বসন্তের আগমনে কবি রফিক আজাদের জন্ম

অনু হোসেন, প্রবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক

যদি ভালোবাসা পাই শুধরে নেব জীবনের ভুলগুলি; যদি ভালোবাসা পাই শিল্প-দীর্ঘ পথে বয়ে যাবো কাঁথাগুলি’– জীবনের ভুলগুলিকে ভালোবাসা আর শিল্পের শুদ্ধতা দিয়ে বদলে নিতে চেয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ। বসন্তঋতুর প্রথম ভোরে বাংলা ভাষার কবি রফিক আজাদের জন্ম।

পঞ্চাশের পর বাংলা কবিতার জমিতে যে তুমুল আধুনিকতার বীজ বপনের যাত্রা শুরু হয়েছিল রফিক আজাদ সে-প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তিনি জীবন বাজি রেখে দুহাতে কবিতা লিখেছেন।

‘জীবনের কাছাকাছি শিল্প না শিল্পের কাছাকাছি জীবন’–এই নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু রফিক আজাদ পঁচাত্তর বছরের যে-জীবন যাপন করে গেছেন তার একমাত্র অবলম্বন তিনি গড়েছেন শিল্পে। বৈষয়িকতা ও সময়ের প্রলোভনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সারাটা জীবন কাব্যদেবীর সাধনা করেছেন কবিতার রাজপুরুষ রফিক আজাদ।

‘মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে’– জীবনানন্দ দাশের এ পঙক্তি আজ রফিক আজাদের ক্ষেত্রে নির্জলা সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। মরণশীল এ জীবনে শিল্পবিবাগী মানুষকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে হয়। জীবনানন্দের স্বপ্ন ছিল এক সাহিত্যমুগ্ধ জীবনের, যেখানে প্রাধান্য পেয়েছিল কবিতা আর কবিতামুখী গদ্যশিল্পের সংসার। রফিক আজাদের সংসারে সহধর্মিণী কবি দিলারা হাফিজ ও দুই পুত্র অভিন্ন-অব্যয় মিলে ৩ জনের সমাহার হলেও সারাটা জীবন প্রাধান্য পেয়েছিল কবিতার।

সহজিয়া মন আর আবেগী ব্যক্তিত্ব তাঁর সময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। কবিতার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আধুনিক বাংলা কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে তুমুল আবেগের প্রকাশে নয়, বরং সংহত চেতনার কারণে। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় চেতনার সংহতি এনেছেন জীবনানন্দ দাশ। তারপর বাংলা কবিতার স্রোতধারা চলে গেছে নানা বাঁকে। আবেগ, অনুভব ও টেকনিকের অভিনবত্বে কবিতার জমিতে ফলেছে নতুন নতুন ফসল। এই ফসলের সফল রূপকারদের সেরা প্রতিনিধি কবি রফিক আজাদ। কল্পনার সংহতির সঙ্গে হৃদয়ের বিস্তৃতি দিয়ে তিনি লিখে গেছেন কবিতার পর কবিতা।

তাঁর কবিতার বইয়ের সংখ্যা প্রায় অর্ধ শতাধিক। ১৯৭৩ সালে প্রকাশ পায় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ অসম্ভবের পায়ে। প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তিনি পাঠকমহলের ব্যাপক সাড়া পান। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, সশস্ত্র সুন্দর, হাতুড়ির নিচে জীবন, করো অশ্রুপাত, পাগলাগারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি, বিরিশিরিপর্ব, হৃদয়ের কী বা দোষ, সুন্দরের দিকে চোখ রেখে প্রভৃতি।

রফিক আজাদ চলে গেছেন আমরা কখনো তা বিশ্বাস করিনি, এমনকি মেনেও নেইনি। তিনি আমাদের চেতনায়, ভালোবাসায় আছেন, থাকবেন অনাদিকাল। তাঁকে স্যালুট!!!

কবিতামুখী সংসারে আচ্ছন্ন হওয়ায় জীবনসংসারের প্রতি তার মনোযোগ পড়েছে অপেক্ষাকৃত কম। বিষয়বৈভব নিয়ে খুব বেশি ভাবেননি বলে বারবার তাঁকে পেশার পরিবর্তন করতে হয়েছে। কখনো অধ্যাপনা, কখনো সাংবাদিকতা আবার কখনো সরকারি চাকুরির মধ্য দিয়ে তার পেশাগত বৈচিত্র্যময় জীবন পূর্ণ করে গেছেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাশ করার পর ১৯৬৮ সালে মাওলানা ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত এম. এম. আলী কলেজে অধ্যাপনা করেন প্রায় ৪ বছর। ১৯৭১ সালে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১১ নং সেক্টরে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি সাংবাদিকতাও করেন। ৩ বছর সাপ্তাহিক রোববারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ক্ষণজীবী পাক্ষিক ঘরে-বাইরের সম্পাদকও ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ জুট মিলস্ কর্পোরেশনের উপমহাব্যবস্থাপক ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। বাংলা একাডেমিতে কাজ করেন ১২ বছর অবধি–১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। একাডেমিতে অফিসার পদে যোগ দিয়ে চাকুরি ছেড়েছেন উপপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। ১৯৯৭ থেকে প্রায় ৬ বছর অবধি বিরিশিরির উপজাতীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারি চাকুরি শেষে আবার খ-কালীন শিক্ষকতা করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে বেশ কিছুকাল খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর আবার সরকারি কাজে বহাল হন। তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। রফিক আজাদ অনেকগুলো গুরুত্ববহ পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮১ সালে। আরো উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে আছে হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, আলাওল পুরস্কার, কবি আহসান হাবীব পুরস্কার, হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার, পদাবলী পুরস্কার ও জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার প্রভৃতি|