বাংলাদেশের প্রথম নারী শহীদ কবি মেহেরুননেসা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

ভয় করি নাকো কোন/ বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে- চির বিজয়ের পতাকাকে দেবো, সপ্ত আকাশে মেলে/ আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবীর মৃত্যু তুমি/চির বিজয়ের অটল শপথ/  জয় এ বাংলায় তুমি….”

এই কবিতাটি জানান দেয় বিপ্লবের কথা। পাকি শাসক গোষ্ঠীর প্রতি ছুড়ে দেয়া এই চ্যালেঞ্জে ক্ষমতার ভীত কেঁপে উঠে।

অবিশ্বাস্য পৈশাচিকতার শিকারে পরিণত হবার সময় মানুষটি’র বয়স ছিল মাত্র ২৯, জীবনের সূচনাতেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল মা ও ভাই’দের নিয়ে। জীবন সংগ্রামে তিনি জয়ীই ছিলেন, সে যুদ্ধে তিনি অপরাজেয়। বাবা’র মৃত্যু’র পর পুরো সংসারের দায়িত্ব তাঁর ওপরেই এসেছিলো।

১৪ বছর বয়সে, প্রজাপতির মতো জীবন হবার কথা যার। তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় কঠিন জীবন যুদ্ধে। বাংলা একাডেমী, ইউসিস লাইব্রেরী’তে কপি রাইটার হিসেবে কঠোর শ্রম দিয়েছেন। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি এক অনন্য দেশপ্রেমিক, স্বজাত্যবোধে অনুপ্রাণিত এক মহান মানুষ। তাঁর নাম মেহেরুননেসা। বাংলাদেশের প্রথম নারী শহীদ কবি মেহেরুননেসা।

১৯৪২ সালের ২৭শে মার্চ জন্মেছিলেন কোলকাতার খিদিরপুরে। শৈশব কেটেছে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে। ছোটবেলা থেকেই যেন পৃথিবীর প্রতি আগ্রহ প্রবল ছিলো তাঁর। তাই বাবার সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটি কয়লার দোকানে বসতেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দাঙ্গায় উদ্বাস্তু হয়ে মেহেরুনদের পরিবার ১৯৫০ সালে ঢাকা চলে আসেন। পুরান ঢাকার নানান এলাকায় বাস করে ১৯৬৫ সালে তাঁদের পরিবার থিতু হয়ছিলেন মিরপুরে। সেসময় মিরপুর বিহারী অধ্যুষিত এলাকা, বাঙালী পরিবার বিহারীদের তুলনায় নগণ্য।

আমাদের অনেকেরই জানা নেই, ‘আমাদের দাবী মানতে হবে’ এবং ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দুটি কবি মেহেরুননেসার সৃষ্টি। ১৯৫৪ সালে তাঁর রচিত কবিতা ‘রাজবন্দী’তে এ লাইন দুটি এসেছে।

বাবা’কে হারিয়েছিলেন ক্যান্সারে। এরপর, জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে তিনি ফিলিপস ওয়ার্কশপে রেডিও মেরামতের কাজও করেছেন।এখানে অবশ্য উল্লেখ্য যে, সে সময় ফিলিপস ইংরেজি ও উর্দু’তে মুখপত্র ছাপাতো, কবি মেহেরুননেসা’র চেষ্টায় বাংলা ভাষায় রচিত পত্রিকাও প্রকাশে বাধ্য হয়েছিল ফিলিপস কর্তৃপক্ষ।

কবিতার প্রতি ভালোবাসা, বাংলা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম আকর্ষণ তাঁকে সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে থাকতে দেয়নি। তাঁর সৃষ্টি ছাপা হয়েছে, ইত্তেফাক, বেগম, দৈনিক পাকিস্তান, যুগের দাবী সহ অনেক কাগজ ও সংকলনে। ‘রানু আপা’ ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন ৬৯’এর আইয়ুব বিরোধী উত্তাল গণআন্দোলনে।

২৩ মার্চ ১৯৭১, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে লেখক সংগ্রাম শিবির আয়োজিত বিপ্লবী কবিতাপাঠের আসরে হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন কবিরসহ অন্যান্য কবিদের সঙ্গে স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন মেহেরুননেসা।এ আসরে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. আহমদ শরীফ।

একইদিন কবি মেহেরুন্‌নেসা ও তাঁর দুই ভাই মিরপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য রফিক ও টুটুল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মিরপুরে নিজ বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে তিনি ও তাঁর পরিবার অনেক আগে থেকেই চিহ্নিত হয়ে ছিলেন মুক্তিকামী বাঙালী হিসেবে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালায় বিহারিরা। কবি মেহেরুননেসা থাকতেন অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকা ঢাকার মিরপুরে। পাকিস্তানি শোষকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মিরপুরে বাঙালিদের ডাকা হরতালে বাঁধা দেন অবাঙালিরা।

তখন বাঙালিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক প্রতিনিধি যোগ দেন। কবি মেহেরুননেসা ছিলেন এ কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য। শহীদ মেহেরুননেসা সম্পর্কে কবি কাজী রোজী বলেন, কবি মেহেরুননেসার জ্বালাময়ী কবিতা স্বাধীনতার পক্ষের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে। তেমনি একাত্তরের ২৩ মার্চ মিরপুরে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন হয়। কবি মেহেরুননেসা তার বাড়িতেও স্বাধীন পতাকা উড়িয়েছিলেন। এ পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অবাঙালিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিবাদে জড়িয়ে পড়েন বাঙালিরা। মেহেরুননেসা ও তার পরিবার অবাঙালিদের টার্গেটে পরিণত হয়।

১৯৭১-এর ২৭ মার্চ বেলা ১১টার দিকে কয়েকজন অবাঙালি ঢাকার মিরপুরে তার ডি-ব্লকের ৬ নম্বর বাড়িতে ঢোকে। ওদের মাথায় সাদা ও লাল পট্টি বাঁধা, হাতে রামদা, তলোয়ার এবং চাকু-ছুরি। ওরা যখন মেহেরুননেসার দুই ভাইকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, কবি বলেছিলেন, ‘ওরা তো কিছু করেনি, যা করেছি আমি, তোমরা আমাকে মারো।’ হত্যাকারীরা কবির কোনো কথা শোনেনি। ওর দুই ভাইকে গলা কেটে হত্যা করে। এ দৃশ্য দেখে কবির মা বুকে কোরআন চেপে ওদের বলেছিলেন, আমরা তো কলেমা জানি, আমরা তো মুসলমান।’ কবির দুই ভাইয়ের পড়ে থাকা লাশের দিকে তাকিয়ে তার মা অজ্ঞান হয়ে যান। অবাঙালিরা মেহেরুননেসা ও তার মায়ের শিরচ্ছেদ করে।শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার মাথা কেঁটে কাপড় শোকানোর দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

আজ তাঁর শহীদ দিবসে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]