বাংলাদেশে ফলো-আপ কথাটা মানা হয় কি

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে):  দরজায় নক হচ্ছে। এই সময় কেউ আসার কথা না। কানাডার লাইফে সারপ্রাইজ খুব কম। সব কিছুই মোটামুটি বোরিং রকম ঠিক-ঠাক…একই রকম চলে। দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।

বাসার পাশে পার্ক। শীতে কেমন থাকবে। গরমে কেমন থাকবে। ঘাস কখন কাটতে হবে। পার্কের বাতিগুলো কোন মাসে জ্বলা শুরু করবে। বাচ্চাদের Water Splash-এ কখন থেকে পানি আসবে। কখন বন্ধ হবে। ২০১০ সাল থেকে দেখছি। একই রকম…ঠিক ঠাক চলছে। লোক জন এসে চেক করে যাচ্ছে। বদলে দিচ্ছে। নষ্ট হলে ঠিক করে দিচ্ছে।

আমি আঠারো তালায় থাকি। দুম-দাম কেউ এসে নক করবে সেরকম সম্ভাবনা প্রায় নাই। তাই একটু অবাক হলাম।

দরজা খুলে দেখি বিল্ডিং ম্যানেজার। সংগে এক হাসিখুশি সাদা ভদ্রলোক। হ্যান্ডিম্যান। মানে মিস্ত্রি। শরীরের বিভিন্ন পকেটে..কোমরের বেল্টে যন্ত্রপাতি ঝুলছে তাই দেখে বুঝলাম।

ম্যানেজার কথা বললো,

‘…মাফ করবে। মেইল দিয়েছিলাম….উত্তর পাই নি। তোমার এপার্টমেন্টের সদর দরজা ঠিক করতে হবে।’

এবার পুরাপুরি অবাক হলাম। এপার্টমেন্টটা আমার নিজেরই। আমার দরজা ঠিক আছে। আমি কোন অভিযোগ করিনি। ভুলে এসেছে বুঝতে পারলাম। একটু বিরক্ত হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ম্যানেজার সেটা বুঝে ফেললো। তাড়াতাড়ি বললো,

‘সমস্যা পেয়েছে ফায়ার ডিপার্টমেন্ট তাদের রেগুলার তদারকির সময়। সেটা আমাদের জানিয়ে গেছে। তারা বিগ বস। তাদের কথার উপর কোন কথা চলে না। আমাদের এগুলো ঠিক করাতেই হবে।’

আমি সহজ হলাম। এবার কৌতুহল হলো। সমস্যা কি? এক পাল্লার এই মজবুত দরজা ভাঙ্গে নাই্…ঠিক মতো লক হয়…কালার ঠিক আছে..হ্যান্ডেল ঠিক আছে…আর কি? কি সমস্যা ফায়ার ডিপার্টমেন্ট খুঁজে পেল? জিজ্ঞেস করলাম।

এবার হ্যান্ডিম্যান উত্তর দিলো,

‘এই দেখো…তোমার দরজা খুলে তুমি বেরুলে…তারপর দরজা ভেজিয়ে না দিয়ে চলে গেলে। নিয়ম হচ্ছে দরজা একা একা জায়গা মতো ফিরে আসতে হবে। শুধু জায়গা মতো না একদম খাপে খাপে ঢুকে পুরাপুরি বন্ধ হয়ে যেতে হবে। একটুও ফাঁক থাকতে পারবে না। তোমারটা তা হচ্ছে না। দরজা ফিরে আসছে কিন্তু খাপে খাপে বসে যাচ্ছে না। আটকে থাকছে। ফাঁক হয়ে থাকছে। চাপ দিয়ে বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে সমস্যা হলো…ধরো তোমার এপার্টমেন্টে আগুন লাগলো…তুমি দৌড়ে বেরিয়ে গেলে পেছনের দরজা ভেজানোর সময় নেই। কিন্তু দরজা একা একা বন্ধ হলো না। এতে আগুন তাড়াতাড়ি লবিতে বেরিয়ে পড়বে। দরজা বন্ধ থাকলে একটু সময় লাগবে। সেই সময়টা ঐ বিপদের সময় অনেক মূল্যবান।“

