বাইশে শ্রাবণ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ রায়

হায়দরাবাদে এসেছিলাম। কাজে। হোটেল থেকে চেক আউট করছি। ওলা আসবে তাই লবিতেই বসে রয়েছি। নিউজপেপার স্ট্যান্ডে তিনটে কাগজ রাখা আছে। টাইমস্ অফ ইন্ডিয়া, ইকনমিক টাইমস্ আর হিন্দু। টাইমস্ অফ ইন্ডিয়া পড়তে ভাল লাগে না। খানিকটা আনন্দবাজারের মতো মনে হয়। ইকনমির কথা পড়তে ইচ্ছে করে না। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় অনার্স পেপারে পরীক্ষা দিয়ে ওই বিষয়ে বারো নাম্বার পাওয়া ছাড়াও কাল জেনে গিয়েছি অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি থেকে সাড়ে তিন লক্ষ লোক কাজ হারিয়েছে। দেশের অর্থনীতির হাল খুব খারাপ। অর্থনীতিতে পুরো নাম্বার পাওয়া মানুষেরা বলছে ভারতও নাকি ভয়ঙ্কর রিসেশনের খপ্পরে পড়তে চলেছে। আমি হাল্কা হবার জন্য উঠে গিয়ে হিন্দুটা টেনে নিয়ে আসলাম।
প্রথম পাতায় খবর ভারতের হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্তান। এক্সপেল্। শব্দটা ধাক্কা মারলো। মনে হলো যেন কেউ অপমান করলো। ছাত্রজীবনে খুব ভয় পেতাম শব্দটাকে। পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বন করলে অথরিটির লাস্ট রিজর্ট ছিলো এক্সপেল্ করা। কাউকে হ’তে দেখিনি কখনও, কিন্তু ভয় পেয়ে চিরকাল আমার মতো অসাধুরা একটু আধটু সাধু সাধু ভাব নিয়ে তিনঘন্টার পরীক্ষাহল কাটিয়ে জীবনে ট্রেসপাস্ করে গেছে।
পরের খবরে ইমরান খান নিজেই বলে দিলো, ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেই বিষাক্ত কিন্তু নিশানায় ঠেলে দেওয়া ইনসুইং ইয়র্কার এর মতো। এমনকি পাকিস্তানের মাটি হয়ে ভারত আফগান ট্রেড বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলা হলো। অর্থনীতিতে মাত্র বারো পেয়েছিলাম বলে আমি বলতেই পারবো না এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে কি প্রভাব পড়বে বা আদৌ কোনো প্রভাব পড়বে কিনা। আমি অর্থ বুঝতে পারলেও অর্থনীতি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনা।
পাতা ওল্টালাম। নাসিরুদ্দিন শাহ্ সাদাত হোসেন মান্টোর নাটক করতে হায়দরাবাদ আসছেন। লকড়ি কা পুল এর পাশে রবীন্দ্র ভারতীতে হবে। রবীন্দ্র ভারতী! হঠাৎ করে বুকের মধ্যেটায় একটা ঠান্ডা স্রোত এপাশ ওপাশ হয়ে গেলো। আজ বাইশে শ্রাবণ, না! আমার রবিঠাকুর মৃত্যুদিনেও এত দূর দেশে গান শোনাচ্ছেন। আমি সেই গান শুনতে শুনতে ভুলে যেতে থাকলাম আমার বারো নাম্বার পেয়ে ফেল করা, পৃথিবীর জটিল অর্থনীতির কাহিনী, ইমরান খানের একই জায়গায় পরপর বল রাখার অপার দক্ষতা, সব। শুধু মনে হল একবার রবীন্দ্রনাথকে দেখতে যাবো। দেখতে যাবো এই তেলেঙ্গানাতেও মৃত্যুদিনে জ্বলজ্বল করতে থাকা আমাদের ঠাকুরকে। নিশ্চয়ই এই রবীন্দ্র ভারতীতে অন্তত বুক অব্দি বসে থাকবেন গুরুদেব কোথাও। কোথাও নিশ্চয়ই কেউ একটা সুগন্ধী সাদা ফুল রেখে আজ বাইশে শ্রাবণে স্মরণ করবে তাঁকে।
বাইরে বেরিয়ে দেখি এখানকার আকাশেও বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরঝির করে। যার মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে আস্তে আস্তে ভিজে যেতে হয়। টেরও পাওয়া যায় না। নি:শব্দ কান্নার মত। বাইশে শ্রাবণ কান্নার দিন। এত বিশাল একজন মানুষের চলে যাওয়া মনে রাখতে আকাশ এত বছর ধরে কাঁদে। নিয়ম করে কাঁদে। তা সে দাক্ষিণাত্যের হোক বা পার্বত্য চট্টগ্রামের, আকাশ থেকে থেকে কেঁদে ওঠে। আমিও একরাশ কান্নায় ভিজবো বলে রাস্তায় নেমে যাই।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]