বাঙালি রোমান্সে আজও উত্তম অপরাজেয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল সত্যজিৎ রায় তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন ঠিক এভাবে—‘ওঁর মতো স্টার আর হবে না। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দিকপাল। ওঁর সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আশ্চর্য অভিনয়-দক্ষতা। ওঁর মতো কোনো নায়ক নেই, কেউ হবে না।’

রাজেশ খান্নার মন্তব্য হলো

-‘আমার তো মনে হয় যেভাবে গোটা বাঙালী জাতির মুখ দেখা যেত তাঁর মধ্যে, সেভাবে আর কেউ পারবে না নিজের জাতকে তুলে ধরতে। এমনকি তার মতো ওভাবে ধুতির কোঁচাও ধরতে পারবে না কেউ।’

উত্তম, সুচিত্রা

তাঁকে নিয়ে সৌমিত্র‍্য চট্টোপাধ্যায় বলতেন,
‘ও যদি বিশাল কোন ক্রাইম করে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে একটা হাসি দেয়, আমি ওকে ইনোসেন্ট ভাবতে বাধ্য হবো।’

আর যাকে নিয়ে উপরের কথাগুলো , তিনি আর কেউ নন, কিংবদন্তী মহানায়ক উত্তম কুমার।এ যাবত ইন্ডাস্ট্রিতে যতো নায়ক এসেছেন, অভিনেতা জন্মেছেন, সবাই জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে তাঁর মতো হতে চেয়েছেন, তাঁকে অনুসরণ করতে চেয়েছেন।

১৯২৬ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম হয়েছিল শতাব্দীর সেরা হবার জন্যে, তিনি এসেছিলেন ইতিহাস রচনা করতে, স্রষ্টা তাঁকে পাঠিয়েছিলেন অভিনয়ের জগতে অন্যরকম একটা যুগের সৃষ্টি করার জন্যে। তাঁর তো মঞ্চে থেমে থাকার কথা ছিলো না। দিনে চাকরী করতেন, আর রাতে থিয়েটার। সিনেমায় নামার ইচ্ছেটা মাথায় ভর করছিলো অনেকদিন ধরেই, স্বপ্নের পরিধিটা বাড়ছিলো কেবল। কিন্ত সিনেমায় অভিনয় করার মতো কিছুই তো নেই অরুণের। না কোন অভিজ্ঞতা, না বাবা-চাচাদের আশীর্বাদ, ছিলো না আহামরি কোন পারদর্শীতাও, সম্বল শুধু ঈশ্বরপ্রদত্ত সুন্দর চেহারাটুকু। সেকালে সিনেমায় অভিনয় করতে হলে গান জানাটা ছিলো আবশ্যিক কাজ। তিনি তাই কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীতশিক্ষক নিদান ব্যানার্জীর কাছে যাওয়া শুরু করলেন, গ্রহণ করলেন তাঁর শিষ্যত্ব।

পর পর তিনটি ছবি ফ্লপ। তবুও ছেলেটি স্টুডিওপাড়ায় একটা রোলের জন্য ঘুরে বেড়ায়। ছেলেটিকে দেখলে সবাই রং-তামাশা করে। ফ্লপ মাস্টার জেনারেল বলে হাসাহাসি করে। ছেলেটির চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে থাকে। মনে মনে আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করে সে। কিন্তু করলেই তো হবে না। সুযোগ পেতে হবে। কিন্তু কে দেবে সুযোগ?

স্ত্রী ও ছেলে গৌতমের সঙ্গে

কেউ না জানলেও একজন জানতেন, এই ছেলেটি পারবে। তিনি হলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। প্রায় দিন তিনি ছেলেটিকে লক্ষ করেন। কিন্তু কোনো কথা বলেন না। ঠিক এমন সময় নির্মল দে তাঁর নতুন ছবি ‘বসু পরিবার’ করার জন্য নায়ক হিসেবে ঠিক করলেন কালী ব্যানার্জিকে। কালী ব্যানার্জি তখন বিখ্যাত নায়ক। কিন্তু নির্মল দে কালী ব্যানার্জির ডেট পেলেন না। নিজের ঘরে বসে ভাবছেন, এখন তাহলে কী করা! এমন সময়ে ঘরে এলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। পাহাড়ী স্যান্যালকে সব খুলে বললেন। পাহাড়ী স্যান্যাল অল্প হেসে বললেন, ‘দূর, এত চিন্তা করছ কেন? হাতের কাছেই নায়ক রয়েছে।’
নির্মল দে লাফিয়ে উঠলেন,‘কে?’ তারপর নায়কের নাম শুনে ধপ করে বসে পড়লেন। বললেন, ‘পাহাড়ীদা আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন? ওকে নিলে হলে ঢিল পড়বে, কে সামলাবে বলুন?’

পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘নামটা পাল্টে দাও, কেউ জানতে পারবে না। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে নিয়ে ঠকবে না। এখন ও ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্র তৈরি করার অপেক্ষা।’

নির্মল দে কি মনে করে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘বাপু, বাপের দেওয়া নামের মায়া কি ছাড়তে পারবে? তাহলে একটা সুযোগ আছে।’
ছেলেটি আস্তে আস্তে মাথা নাড়াল। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘অন্য নাম আছে তোমার?’
ছেলেটি একটু থেমে বলল, ‘দাদু আমাকে উত্তম বলে ডাকতেন।’

লাফিয়ে উঠলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। বললেন, ‘নির্মল, দেরি করো না। উত্তম নামটা লাগিয়ে দাও। লেগে যাবে।’

তা-ই হলো। লেগে গেল। হিট হলো ‘বসু পরিবার’। বাঙালি পেয়ে গেল এক নতুন নায়ক—উত্তম কুমার।

সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে

ভুবনভোলানো হাসি, অকৃত্রিম রোমান্টিক চোখের দৃষ্টি আর অতুলনীয় অভিনয়ের গুণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও বাঙ্গালি দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি মহানায়ক।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাঙালি ‘রোম্যান্টিসিজম’-এর স্রষ্টা নিঃসন্দেহে এক এবং রবীন্দ্রনাথ। আজও প্রেম নিবেদনের জন্য নব্যশিক্ষিত যুবক-যুবতীর আশ্রয় রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতার উদ্ধৃতি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ আসনে অটল। কিন্তু বাঙালি নারীর রোম্যান্টিক পুরুষ ‘আইকন’-এর জায়গাটি দখল করে রয়েছেন এক এবং অদ্বিতীয় উত্তমকুমার। রবীন্দ্র-কবিতা বা গান, সংলাপ বলার পারদর্শিতায় ঝরে পড়া ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’-এ উত্তমকুমারের বিকল্প কোথায়? এটাও সত্য, বহু বাঙালি ললনা আজও প্রেমিকের মধ্যে উত্তমকুমারকেই খোঁজে।

উত্তমকুমার সুপ্রিয়াকে নিয়ে ময়রা স্ট্রিটে গিয়ে উঠতে যেমন ওঁর বঙ্গজোড়া অনুরাগিণীদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য ছাড়িয়েছিলো, তেমনি আরেকবার ওঁর এক সাক্ষাৎকারে।

সে-সময় ভারতীয় সিনেমায় চুম্বন দেখানো যাবে কি যাবে না, এই নিয়ে বিতর্ক চলছিলো।
উত্তমকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বলেছিলেন, ‘আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে চুমুর আগে অভিনত্রীর দাঁতের মেডিকাল সার্টিফিকেট চাইব।’

এ কথায় ওঁর নায়িকাদের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো জানি না, তবে মধ্যবিত্ত পাড়ার বাঙালি সুন্দরীদের মধ্যে কী আহ্লাদ।

‘বেশ করেছে, চেয়েছে! আমাদের উত্তম যাকে-তাকে চুমু খাবে নাকি?’ অধিকাংশ নারীর এই মন্তব্য ছিলো।

‘তা তুই কেন তোর দাঁতের সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দিচ্ছিস না উত্তমকে?’

তাতে কী সুন্দর ন্যাকা, আদুরে কণ্ঠ বান্ধবীদের অভিমান ভরা উত্তর, ‘সে দেবার জন্য তো কত মেয়েই আছে সারা দেশে!’

আজ মনে হয়, সত্তর দশকের সমস্ত বাঙালি মেয়ের মনের কথাটাই বলেছিলেন তিনি।
কে জানে, হয়তো আজকেরও!
হতাশারও এত মধুর সুর আগে বা পরে শুনিনি বিশেষ।

আমরা, পুরুষরা, শুধু আড়ে থেকে বলতে পারি, ‘গুরু! গুরু!’

