বাংলা সাহিত্যে মহামারি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘কেরেন্টিন-কেরেন্টিন।’

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত জাহাজ থেকে রেঙ্গুন বন্দরে নেমেই প্রথমে এই কথাটা শুনতে পেয়েছিলো। কেরেন্টিন মানে কোয়ারেন্টাইন। এখন পৃথিবীজুড়ে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে এই শব্দটাও পরিচিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই কবে বাংলা সাহিত্যের এই কথাশিল্পীর উপন্যাসের কাহিনিতে উঠে এসেছিলো মহামারি, কোয়ারেন্টাইন। জনৈক ডাক্তার শ্রীকান্তকে জানান,‘ রেঙ্গুন সরকারের নতুন আইন অনুযায়ী নতুনদের কিছুদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয় যদিও সে আইন কুলিদের জন্যই-ভদ্রলোকের জন্য নয়। সেই ডাক্তার শ্রীকান্তকে আরও বলেন, ‘যে-কেহ জাহাজের ভাড়া দশ টাকার বেশি দেয় নাই সেই কুলি। কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যেতে এরা মানুষকে এত কষ্ট দেয় যে গরু-ছাগল-ভেড়াকেও এক কষ্ট সইতে হয় না।’ ১৯১৭ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে এই উপন্যাসটি চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। সে সময় ভারতে ভয়ঙ্কর প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিলো।

১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসটি। সেখানেও আছে প্লেগের কথা এভাবে, ‘পাড়ায় প্লেগ দেখা দিলো।’

বাংলা সাহিত্যের পথ বহুবিচিত্র।কী নেই সেখানে? যুদ্ধ, অভাব, কষ্ট, ভালোবাসা, লড়াই; মানুষকে জড়িয়ে কত কাহিনি। এসব কাহিনির মাঝে মহামারিও বাংলা সাহিত্যে ঠাঁই করে নিয়েছে সাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতার হাত ধরে। 

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে সাহিত্যে মহামারি নিয়ে রইলো ‘ বাংলা সাহিত্যে মহামারি’। 

চতুরঙ্গ উপন্যাসের জ্যাঠামশাই জগমোহন চরিত্রটির কথা সাহিত্যের পাঠকদেরর নিশ্চয়ই মনে আছে। উদার ও ঋজু চরিত্রের মানুষটি মারা যান মর্মান্তিকভাবে। সেই খবর আমাদের জানাচ্ছে উপন্যসের আরেকটি চরিত্র শ্রীবিলাস -‘পাড়ায় প্লেগ দেখা দিলো। পাছে হাসপাতালে ধরিয়া লইয়া যায় এজন্য লোকে ডাক্তার ডাকিতে চাহিল না। জগমোহন স্বয়ং প্লেগ-হাসপাতাল দেখিয়া আসিয়া বলিলেন, ‘ ব্যামো হইয়াছে বলিয়া তো মানুষ অপরাধ করে নাই।’

বাংলা সাহিত্যে ফিরে ফিরে এসেছে এ ধরণের মহামারীর প্রকোপের কথা। একটা সময়ে প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষায় প্রচুর মানুষ মারা যেতো অবিভক্ত ভারতে। সে সময়ের সাহিত্যে বিশেষ করে এ ধরণের অসুখের অনুষঙ্গ উঠে এসেছে কাহিনির হাত ধরে। বাংলা সাহিত্যের অনন্য লেখকরা একটি কথা কখনোই ভুলে যাননি যে সমাজের সামনে লেখার ভেতর দিয়ে একটি আয়না ধরে রাখা তাঁদের দায়িত্ব।