হ্যান্ডিম্যান কাজ শুরু করলো। কব্জা…ঘষাঘষি…স্প্রে…হাতুরীর ঠুক ঠাক। বিরাট খাটুনি। আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার লড়াই দেখলাম।

একটু পরে হাসিমুখে সে ঘোষনা করলো…‘ঠিক হয়ে গেছে! এই বার তোমার দরজা পরিক্ষায় পাশ!!! নিজে চেষ্টা করে দেখো।’

আমি দরজা বন্ধ না করে বাইরে গেলাম। দরজা একা একা ফিরে এসে জায়গা মতো বসে গেল।

ম্যানেজার আর মিস্ত্রি…..দুইজন বিজয়ীর বেশে বীর দর্পে চলে গেল। আমার বিরাট হাসি পেলো। ‘ব্যাটা…কাজ কাম নাই….’ এক সেকেন্ডের জন্য এমন একটা লাইন মাথায় আসতে আসতেই…আমি চমকে গেলাম।

আমার হঠাৎ এটা মনে এলো কেন? এই রকম একটা জরুরী কিন্তু খুব স্বাভাবিক বিষয়টিকে এতোটা অ-জরুরী আর অস্বাভাবিক মনে হলো কেন? এক সেকেন্ডের জন্যও হলো কেন?

বেশি ভাবতে হলো না। বিদেশে বেশি দিন আসিনি। মাত্র আট বছর। অনেকগুলো ‘অভিজ্ঞতা’ ছবির মতো চালু হয়ে গেল।

ছোটবেলায় বাসার সামনে একটা সরকারী টিউব ওয়েল ছিলো। মাঝে মাঝে নষ্ট হয়ে যেত। নষ্ট হলেই শেষ! এরপর কবে যে ঠিক হবে আল্লাহ্‌ই জানে। মাঝে মাঝে পাড়ার লোকজনই ঠিক করে ফেলতো।

রাস্তায় একবার টিউব লাইট লাগানো হলো। আমরা বিরাট খুশী। আমাদের এলাকা শহর হয়ে যাচ্ছে! কিছুদিন পর বাতিগুলো জ্বলা বন্ধ করলো। চেক করার লোক দেখা গেলো না। টিউব লাইটের কাভারগুলো নষ্ট হয়ে…জং ধরে…ঝুলে রইলো।

শহরে সাপ্লাইয়ের পানি কেউ খেতে পারে না। ফুটিয়ে খেতে হয়। কেন? পিউরিফিকেশন প্রসেস ঠিক নেই? লাইনগুলো ভেংগে গেছে? সুয়ারেজের সঙ্গে মিশে গেছে। কতো বছর…কতো বছর? কেউ কি ঠিক করছে? কেউ কি এটা নিয়ে ভাবছে? কেউ কি জানে কত টাকা লাগবে এটা ঠিক করতে? পুরা শহর না হোক…ছোট ছোট অঞ্চল কি ধাপে ধাপে ‘বিশুদ্ধ পানি অঞ্চল’ করা যায় না? খাবার পানিতো। এক গ্লাস খাবার পানি বিশুদ্ধ পাওয়া যাবে না পানির দেশে? এখনতো কেউ মনে হয় বিশ্বাসই করে না….সাপ্লাইয়ের পানি আসলে পানযোগ্য হওয়ার কথা।