উত্তমকুমার বাঙালির মনে উত্তম হয়েই রয়ে গিয়েছেন, কখনও মধ্যম হননি। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ৩৬টি বসন্ত পেরিয়েও এখনও অম্লান অশরীরী উত্তমের আবেদন। একজন অভিনেতার মোহ, এভাবে একটি জাতি, একটি জনগোষ্ঠীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে কি এক দুর্বোধ্য ম্যাজিকে। এ নজির বিশ্বেই মেলা ভার। আপামর বাঙালি নাগরিকের মনে উত্তম-স্বপ্ন বোধহয় এতদিনে প্রমাণ করে দিয়েছে, যে, উত্তম বোধহয় একটা সামাজিক ফেনোমেনন। ‘নায়ক’ ছবিটি করার পর, সত্যজিৎ রায় উত্তমকুমার সম্পর্কে বলেছিলেন, — ‘হি ইজ দি ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট হিরো অফ বেঙ্গলী ফিল্ম’ উত্তমকুমার বোধহয় বাঙলা ছবির সেই শেষ মহানক্ষত্র, যাঁর আবির্ভাবে নতুন স্বপ্নে অঙ্কুরোদগম হয়েছিলো।

সিলভার স্ক্রিনে প্রায় তিন দশকের উপর রাজত্ব করেছেন বাঙালির চিরকালের মহানায়ক উত্তমকুমার। মৃত্যুর পরেও এতটুকুও ম্লান হয়নি ব্র্যান্ড ‘উত্তম’।

সময়ের সঙ্গে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে ‘উত্তম-ম্যানিয়া’। কেমন ছিলো মহানায়কের ব্যক্তিগত জীবন? বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আলোকবৃত্তে থাকার জ্বালা বোধহয় তাঁর মতো আর কাউকে পোহাতে হয়নি। তাই নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলিকে তিনি করে তুলেছিলেন গোপনতর। বাড়ির ভিতরে যখন উদ্দাম পার্টি চলছে, তখন সদর দরজায় ঝুলতো তালা। বাইরের কোনও মানুষ দেখা করতে এলে, সোজা বলে দেওয়া হতো, ‘উনি বাড়ি নেই।’

বাঙালি জীবনের এমন কোনো চরিত্রচিত্রণ নেই, যেখানে আমরা উত্তম কুমারকে পাইনি। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির এই মানুষটি কখনো ধুতি, কখনো ট্রাউজার, কখনো স্যুট, কখনো পাঞ্জাবি আবার কখনো বা গ্রামবাংলার আটপৌরে রূপে যেন বহুরূপী। অরুণ কুমার চ্যাটার্জি থেকে জীবন-সংগ্রামে ক্রমাগত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উত্তম কুমার হন তিনি।

তিনি সর্বদা বলতেন, ‘‘আমার কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে যদি কখনও কোনো মৃত্যু সংবাদ আসে, আমি কিছুটা থমকে যাই। আবার আমি আমাকে বোঝাই, ‘মৃত্যুই তো একমাত্র সত্য’।” কাজই ছিলো তার কাছে মুখ্য বিষয়। সেটা তিনি তার নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ দিয়ে গেছেন। মহানায়ক হয়ে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই মৃত্যুবরণ করেন এই নক্ষত্র। ‘ওগো বধু সুন্দরী’ সিনেমাটির কাজ চলছিলো তখন। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই শুটিংরত অবস্থায় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লাখো বাঙালিকে কাঁদিয়ে শুটিং স্পটেই মারা যান তিনি।

লস এঞ্জেলস-এ ভাষণ দিতে গিয়েছিলেন। পরে সেই ভাষণের বাংলা তর্জমা প্রকাশিত হয়।
সেখানে দেখা যাচ্ছে, তাবড় সাহেব-সুবোদের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা সিনেমা নিয়ে প্রায় বোমা ফাটাচ্ছেন মহানায়ক।

বলছেন, ‘এক এক সময় মনে হয় কী জানেন— আমরা তো অনেক বড় আর্টিস্ট, নয় কেন? কেন নয়? আমরা যদি রবার্ট রেডফোর্ডকে বলি— আমরা যদি বার্টন সাহেবকে বলি— আমরা যদি পিটার ওটুলকে বলি— আমরা যদি টোপল সাহেবকে বলি যে আমাদের ওই জায়গায় টালিগঞ্জে গিয়ে এক ঘণ্টা শ্যুটিং করে আসুন না। পালিয়ে আসবেন। পরের দিনই টিকিট কেটে পালিয়ে আসেবেন।’

সে কালের স্টুডিয়োর অবস্থা যে কতটা কুৎসিত, তা নিয়ে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও কোনও লুকোছাপা নেই তাঁর।

