বাংলাদেশও #metoo বলতে শিখুক

শাশ্বতী বিপ্লব

৩৫ বছরের সোমা। দুই সন্তানের মা। ফেসবুকে #metoo আন্দোলনের কথা চোখে পড়লো তার। মনে পড়ে গেলো প্রাক্তন প্রেমিকের কথা। অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি তুলে দিনের পর দিন তাকে ব্ল্যাকমেইল করার কথা। আরেক বন্ধুর সহযোগিতায় সে বেড়িয়ে আসতে পেরেছিলো সেই দূর্দশা থেকে শেষ পর্যন্ত। সোমার ইচ্ছা করে সেই কথাগুলো প্রকাশ করতে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারে না। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে সে এটা কিছুতেই মানতে পারবে না। আত্মীয় পরিজনেরা হামলে পড়বে। আছে সন্তানদের বন্ধুবান্ধবদের অভিভাবকরাও, যারা তার ফ্রেন্ডলিষ্টে আছে। তাই একবার লিখেও আবার মুছে দেয় সোমা।

১৪ বছরের প্রিয়াংকা প্রাইভেট পড়তে গিয়ে প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ার শিকার হয়। সম্নানিত শিক্ষক নানা ছুতোয় তার বুক ছুয়ে দেয়। সেদিন টেবিলের নীচ দিয়ে শিক্ষকের পা বারবার চেষ্টা করেছে তার উরুর ফাঁকে ঢুকে যেতে। প্রিয়াংকা অস্বস্তিতে জড়সড় হয়ে থাকে, কিন্তু কি করবে বুঝতে পারে না। বন্ধুদের বলবে? বাবা-মাকে? কেউ যদি বিশ্বাস না করে? অথবা ওকে যদি খারাপ ভাবে? আর স্যার যদি অস্বীকার করে তবে প্রিয়াংকা প্রমান করবে কিভাবে?

২৪ বছরের দিনা সদ্য বিবাহিতা। এখনও বছরখানেকও হয়নি বিয়ের। দিনা তার বিবাহিত জীবন নিয়ে সুখী নয়। তার বর এমনিতে ভদ্রলোক হলেও বিছানায় কেমন দানব হয়ে ওঠে। দিনার ভালো লাগা, খারাপ লাগাকে গ্রাহ্য করে না ওর বর। কোনদিন দিনার ইচ্ছা না থাকলেও জোর করে মিলিত হয়। দিনার নিজেকে ধর্ষিত, অপমানিত মনে হতে থাকে প্রতিনিয়ত। সে এই সংসারটা করতে চায় না। কিন্তু ভাইয়ের সংসারেও সে ফিরতে চায় না। মুখ বুজে সয়ে যায় প্রতিদিনের এই নিপীড়ন। প্রকাশ করার কোন জায়গায়ই নেই সোমার।

#metoo দেখে ৪০ বছরের রেহানার মনে পড়ে কৈশোরে তার আপন মামা দ্বারা যৌন নিপীড়নের কথা। খালি বাসায় রেহানাকে গভীর ঘুমে পেয়ে তার মামা কিভাবে হাতড়ে বেড়িয়েছিলো ওর সারা শরীর। রেহানার ঘুম ভেঙ্গে যেতেই মামা নির্বিকার মুখে বলেছিলো, অবেলায় ঘুমাচ্ছিস কেন? রেহানার কাউকে জানানো হয়নি সেকথা। মায়ের খুব আদরের ভাই এই মামা। আজ মামা বৃদ্ধ হয়েছেন। রেহানারও সংসার আছে। মামী আর মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গেও সম্পর্ক খুব ভালো। সবদিক বিবেচনা করে সে না লেখার সিদ্ধান্ত নেয়।

মিলা একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করে। একদিন হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ায় লিফটে আটকে পড়েছিলো এক সহকর্মীর সঙ্গে। কয়েক মুহুর্তই মাত্র। জেনারেটরে লিফট আবার চালু হওয়ার ফাঁকেই সহকর্মী জাপটে ধরেছিলো ওকে। ব্যাস ওইটুকুই। মিলা কিছু বলার আগেই সহকর্মী হেসে নেমে গিয়েছিলো। কথাটা কাউকে বলা হয়না মিলার। এমনিতেই চাকরী করা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির অনেক আপত্তি। তারউপর এসব জানাজানি হলে চাকরীটা আর করাই হবে না হয়তো।