মহামারি’র সঙ্গে বাঙালির পরিচয় অবশ্যই নতুন কিছু নয়। তবে বাঙালির গেরস্থালিতে তার নাম ‘মহামারি’ ছিলো না। বাঙালির ইতিহাস তাকে চেনে  ‘মড়ক’ হিসেবে। মহামারি এ দেশের ইতিহাসে নতুন কিছুই নয়। আবহমানে বার বার এ দেশে আর পাঁচটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো মড়কও এসেছে। কিন্তু তার হিসেব আধুনিক কালের আগের সময় তেমন ভাবে লিখে রাখেনি।মড়ক তাই মড়কের মতো এসেছে, তার পরে প্রাকৃতিক নিয়মেই চলে গিয়েছে। অজন্মা, শস্যহানি, বর্গীর হেঙ্গামের মতো মড়কও একটা ‘হেঙ্গাম’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রদায়গত ভাবে মড়ক প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলায় ছিলো না, এমন নয়। শীতলা বা ওলাইচণ্ডী বা ওলাবিবির উপাসনা সেই সম্প্রদায়গত মড়ক-প্রতিরোধ কামনারই কথা বলে। বাংলা সাহিত্যের সেই কালে এই সব লৌকিক দেবীর কাল্টের উদ্ভবের সুবাদে তৈরি হয় দেবী-মহিমা কীর্তনকারী কাহিনি, পাঁচালি, ব্রতোপাখ্যান। তবে সেই সব সাহিত্যও আধুনিক নয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কালেই নাকি সাধক কবি রামপ্রসাদ তাঁর বিখ্যাত ‘অন্ন দে গো মা অন্নদা’ রচনা করেছিলেন। কিন্তু এই গানে বর্ণিত ‘অন্ন’ আক্ষরিক অর্থে ‘ভাত’ নয়, তার অন্য আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। তবু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাস্তবের অন্নাভাব থেকেই কবির কলমে রূপক হিসবে উঠে এসেছিল ‘অন্ন’।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে রাজলক্ষ্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বার্মা যাচ্ছে শ্রীকান্ত। কলকাতার জাহাজঘাটে পৌঁছে দেখে হাজার খানেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীকান্ত অবাক হয়ে একজন হিন্দুস্থানীকে প্রশ্ন করলে সে এভাবে তার উত্তর দেয়, ‘ডগদারি হো গা ’ এরপর শ্রীকান্তর সঙ্গে লোকটির সংলাপি ছিলো এরকম-‘ডগদারি পদার্থটি কি বাপু? লোকটি পিছনের একটি ঠেলা সামলাইয়া বিরক্ত মুখে কহিল, আরে পিলেগকা ডগদারি।’

এই পিলেগই যে প্লেগ তা বুঝে উঠতে পারেনি শ্রীকান্ত। পরে সে আরও খোঁজখবর করে জানে, ‘বর্মায় এখনো প্লেগ যায় নাই। তাই এই সতর্কতা। ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া পাশ করিলে তবেই সে জাহাজে উঠিতে পারিবে।’

প্লেগ রোগের পরীক্ষাটিও শ্রীকান্ত প্রত্যক্ষ করে।

‘সকলেই অবগত আছেন, প্লেগ রোগে দেহের স্থান বিশেষ স্ফীত হইয়া উঠে। ডাক্তারসাহেব যেরূপ অবলীলাক্রমে ও নির্বিকারচিত্তে সেই সকল সন্দেহমূলক স্থানে হস্ত প্রবেশ করাইয়া স্ফীতি অনুভব করিতে লাগিলেন তাহাতে কাঠের পুতুলেরও আপত্তি হইবার কথা।’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। সেখানে আমরা পাই কলেরা মহামারীর ভয়ানক বিবরণ।

‘সেবার শুয়রমারি বস্তিতে ভয়ানক কলেরা আরম্ভ হইল, কাছারিতে বসিয়া খবর পাইলাম। শুয়রমারি আমাদের এলাকার মধ্যে নয়, এখান থেকে আট-দশ ক্রোশ দূরে, কুশী ও কলবলিয়া নদীর ধারে। প্রতিদিন এত লোক মরিতে লাগিল যে, কুশী নদীর জলে সর্বদা মড়া ভাসিয়া যাইতেছে, দাহ করিবার ব্যবস্থা নাই।’

