বাংলাদেশের রবীন্দ্রনাথ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

আমাদের শেক্সপিয়ার, টলস্টয়, গোর্কী, মার্ক টোয়েইন নেই। কিন্তু আমাদের আছেন রবি ঠাকুর। বাঙালি মুসলমানের জীবন যাপনের চিত্র রবীন্দ্র সাহিত্যে খুব বড় করে আসেনি। তাতে ক্ষতি নেই। রবীন্দ্রনাথ কখনো সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বরং রবীন্দ্রনাথ হিন্দু মুসলমানকে একই আসনে দেখতে চেয়েছিলেন।

স্ত্রীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

আমরা যখন ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে বিচার করবো, তখন তাকে তার সময়ের মাপকাঠিতেই বিচার করবো। তিনি ছিলেন তার সময়ের এক আধুনিক মানুষ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা যখন তার সাহিত্য কর্ম নিয়ে আলোচনা করবো, তখন নিঃসন্দেহে সেটি হয়ে যাবে কালোত্তীর্ণ।

কলকাতার আর সব জমিদারদের মতো রবীন্দ্রনাথও জমিদারী করতে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ব্রিটিশের কাছ থেকে তারা জমিদারী কিনতেন খুব সামান্য মূল্যে। যেমন, তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পাবনার শাহজাদপুরের জমিদারী কিনেছিলেন মাত্র ১৩ টাকা দশ আনায়!

জমিদারীর সঙ্গে ভূমিদাস হিসেবে প্রজাদেরও পেয়ে যেতেন প্রায় বিনামূল্যে। তার প্রজারা যেমন ছিলো হিন্দু, তেমনি মুসলমান। রবীন্দ্রনাথ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তাই বলে যে তিনি রাজনৈতিকভাবে অসচেতন ছিলেন, তাও নয়। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে এক বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও সেসবের কৈফিয়ত দিয়েছেন।

রাজনীতিকদের কাছে আমরা যেমনটা আশা করি, তেমনটা আশা করার সুযোগ নেই রবি ঠাকুরের কাছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর মানুষের সুখ-দুঃখকে মূর্ত করে তুলেছেন তিনি তার সৃষ্টিতে। তার এই সৃষ্টি কালের স্রোতে হারিয়ে যাবার নয়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা যতবেশী আলোচনা করবো, ততোই আমাদের মঙ্গল।

রবীন্দ্রনাথ তার কাব্য প্রতিভা শুরু করেছিলেন ধর্মীয় সঙ্গীত দিয়ে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যিকে আর ধর্মের বাঁধনে বাঁধতে চাননি। তবে তার সাহিত্যে মুসলমান স্থান-কাল-পাত্র এড়িয়ে যাবার কারন সম্ভবত ছিলো একটাই যে, কলকাতা কেন্দ্রিক তার পাঠকদের (মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের) অন্তত ৮০-৯০ শতাংশ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।

যে কোনো মহৎ সাহিত্যকে যেমন সাম্প্রদায়িক কিংবা জাতিগত দৃষ্টিতে বিচারের সুযোগ নেই, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তাই। যে মানবিক মূল্যবোধকে তিনি তার সাহিত্যে তুলে এনেছেন, তার রস আস্বাদন করতে ব্যর্থ হলে সেটা হবে আমাদেরই ক্ষতি। আমাদের তাই উচিত হবে এই মহৎ মানুষটির জীবন এবং কর্মকে সঠিক উপলব্ধিতে আনা।

বাংলাদেশ হলো বিপ্লবের দেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপ্লব। নেতা, কবি, সাহিত্যিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা আগে খুঁজি বিদ্রোহী কিংবা বিপ্লবী। বিপ্লবী না হলে তাকে আমাদের করে নিতে কষ্ট! বাংলাদেশের মানুষ হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সংগ্রাম করেছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তথা জমিদারীর বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের কৃষক বিদ্রোহ, ক্ষেতমজুর আন্দোলন সে কারনে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে আছে। জমিদারদের অত্যাচার এবং নির্যাতনের সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষরা পরিচিত ছিলেন। সে কারনে রবীন্দ্রনাথকে খুব সহজেই আমরা শ্রেণীগত বিভাজনে দূরে ঠেলে দিতে পারি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি আসলেই উপর তলার মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন?

