে তিনি সেদিন পরিচিতদের ছবি এঁকে তুলে দিয়েছিলেন গোয়েন্দাদের হাতে।

চে গুয়েভারার মৃত্যু সংবাদ বাস্টস জানতে পারেন ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর সকালবেলা। সেদিন কোর্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো রেজেস ডেব্রে আর চিরো বাস্টসকে। ওই সময়ে একজন সেনাসদস্য সেখানে আসে এবং উপস্থিত অফিসারকে কানে কানে খবরটা জানায়। বাস্টস শুনে ফেলেন সেই মর্মান্তিক সংবাদ।

বাস্টসের আঁকা সেই স্কেচ

চে আর নেই। পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মন্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার মানুষটি বিদায় নিয়েছেন।সেদিন তাকে আর ডেব্রেকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয় বলিভিয়ার কোর্ট। রেজেস ডেব্রের শাস্তির বিরুদ্ধে পৃথিবীজুড়ে তখন আলোড়ন তৈরি হয়।ফ্রান্সের তৎকালীন দ্য গল সরকার ফরাসী নাগরিক হিসেবে তার মুক্তি দাবি করে। সোচ্চার হয়ে ওঠেন জাঁ পল সার্ত্রে, বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিক, লেখকরা। বিপাকে পড়ে যায় বলিভিয়ার তৎকালীন সরকার। ওই সময়ে বাস্টসের নাম কিছুটা আড়ালে চলে যায়। তিনিও অবশ্য এটাই চেয়েছিলেন। তাকে নিয়ে আলোচনা বেশি হলে চে গুয়েভারার  লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে বিপ্লবেরপরিকল্পনা সেদিন ফাঁস হয়ে যেতো।কারণ সি.আই.এ তখনও বাস্টসের সঙ্গে আর্জেন্টিনায় চে’র বিপ্লবের পরিকল্পনার যোগসূত্র খুঁজে পায়নি।

কিন্তু তবুও ইতিহাসের পাতায় পরবর্তী ৪০ বছর বাস্টস চিহ্নিত হন একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। কিন্তু চে গুয়েভারার আরেকজন জীবনীকার জন লী এন্ডারসনের গবেষণায় রেজেস ডেব্রের নাম উঠে এসেছে। ওই সময়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এন্ডারসনকে জানান, বাস্টস নয়, মুখ খুলেছিলেন ডেব্রে। তাঁর কথার মধ্যে দিয়েই পাহাড়ে বিপ্লবীদের অবস্থান এবং চে গুয়েভারার ছদ্মনামটিও গোয়েন্দারা জেনে যান। বাস্টস এমন কয়েকজনের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন যাদের পরিচয় আগেই জানা ছিলো সবার।

বাস্টস ও ডেব্রে ১৯৭০ সালে বলিভিয়ার কারাগার থেকে ছাড়া পান। অব্যুত্থান করে ক্ষমতায় আসা তৎকালীন সেনা সরকার তাদের মুক্তি দেয়। ডেব্রে মুক্তি পেয়ে ফ্রান্সে ফিরে যান এবং তখনকার মিতেরাঁ সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু বাস্টস? তিনি মুক্তি পেয়ে প্রথমে স্বদেশে ফিরে যান। তারপর চিলিতে। কিন্তু সেনা শাসকদের রক্তচক্ষুর কারণে দুটি দেশ থেকেই তাকে পালাতে হয়। ১৯৭৬ সালে বাস্টস স্ত্রী ও সন্তান সহ পালিয়ে যান সুইডেনে। সেখানেই রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারী তিনি মারা যান সেখানেই।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ডিলেইড গ্রাটিফিকেশন, দ্য গার্ডিয়ান, লাতিনো লাইফ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box