১২ বছের গৃহকর্মী রহিমার উপর রোজ রাতে চড়াও হয় গৃহকর্তা। যাকে রহিমা খালু বলে ডাকে। গভীর রাতে ওর জামাকাপড় খুলে শরীর হাতায় আর ধর্ষণের চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে এটা ওটার লোভ দেখায় আর ভয় দেখায় যেন গৃহকর্ত্রীকে না বলে। #metoo এর কথা রহিমা জানে না। জানবেও না কোনদিন।

শুধু ঘরে বা কর্মক্ষেত্রে নয়, গণপরিবহনে, পাবলিক প্লেসে, মার্কেটে প্রতিনিয়ত নানারকম যৌন হয়রানি আর যৌন নিপীড়নের শিকার হয় মেয়েরা। যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন বাংলাদেশের মেয়েদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুঁজলে এমন একটিও নারী পাওয়া যাবে না যে জীবনে একবারও যৌন হয়রানীর শিকার হয়নি। তবুও বাংলাদেশ এখনও #metoo আন্দোলন শুরু করতে পারেনি।

বাংলাদেশের মেয়েদের অনেক ভয়, অনেক শংকা, অনেক সীমাবদ্ধতা। কারণ তার এসব অভিজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নিজের এবং পরিবারের সম্মানের প্রশ্ন। আছে তার একা চলতে পারার সামান্য স্বাধীনতাটুকু হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সঙ্গে বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো আছে নিজের অপমানের কথা, নিগৃহিত হওয়ার কথা গোপন করার শিক্ষা। এইদেশে পুরুষরা যেমন ইচ্ছা তেমন যৌন জীবন কাটানোর, নারীকে যৌন হয়রানী ও নিপীড়ন করার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে। তার বিপরীতে নারীর জীবন জুড়ে কেবলই চেপে যাওয়ার, সয়ে যাওয়ার চর্চা জারি থাকে।

বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত নারীরা যখন #metoo  লিখে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে, বাংলাদেশের নারীরা তখন  প্রকাশ তো দুরের কথা উল্টো সাত কাপড়ে নিজেদের ঢেকে বদলে দিচ্ছে বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্র। অনেক শিক্ষিত, সচেতন পরিবারও যৌন নিপীড়নের কথা চেপে যাওয়াটাকেই নিরাপদ মনে করে। এমনকি নারীবাদিদের প্রতিবাদের ভাষাও নিজের নিপীড়নের কথা প্রকাশ করার সময় মুখ থুবড়ে পড়ে।

এই যখন বাংলার বাস্তবতা, তখন #metoo এর মতো জোয়ার এইদেশে আশা করাটা হয়তো বাড়াবাড়িই হবে। তবুও আমি আশার আলো দেখতে পাই যখন দেখি কোন স্কুল পড়ুয়া কিশোরী বাসে তাকে উত্যক্ত করা নিপীড়কের চুল খামচে ধরে চড় লাগাচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে ইনবক্সে যৌন হয়রানির কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা করছে না বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবে জেনেও ক্ষমতাবান ধর্ষকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে।

বাংলাদেশে একটি নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যারা যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, ধর্ষণ এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই প্রজন্ম ভাবতে পারছে নিপীড়িত মেয়েটি নয়, অপরাধী নিপীড়ক পুরুষটি। সম্মান যদি কারো নষ্ট হয় তবে সেটা নিপীড়কের, অবশ্যই যৌন নিপীড়নের শিকার মেয়েটির নয়। এভাবে ধীরে ধীরে এই প্রজন্ম শুধু রাস্তার নয়, ঘরের ভিতরে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করার, প্রকাশ করার সাহস দেখিয়ে ফেলবে।

হয়তো একটু সময় লাগবে। প্রাথমিক বাঁধা আসবে অনেক। তেড়েফুঁড়ে আসবে তথাকথিত সমাজপতি, মৌলবাদী আর পুরুষতান্ত্রিক সব ভদ্দরলোকেরা। অনেক নারীরাও হয়তো দুয়ো দেবে এসব মেয়েদের। কিন্তু মি বিশ্বাস করি আলো আসবেই। এই প্রজন্ম বদলে দেবেই এই সমাজ তথা রাষ্ট্রের ঘুনে ধরা মানসিকতা। আমাদের শুধু আলো আসার পথটুকু খোলা রাখতে হবে কষ্ট করে। ওদের পাশে থাকতে হবে, নিজেদের ভালোর জন্য, নিজেদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। লাগে লাগুক একটু সময়, তবুও বাংলাদেশও #metoo বলতে শিখুক।

অলংকরণ: প্রাণের বাংলা