মাত্র ২৮ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরের জমিদারীর দায়িত্ব নিয়ে আসেন। সে সময় জমিদারদের খাজনা প্রদানের জন্য বছরে একবার ‘পূন্যা উৎসব’ হতো। প্রথম সেই উৎসবে উপস্থিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন- মুসলমানরা বসে আছে মাটিতে, হিন্দুরা শতরঞ্জির উপর চাদর বিছিয়ে, এবং ব্রাহ্মণরা চৌকির উপর।

রবীন্দ্রনাথ নির্দেশ দিলেন সবাইকে একইভাবে বসতে এবং নিজেও বসলেন তাদের সঙ্গে সমতলে। তিনি বললেন- ‘এ রাজ দরবার নয়। মিলনানুষ্ঠান। প্রাচীন প্রথা বুঝি না। সবার এক আসন করতে হবে। জমিদার হিসেবে এই আমার প্রথম হুকুম। এই মিলন মেলায় পরস্পরে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে মধুর সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়া চলবে না। তোমরা সব আসন সরিয়ে একসঙ্গে বসো। আমিও তোমাদের সঙ্গে বসব। আমি তোমাদেরই লোক।’

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নাগরিক কবি। নিজেই তার আত্মজীবনীতে লিখেন- ‘আমরা শহরের ছেলে। জীবনে কখনো গ্রাম দেখি নাই। রাখাল বালকের কথা বইতে পড়িয়া আপন মনের মাধুরি মিশাইয়া মনে আঁকিয়াছি।’

কবির প্রায় ৪৭ বছরের জমিদারী জীবনের পুরোটাই বাংলাদেশে কাটিয়েছেন। এখানে বসেই তিনি সৃষ্টি করেছেন তার অমর কবিতা ও সাহিত্য। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে তিনি এতটাই বিমোহিত ছিলেন যে, পরবর্তি জীবনে কলকাতা চলে যাবার পর প্রায়ই আক্ষেপ করেছেন- শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের দিনগুলো নিয়ে। পতিসরে তিনি ছেলের নামে স্কুল করেছেন। সে জন্য ৬৬ একর জমিও দান করে গেছেন।

১৯০৭ সালে কবির বয়স তখন ৪৬। সে বছর পাবনা শহরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করতে গিয়ে কবি বলেন- ‘গ্রামের মধ্যে চেষ্টার কোনো লক্ষণ নাই। জলাশয় পূর্বে ছিল, আজ তাহা মজিয়া আসিতেছে। কেননা দেশে কোনো কাজ নাই। যে গোচারণের মাঠ ছিল, তাহা রক্ষণাবেক্ষনের কোনো উপায় নাই। যে দেবালয় ছিল, তাহা সংস্কারের কোনো শক্তি নাই। যে পণ্ডিতেরা সমাজের বন্ধন রক্ষা করিতেন, তাহাদের গণ্ডমূর্খ ছেলেরা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যবসা খুলিয়া বসিয়াছে। জঙ্গল বাডিয়া উঠিতেছে। ম্যালেরিয়া নিদারুণ হইতেছে। দূর্ভিক্ষ ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে। অন্ন নাই, শিক্ষা নাই, স্বাস্থ্য নাই, আনন্দ নাই, ভরসা নাই, পরস্পরের সহযোগিতা নাই। আঘাত আসিলে মাথা পাতিয়া লই, মৃত্যু আসিলে নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকি। অবিচার হইলে দেবের উপর তাহার ভার সমর্পণ করিয়া বসিয়া থাকি।’

নিজের জবানীতেই রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। দেশকে ভালবাসতে হয়, জানতে হয়, এবং দেশকে নিজের শক্তিতে জয় করতে হয়।’ কৃষক প্রীতি এবং কৃষির প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভালবাসা এমনই প্রগাঢ় ছিলো যে নিজের ছেলেকে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকায় আধুনিক কৃষি শিক্ষা লাভের জন্য। এর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কারের অর্থে পতিসরে কলের লাঙ্গল কিনে, এবং গ্রামীণ ব্যাংক করে।

আপন স্মৃতিচারণায় কবি লিখেন- ‘পল্লীর দূর্দশা লাঘবের জন্য আমার মন ছটফট করিয়া উঠিয়াছিল। জমিদারীর আয়ব্যয় নিয়ে যে আমার ব্যস্ততা, কেবল বণিকবৃত্তি করে দিন কাটাই, এটা নিজের কাছে নিতান্তই লজ্জার বিষয় বলে মনে হয়েছিল। তারপর থেকে চেষ্টা করতাম কী করে এদের মনের উদ্বোধন হয়! নিজের দায়িত্ব তাহারা নিজেরা নিতে পারে। তখন থেকে মনে হয়েছে পল্লীর কাজ করতে হবে।’

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]