মৃতপ্রায় স্বামীকে দেখার কেউ নেই স্ত্রী ছাড়া। সেই কুটিরে গেছে উপন্যাসের চরিত্র সত্যচরণ। তার জবানীতে বিভূতিভূষণ লিখেছেন, ‘প্রায় সব ঘরেই দু-একটি রোগী, ঘরের মেঝেতে ময়লা বিছানায় শুইয়া। ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই, পথ্য নাই।’

মহামারির প্রথম ধাক্কা যদি বলতে হয়, সেটা ছিল ইংরেজি ১৮৯৮ সালের প্লেগ। এই প্লেগ মহামারির কালেই স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর সহ-সন্ন্যাসীরা সেবা করেছিলেন মানুষের। ভগিনী নিবেদিতা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। প্লেগ তখনকার বোম্বাই প্রদেশে প্রথম দেখা দিলেও তা অচিরেই কলকাতা পৌঁছায়। এবং মহামারির আকার নেয়। এই মহামারির বর্ণনা বিশদ লিপিবদ্ধ করেছিলেন প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’-এ। লেখক এই সময়ে বালক মাত্র। কিন্তু স্মৃতি থেকে তিনি যে বর্ণনা লিখেছিলেন, তা ভয়াবহ। ‘মহাস্থবির’-এর ভাষ্য অনুযায়ী কর্পোরেশন থেকে প্লেগের টিকা দিতে চাইলে সহজে লোকে তা নিতে চায়নি। গুজব ছড়ায়, এই টিকা নিলে অচিরেই মৃত্যু ঘটবে। এর ফলে যা ঘটার তা-ই ঘটে, অচিরেই রোগ ছড়ায়। শহরের মানুষদের মধ্যে ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীরাই প্রথম টিকা নিতে এগিয়ে আসেন।

বাংলা সাহিত্যের আর এক বন্দ্যোপাধ্যায় তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসের নায়ক শিবনাথকে দেখা যায় কলেরা মহামারির কালে সেবাব্রত গ্রহণ করতে। তারাশঙ্করের অন্যান্য রচনাতেও মহামারি, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া-ক্লিষ্ট পল্লিসমাজের কথা এসেছে।

ম্যালেরিয়া বা কলেরায় গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়ার কথাও সাহিত্যে এসেছে। এসেছে ভূতের গল্পের আশ্রয়েও। একে ঠিক সাহিত্য বলে মেনে না-নিলেও মানুষের মুখে মুখে বলা কাহিনি বলে গ্রহণ করা যায়। বহু দিন পরে জামাই শ্বশুরবাড়ি পৌঁছেছে বেশ রাত করে। শুনশান গ্রামে নিশুতি শ্বশুরবাড়িতে জামাইকে খেতে দিয়েছেন শ্বাশুড়ি। জামাই একটু লেবু চাইতে শ্বাশুড়ি ঘর থেকেই হাত বাড়িয়ে দূরের বাগানের লেবুগাছ থেকে লেবু পেড়ে আনলেন। জামাই ভয়ে অজ্ঞান। পর দিন জ্ঞান ফিরতে দেখতে পেল এক জনশূন্য গ্রামে সে পড়ে রয়েছে। কোনও রকমে পালিয়ে এক জনপদে পৌঁছে সে জানতে পারলো, তার শ্বশুরবাড়ির গ্রামটি কলেরা বা ম্যালেরিয়ায় উজাড় হয়ে গিয়েছে। আর সেখানে আজ ‘তেনাদের’ রাজত্ব। শিশুতোষ এই ভূতের গল্প বাংলা সাহিত্যে বহুবার শোনা পাঠকদের। এই ‘উজাড় হয়ে যাওয়া গাঁ’-কে বাঙালির গণস্মৃতি ধরে রেখেছে মহামারির ভয়াবহতা বলার জন্য।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ  ফিচার, আনন্দবাজার, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]