বাংলার নেশা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

একটু উঁচু গলায় হাল্কা থ্রেট সহকারে বললাম, ‘মামা, ভাল মালগুলা দিয়েন!’ যদিও জানি আমার মত গোবেচারার হুমকিতে এই ‘মামা’র কিছুই যায় আসে না।দৈনিক পুলিশ, এলাকার মাস্তান সহ আরো অনেক লোকের হুমকি সহ্য করেই সে প্রতিদিন রাস্তার পাশে ভ্যানের উপর ফল বিক্রি করে। সে অবলীলায় আমার হুমকি একদলা থুতুর সংগে উড়িয়ে দিয়ে আপেলগুলো প্যাকেটে ভরছিল। এই অপমান গায়ে না মেখে শকুনের দৃষ্টি নিয়ে খেয়াল রাখার চেষ্টা করছিলাম পচা আপেল ধরিয়ে দেয় কিনা! এর মধ্যেই পাশে দাঁড়ানো বিদেশী বন্ধু জিজ্ঞেস করে বসল, আপেলের বাংলা ‘মাল’ কি না?এইবার পড়লাম বিপদে। কিভাবে বুঝাই যে ‘মাল’ শব্দের আসল মানে কি? বাংলায় ‘মাল’ দিয়ে অনেক কিছু বোঝায়। আমিও ঝানু মাল, তাই অল্প কথায় বোঝালাম ‘মাল’ শদটা সে চাইলে যে কোন কিছুর পরিবর্তে ব্যবহার করতে পারে। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকালো। ‘মানে? আমি একজন মানুষ, আমার বেলায় কিভাবে তুমি মাল শব্দটা ইউজ করবে?’ বললাম, ‘বিদেশী মাল’। হাতের মোবাইল ফোনটা দেখিয়ে বললো, এটা? ‘চাইনিজ মাল’। আর আমাদের গাড়ির ড্রাইভার? ‘ফালতু মাল’! এইবার বিদেশী বন্ধুর চোখে কিছুটা খুশির ঝিলিক দেখা গেল। সে মজা পেয়ে গেছে। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে ‘মাল’ দিয়ে আর কি কি বোঝায় তার একটা লিস্ট ওকে বুঝিয়ে বললাম। সে আমার প্রতিটা কথায় ‘ওয়াও’ বলে মাথা নাড়তে লাগল। সবশেষে বলল, তোমাদের ল্যাংগুয়েজটা দারুন। যদিও সে বাংলা ভাষায় কিছুই জানেনা বলতে গেলে, তারপরও কেন এই কথা বলল আমি জানিনা। তবে আমিও প্রচন্ডভাবে বাংলার ভক্ত। একেবারে মন থেকে বলছি কথাটা। এখনো বাংলায় গালি না দিলে মন ভরেনা আমার। আমি কেন, যারা বাংলাদেশে থেকেও অপ্রয়োজনে ইংলিশ বলে নিজেকে জাতে ওঠাবার চেষ্টা করেন, তারাও কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলায় ফিরে আসেন নিজেদের অজান্তেই। কিছুদিন আগের কথা। গুলশানের রাস্তায় রিকশায় করে যাচ্ছিলাম। সামনের রিকশা হঠাৎ করে বামের গলি দিয়ে ঢুকতে যেয়ে অল্পের জন্য একটা গাড়ির সঙ্গে লাগিয়ে দেয়নি। দোষ গাড়ির ড্রাইভারেরও ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যা হয়, গাড়ির মালিক গাড়ি থেকে নেমে এসেই রিকশাওলাকে তুমুল গালিগালাজ শুরু করে দিলেন।‘hey, you bloody fuc*er! Have you any fuc*en idea what the fu*k you’ve done with my car? Huh….have you any idea?? উচ্চস্বরে কথা বলা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দম ফুরিয়ে এলো, হাঁপাতে শুরু করলেন। কিছুক্ষন পরে বুঝলেন রিকশওয়ালা ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে আছে, কারন একটি কথাও সে বুঝতে পারেনি। তখন ঐ গাড়ির মালিক আবার নতুন উদ্যমে শুরু করলেন, ঐ ব্যাটা! তুই চিনস আমারে? হ্যা? চিনস? ‘চু*****র পোলা, আরেকটু হইলেই তো গাড়িটার হো* মারসিলি!’ এইবার কাজ হলো! কাজ হতেই হবে। বাংলার উপর কিছু আছে নাকি? এক বন্ধুর বিয়েতে গেছি। রাতের বেলা বন্ধুর হবু শালা এসে অফার করল কিছু খেতে চাই কিনা। জিজ্ঞেস করলাম, কি আছে খাওয়ার মত। ‘বাংলা বস্‌……একদম অরিজিনাল বাংলা!’ কথা বলার সময় তাঁর মুখ থেকে যেরকম গন্ধ পেলাম তাতে করে তখনকার মত ‘বাংলা’র উপর ভক্তি কিছুটা কমে গিয়েছিল। আমার আগ্রহ কম দেখে সেই শালা মাথা নেড়ে আফসোস করতে করতে চলে গেল, ‘বুঝলেন না বস্‌……বাংলার উপরে কোন জিনিষ নাই!’ তবে একটা ব্যাপার মানতেই হবে, বাংলা কিন্তু খুব কঠিন। বলা এবং হজম করা দুক্ষেত্রেই। মামুলি ‘আই লাভ ইউ’ কথাটা বলা যত সহজ এর বাংলা বলা ততটাই কঠিন। এতো সবে শুরু। যারা মোবাইলে বা ফেসবুকে ‘লং ডিসটেন্স’ প্রেম করতে অভ্যস্ত তাদেরকে আমি সব সময়ই বলি ‘প্রেমের ভাষাটা’ বাংলা হোক। তবে আমার পরামর্শে দুই এক জনের উপকার হলেও বেশিরভাগই পরবর্তীতে অভিযোগ করেছে তাদের বান্ধবীরা ব্রেক-আপের হুমকী দিয়েছে। কোন ছেলের মুখের ভাষা এত নোংরা হতে পারে এ ব্যাপারে নাকি তাদের কোন ধারনাই ছিলনা।কি আজব ব্যাপার! যে কথা ইংরেজীতে বলছে সেই একই কথা বাংলায় বলতে সমস্যা কি? আমি ছেলেগুলোকে বুদ্ধি দিলাম ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করার। ঠিকই কিছুদিন পর সব মিটমাট। ছেলেগুলো তখন এসে জানালো তাদের বান্ধবীরা নাকি অতি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে ‘বাংলা’ কথাটাই বেশী পছন্দ করে। জানি তো, আজকালকার মেয়েরা যতই ডোনাল্ড ডাকের মত ঠোঁট বাঁকা করে সেলফি তুলুক না কেন, ওদের মনের ভেতরে এখনো সেই বাংলার পাতিহাঁসই প্যাকপ্যাক করে। খালি বুক ফাটে তো, মুখ ফোটেনা-এই জন্য বোকা ছেলেগুলো বুঝতে পারেনা।অনেক আগে এক মেয়েকে প্রপোজ করেছিলাম। বড়লোকের মেয়ে, দেমাগে মাটিতে পা পড়েনা (পড়বেই কিভাবে? গাড়িতে চলাফেরা করতো যে)। আমাকে জিজ্ঞেস করল, পড়াশোনা কতদূর? বললাম, তোমার সমানই। ‘মানে?’ মানে, আমিও তোমার মত ‘ষ্টুপিড’ এবং ‘ওহ শিট’ ছাড়া আর কোন ইংরেজী জানিনা! তবে ইংরেজীর প্রতি কিন্তু আমার কোন বিদ্বেষ নেই। ছোটবেলা থেকেই আমি ইংলিশ মুভি দেখে অভ্যস্ত। অথচ অনেক বছর পরে শেষ পর্যন্ত শান্তি খুঁজে পেলাম সেই বাংলাতেই। যতই ক্যামেরা আর সাউন্ড কোয়ালিটি খারাপ হোক না কেন। অনেক সময় অডিও ক্লিয়ার না হলে কানে হেডফোন লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করতাম কি বলে! বাংলায় কথা বলা নিয়ে কথা! ২১শে ফেব্রুয়ারী চলে গেল। অনেকেই ফেসবুকে বা ইনবক্সে বিভিন্ন ছবি পাঠিয়েছেন কিভাবে বাংলা ভাষার অবমাননা হল, অনেকে হা-হুতাশ করেছেন হিন্দী বা ইংরেজীর দাপটে বাংলা হারিয়ে যাবে এই আশংকায়। আমি বলি যে না, এত হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে হাজার হাজার জিপিএ ৫ পাওয়ার পরও যখন শুনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ২ জন পাশ করে তখন নিশ্চিত হই বাংলার নেশা কাটানো এত সহজ না।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]