বছর দুয়েক আগে দেশে সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়েছিলাম। জীবনের প্রথম। মানুষে মানুষে গম গম করছে। কে কোন দিকে যাচ্ছে বোঝা কঠিন। ধান্দাবাজ টাইপের কিছু লোকও দেখলাম। চোখে চোখ পড়তেই কেমন কথা বলার জন্য মরিয়া হয়ে যাচ্ছে। বড় ভাইয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে অফিসে ঢুকে গেলাম।
এই রুমও মানুষে ভরা! দাড়িয়ে…বসে….না..শুয়ে কোন মানুষ দেখি নাই। কে কি করছে বোঝা মুশকিল। এর মধ্যে দেখলাম অফিসের ‘বড় বস’ একটু উচু এজলাসের মতো জায়গায় বসে আছেন। চরম বিরক্ত তিনি। একে তাকে ধমকা-ধমকি করছেন। করারই কথা। এই মাছের বাজারে মেজাজ কার ঠিক থাকে। বড় ভাই সব ব্যবস্থা করছে। আমার কাজ সময় মতো শুধু স্বাক্ষর করা আর টিপসই দেয়া।

আমার সময় আসলো। স্বাক্ষর করলাম। বুড়া আংগুলে কালো কালি লাগিয়ে চেপে চেপে কেরানী টাইপ একটা লোক ছাপ নিলো। ছাপ শেষে পড়লাম বিপদে। হাতের কালি মুছি কোথায়? পকেটে হাত দিচ্ছি। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। সেই সময় সেই ভয়াবহ দৃশ্যটা চোখে পড়লো!!! আমি জীবনে এই দৃশ্য ভুলবোনা। এই দৃশ্যের ছবি আমি তুলতে পারি নি। ভড়কে গিয়েছিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে আছে।

বড় বসের এই অফিসের দেয়াল কোন এক কালে সাদা চুনকাম করা ছিলো। আমার মতো লোকজন এসেছে…. ….বুড়া আংগুলে কালি লাগিয়ে ছাপ দিয়েছে। তারপর কোন কিছু না পেয়ে…নিজের পকেটেও কোন কিছু না এনে….চারিদিকের সাদা দেয়াল হাজার হাজার কালো কালো ছোপে ভরিয়ে দিয়েছে! বিশ্বাস করেন….চার দেয়ালে…..মানুষ দাড়িয়ে উপরে হাত তুললে যে পর্যন্ত যায়…সে পর্যন্ত….শুধু কালির দাগ আর কালির দাগ। বোঝা যাচ্ছে কেউ কেউ কষ্ট করে পায়ের পাতা উচু করেও আংগুলের কালি দেয়ালে মুছেছেন। এখন নতুন কারো মুছতে গেলে আরেকজনের উপর মুছতে হবে। আর খালি জায়গা নাই।

তার মধ্যে পান খেতে খেতে বড় সাহেব অফিস করছেন কতো দিন থেকে কে জানে। কারো মনে হয়নি আংগুল মোছার মতো একটা কিছু রাখি। কতো টাকা লাগে?

কানাডায় এই কিছুদিন আগে আগুন লেগে একই পরিবারের সাত জন মরে গেছে। আগুন মাঝে মাঝেই লাগে। এক্সিডেন্টে মানুষ মারা যায়। পৃথিবীর এমন কোন দেশ কি আছে যেখানে দুর্ঘটনা হয় না? মানুষ মরে না? নেই।

মানুষ সব কিছু ঠিকঠাক চালাতে পারে না। ভুল হয়ে যায়। সামর্থ্যে কুলায় না। নতুন পরিস্থিতি আসে। নতুন নতুন বিপদ আসে।

কিন্তু জানা মৃত্যু হাতে নিয়ে….চুড়ান্ত বিশৃংখলা চোখের সামনে নিয়ে…এমন নিদারুন স্থবিরের মতো কেউ কি বসে থাকে? দিনের পর দিন? বছরের পর বছর?

বড় কিছু হলে একটু নাড়া-চাড়া হয়। যেমন এখন হচ্ছে। রাজউক আর ফায়ার ডিপার্টমেন্ট অ্যাকশনে আছে। সদরঘাটের লঞ্চ পরিদর্শক কিন্তু আরামে আছে। লঞ্চ ডুবলে তার খোঁজ হবে।

Follow up শব্দের উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই। বাংলা ভাষায় কি এই শব্দ ছিলো না? বাংলায় ফলো-আপ মানে কি?

ছবি: গুগল