বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশ জুড়ে ঋতুপর্ণ

লুৎফুল কবির রনি

‘‘প্রথম কথা বলতে কে শিখিয়েছিল জানি না । কালোর ওপর লাল পাখির নকশা-করা একটা বেডকভার ছিল বাড়িতে । সেটা দেখে প্রথম পাখি চিনতে শিখি । তখন পাখি বলতে পারতাম না । বলতাম ‘কাপি’ ।

প্রথম গান শিখিয়েছিল মাসিমণি । ‘আলো আমার আলো ওগো’ । চান করানোর আগে তেল মাখাতে মাখাতে।

প্রথম ‘পথের পাঁচালী’ কিনে দিয়েছিল পিসিমণি । পিসিমণির তখনও বিয়ে হয়নি । বাবার সব থেকে ছোট বোন । শ্যামলা রং, মোটা একটা বিনুনি । অপু দুর্গার গল্প পড়ে মনে হয়েছিল, পিসিমণি আমার দিদি হলে বেশ হত !

প্রথম ফাউন্টেন পেনে লিখতে শিখিয়েছিল বাবা । শিখিয়েছিল কেমন করে মহাভারত পড়তে হয় । রাজশেখর বসুর মহাভারত । সন্ধেবেলা হোমওয়ার্ক সেরে আমরা তিনজনে বসতাম । বাবা পড়ত । আমি আর ঠাকুমা শুনতাম । বাবা শিখিয়েছিল কেমন করে জাদুঘর দেখতে হয় । শিখিয়েছিল উত্তর ভারতের মন্দিরের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের তফাৎ কী । শিখিয়েছিল U ছাড়া শুধু Q দিয়ে ইংরেজি বানান হয় না । শিখিয়েছিল ইংরেজি হরফের আসল নাম রোমান ।

মা গান গাইতে পারত না । তাই সঞ্চয়িতা পড়ে ঘুম পাড়াত আমাকে । সেই আমার রবীন্দ্রনাথে হাতেখড়ি । মা যে আজ ওতে ছবি-আঁকিয়ে, সে-কথা মনেই থাকত না । একদিন সন্ধেবেলা বিছানায় বসে হোমওয়ার্ক করছি , আর সামনে বসে আমারই একটা পুরোনো খাতার পিছনের পাতায় পেনসিল দিয়ে আঁকিবুকি কাটছে মা । ঝুঁকে পড়ে দেখি, মা স্কেচ করছে । বিছানার ওপাশের টেবিল ফ্যানটার স্কেচ । সেই দিনই শিখলাম তিন ডানাওয়ালা ফ্যানটা আসলে একটা তিন পাপড়ি মেলা ফুল ।

ঠাকুমা শিখিয়েছিল কাঁচালঙ্কার রং সবুজ আর শুকনো লঙ্কা নাকি লাল । শিখিয়েছিল প্রথম পাতে তেতো খাওয়ার পর জল খেলে মিষ্টি লাগে । শিখিয়েছিল গরমকালের কুঁজো আর শীতকালের কাঁথা । পঞ্চুপিসি শিখিয়েছিল বেস্পতিবারের আরেক নাম বিষ্যুদবার । আর সন্ধেবেলার পর সাপের নাম লতা । চিঙ্কু … আমার ভাই … প্রথম শেখালো বড়ো হয়ে যাওয়া । প্রথম মিথ্যে কথা কে শিখিয়েছিল মনে নেই । কে শিখিয়েছিল আসলে কী করে বাচ্চা হয় ভুলে গিয়েছি । এক এক ছেড়ে চলে গিয়েছে যে মানুষগুলো, তারা শিখিয়ে গিয়েছিল, শুধু আরও কষ্ট পাবো বলে এই বেঁচে থাকাটা কতো সুন্দর !

বাংলা ভাষা নিয়ে অহংকার করতে শিখিয়েছে রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, শিবরাম, মুজতবা আলী । সত্যজিৎ প্রথম শিখিয়েছে ক্যামেরা দিয়ে গল্প বলা যায় । চাইলে কবিতাও ।

মা চলে গিয়ে দুটো জিনিস শিখিয়ে দিয়ে গেল । মা-রা আসলে অমর আর মা ছাড়া বাবারা বড়ো অসহায়…

কথা হচ্ছে, এতো কিছু শিখেও এমন একটা আস্ত অপোগন্ড তৈরি হলাম কী করে ?”

– ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষ সবাই জানেন ছবি বানান বড়দের জন্য, সে ছবিতে সবাই গম্ভীর চিন্তা করে , চোখা-চোখা কথায় ঝগড়া করে , কথায় কথায় কান্নাকাটি করে , চীৎকার করে বা নীরবে কষ্ট পায় , বা কষ্ট দেয়…।

.. একটা ভাঙাচোরা কোণ পেলেও ভারি সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলতো লোকটা। ঘরের ভেতরে একটা দেওয়াল খোলা, অমনি টুকটুকে লাল করে দেওয়া চাই। চাই বাহারি তেকোনা টেবিল, শখের ফুলকারি আয়না। চাই মানে এক্ষুনি চাই, তর সইবে না একটুও। তার লেখনী সর্বদা ক্লাসিক্যাল, লাল ভেলভেটের বাক্সে রাখা আন্তরিক শব্দচয়ন। লোকটার ছবির সঙ্গে লেখার সঙ্গে জীবনের সঙ্গে যাপনের সঙ্গে পরতে-পরতে ছত্রে-ছত্রে সুন্দরের হাতছানি। আসলে লোকটা হয়তো শিল্পের সঙ্গে সৌন্দর্যচেতনার কোলাকুলি করাতে চেয়েছিলো আজীবন। রবীন্দ্রনাথ বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছিলো আশৈশব। যে কোনও গান, যে কোনও কবিতা অনায়াস ফুর্তিতে উঠে আসতো কন্ঠে। নিজের জীবন বাজি রেখে ভালবাসা খুঁজে বেরিয়েছেন কাঙাল লোকটা, হয়তোবা চিরপ্রেমিক হিসেবে রবি ঠাকুরকেই বেছে নিয়েছিলেন। ঘর থেকে বেরুলেই সেই ঈশ্বরের উজ্জ্বল দু’টো চোখ অষ্টপ্রহর পাহারা দিতো তাকে। …

বাংলা সিনেমার দর্শক যখন ছবিঘর থেকে মুখ ফিরিয়েছে, তখন নতুন করে তাঁদের হলে টেনে এনেছিলেন ঋতুপর্ণ।

‘চোখের বালি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উপন্যাস যাতে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে এবং এর অবলম্বনেই ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করেন সিনেমাটি। ‘চোখের বালি’র সবচেয়ে প্রবল যে চরিত্র ‘বিনোদিনী’, তাতে ঐশ্বর্য রাই এর অনবদ্য অভিনয় যেন বিনোদিনীকে বইয়ের পাতা থেকে একেবারে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়!

একজন বিধবার কাছে কামনা-বাসনা মানেই অনিবার্য পাপ, বিনোদিনীর চরিত্রে যে আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয় তাকে একপর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তার উপন্যাসে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে কাশী পর্যন্ত নিয়ে যান। এই শেষটুকু নিয়ে কবিগুরুর আমৃত্যু আক্ষেপ ছিলো। বিনোদিনীকে কাশী পাঠিয়ে যে ভুল তিনি করেছেন, পাঠককুলের নিন্দায় তার স্খলন হয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। চলচ্চিত্রে এসে পরিচালক কিন্তু কারো কাছে বশ্যতা স্বীকার করলেন না, বিনোদিনী একজন বিধবা বলেই যে তার সাধ-আহ্লাদ করা পাপের শামিল এটি ঋতুপর্ণ মেনে নেন নি। এজন্যই সিনেমার শেষটুকু উপন্যাস থেকে ভিন্নতা পেয়েছে। উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলচ্চিত্রে এসে পূর্ণতা লাভ করেছে।

‘উৎসব’, ‘দোসর’, ‘অসুখ’ বা ‘অন্দরমহল’ সত্যি আরও কত নাম।সব যে একটা মানুষের চোখ দিয়ে দেখা বিশ্বাসই হয় না…

‘রেইনকোট’ মুভিটা না দেখলে ওই অল্প বয়েসে কে আমায় শেখাত ভালোবাসা মানে বুঝতে না দিয়ে মনের মানুষকে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া..এমনকি শেষ মুদ্রাটিও..

তিনি যেমন ধরিয়ে দেন বাঙালি জীবনের ‘উৎসব’, তেমনই চিনিয়ে দেন বাঙালির ‘অসুখ’। গতানুগতিক ফর্মুলা বদলে ভিন্ন ধারার এমন একটি সিনেমা দেখে দর্শক যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। সমালোচকদের প্রশংসা তো কুড়ালোই, বাণিজ্যিক সাফল্যও পেল সিনেমাটি।

ছোট্ট একটি দৃশ্যের মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করতেন দ্বন্দ্ব। দর্শককে নিয়ে যেতে পারতেন ভাবনার সিঁড়িতে। ঋতুপর্ণ শুধু একজন প্রতিভাবান পরিচালকই ছিলেন না, তিনি চিত্রনাট্যকার, গীতিকার এবং অভিনেতা হিসেবেও ছিলেন সফল।

কিন্তু যখনই ঋতুর প্রসঙ্গ আসে, তখনই কানাকানি, ফিসফাস। ঋতুপর্ণ ঘোষ কি পুরুষ ছিল নাকি নারী? নাকি নারী-পুরুষ দুটোই ছিলেন? তবে কি বৃহন্নলা ছিলেন ঋতুপর্ণ। আবার অনেকের মন্তব্য, ঋতু ট্রান্সজেন্ডার, পুরুষ থেকে রূপান্তরিত নারী। যার যা খুশি বলে। মন্তব্য করে। ঋতুপর্ণকে নিয়ে এখনো রীতিমতো বিতর্ক হয়। খুব ক্লিশে বিতর্ক, বিতর্ক স্রেফ ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘লিঙ্গ’ নিয়ে!

আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ঋতু রূপান্তরকামী না, হিজড়ে না, নারী না, পুরুষ না- ঋতু কোনোটিই না। ঋতু মানুষ ছিলেন। শুধু মানুষ। মানবিক একজন মানুষ। প্রচলিত জীবনের বোধ ও যৌনতার সীমারেখা অতিক্রম করে যে মানুষ দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। দাঁড়াতে পেরেও ছিলেন যিনি, তিনিই ঋতুপর্ণ ঘোষ। ঋতুপর্ণ ঘোষ বলতেন, শিল্পীর কোনো জেন্ডার হয় না। এই বামন সমাজে ঋতুপর্ণ  অতিকায়। যার উচ্চতা আকাশছোঁয়া, ফলে ঋতুপর্ণকে আমাদের কাছে কদাকার লাগার, ভাবার যথেষ্ট কারণ ও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের বনসাই মগজের চিন্তায় উদার আকাশে সম্মানের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঋতুপর্ণ ঘোষের কিছুই যায় আসেনা।

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশের অনেকটাই জুড়ে আছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এভাবেই বেঁচে থাকবেন তিনি, যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র থাকবে। যতদিন পর্যন্ত বাঙালি থাকবে।

পথের নানান বাঁকে চেনা অচেনা প্রশ্নের মাঝে আমাদের রেখে চলে গেছেন তিনি। ওখানেই তাঁর বাহাদুরি। কিছু চাপিয়ে দিতে চাননি কোথাও, মেনে নয়, মনে নিতে বাধ্য করেছেন। বলেছিলেন কলকাতা তাকে কখনই বুঝে উঠতে পারবে না, আবার ভুলতেও পারবে না। কোথাও কোথাও নৈরাশ্য ঘিরেছিল তাঁকে। আজকের ঋতুপর্ণ পাগল কলকাতার মানুষ, বিশ্বের মানুষ, জানিয়ে দিচ্ছে তিরিশে মে-র কলকাতা কেমন করে সিনেমার ইতিহাসে অকাল বাদলের নিঃস্বতাকে ভরিয়ে তুললো। বিশ্বের বৈচিত্র্যের-মাঝে যিনি অদ্বিতীয়, নিখিলেরে নিশিদিন করে দূরে থেকে আজ তিনি আমাদের সবচেয়ে প্রিয়।

লড়াই করে আমাদের পরাণ জেতার খেলায় তিনি জয়ী। টলিউড থেকে বলিউড যে কোনও অভিনেতার কাছ থেকে নিজের দাবিগুলোকে টেনে বার করে আনার ক্ষমতা তাঁর ছিলো। তাঁর নিজের ভিতরের মানুষ যেদিন নিজের শরীরের ভাষা বদলাতে চাইলো, মন চাইলো নিজের শরীর বদল করে কাজল চোখে, কেতাবি জোব্বায় আর পাগড়িতে রঙিন করতে সেদিন ঝড় উঠেছিলো। তিনি তাঁর পরোয়া করেননি। তিনি ঝড়কে সাথি করেছিলেন।

সিনেমা ছাড়াও ঋতুপর্ণ ঘোষকে ভালবাসার অন্য কারণ আছে। জীবন একটা উৎসব। ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই উৎসবকে উদযাপন করেছেন। মানুষের মত।

ঋতু ছয়,
ঋতুপর্ণ এক ও অদ্বিতীয়।

গেলো ৩০ মে ছিলো ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রয়াণ দিবস।বলি  প্রয়াণ শব্দটা বড্ড বেমানান তোমার জন্য,ঋতুর কেবল জন্মানো আছে।ভালবাসি তোমায় তোমার কবিতার মতই

পৃথিবী প্রবাস হতে চায়, অবহেলায় ।
সব মন ঠিকানা হারায়, ধুলোখেলায় ।
চেপে রাখা দমগুলো সব,
একে একে ফুসফুস থেকে ছাড়া পায়, প্রাণ খোলা ।
ও বিষাদ বার বার হাতে হাত রাখো,
ভয় নেই হারাবার যদি পাশে থাকো,
আমি যদি ভিড় হয়ে যাই, আমি যদি ভিড় হয়ে যাই ।

আমি যেন ভিড় হয়ে যাই ।

– ঋতুপর্ণ ঘোষ

ছবি: গুগল