দুটোর বেশি লেন্স নেই। ভাঙা ক্যামেরা। তা’ও বলতে গেলে ক্লাইভের আমলের। —‘সে এখনও চলছে ভাল রোমান্টিক সিনে— বেশ গদগদ নায়ক-নায়িকা। বেশ সুন্দর। পার্টটাও ভাল হচ্ছে। হঠাৎ কাট কাট।— কী ব্যাপার ফিল্ম জ্যামড্ হয়ে গেছে। আবার সেই নায়ক নায়িকা চোখ কুঁচকে মুখের ওপর বরফ লাগিয়ে ঠান্ডা জলটল লাগিয়ে আবার রেডি হচ্ছে— হয়তো ঠিক আগের মতো হল না।’

অপর্ণা সেনের সঙ্গে অভিনয়। এক গাল দাড়ি, গোঁফ। হঠাৎ লোডশেডিং। গোটা বাংলায় যখন তখন সে ছিলো এক নয়া উৎপাত। পরিচালক অজয় কর। —‘বললাম, অজয়বাবু আর হবে? উনি বললেন, একটু অপেক্ষা করো— দেখি। বসে আছি— কামড়। কীসের বলুন তো— মশার। প্রচণ্ড মশা।…এরই মধ্যে আমরা কাজ করছি।’
কথায় বিদ্রুপ ছিলো। ঠাট্টাও। কিন্তু যন্ত্রণাও কি ছিলো না?

আর বেপাড়ায় গিয়ে, তার ঠাটঠমকে কুঁকড়ে না গিয়ে নায়কের মতোই চ্যালেঞ্জ দেওয়া?— ‘এক বার খেলে যান না এ মাঠে, দেখি কেমন পারেন!’

উত্তম কুমারের শ্রদ্ধার্ঘ্যে কলকাতা মেট্রো টালিগঞ্জ অঞ্চলের স্টেশনটির নামকরণ করা হয় ‘মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন’।

কথায় বলে, মানুষ চলে গেলেও ইতিহাস বেঁচে থাকে। তিনি যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, সেটা অমলিন থাকবে যুগ যুগ ধরে। ইন্ডাস্ট্রিতে তার মতো হৃদয়কাড়া অভিনেতা না তার আগে ছিলো, না তিনি চলে যাবার পর এসেছে। মহানায়ক একজনই, তিনি অদ্বিতীয়।

প্রশংসায় লজ্জা পেতেন খুব, বিশেষ করে তাঁর সামনে কেউ তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করলে একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে যেতেন তিনি। বলতেন- ‘প্রশংসা করলে আমি কাঁচুমাচু হয়ে যাই। কারণ আমি ভাবি, এ প্রশংসা টিকে থাকবে তো? আর তাই প্রশংসাবাক্য শুনলে আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই। আমি ওটা চাই না, আমি শুধু কাজটাই বুঝি।’ কাজটাই সবচেয়ে ভালো বুঝতেন, সেটে দেরী করে আসার দুর্নাম ছিলো না খুব একটা, কোন পরিচালককে কথা দিয়ে শিডিউল ফাঁসিয়েছেন, এমন অভিযোগও ওঠেনি তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ প্রায় আড়াই যুগ ধরে তিনিই ছিলেন নিজের ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় সুপারস্টার। যে অভিনয় তাঁকে খ্যাতি দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে, সেই অভিনয় ব্যপারটাকে ভীষণ সম্মান করতেন তিনি।
একটানা অভিনয় করতে কোন আপত্তি ছিল না উত্তমের, তাঁর ভাষায়- ‘কাজকে আমি কখনও ভয় করি না। বরং আমি কাজ থেকে আনন্দ খুঁজে নিই।’ চলচ্চিত্রের এই জগতটা তাঁকে মধ্যবিত্ত ঘরের ছাপোষা এক চাকুরে থেকে উত্তম কুমার বানিয়েছে, তিনিও নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন অভিনয়কেই। বলতেন- ‘চলচ্চিত্র আমার নিজস্ব জগৎ, আমার ব্যক্তিগত বলে কিছু ছিল না। যেন আমার প্রতিটি মুহূর্ত বিক্রি হয়ে গেছে।’

উত্তম কুমার আসলে লিখে শেষ করার মতো কোন মানুষ নন। দুই বাংলা মিলিয়ে লাখো মানুষের কাছে নায়ক শব্দটার মানেই উত্তম কুমার, সিনেমার পর্দায় হিরো বলতে তারা এই হ্যান্ডসাম মানুষটাকেই বোঝেন।

মধ্যবিত্ত বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক রূপে উত্তম ধরা দিয়েছেন বাঙালি কল্পনায়। যিনি তারকা হবেন, যিনি আমজনতার ‘রোল মডেল’ হবেন, তাঁকে জনতার রুচি, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কল্পনাবোধ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। যুবক-যুবতী থেকে প্রৌঢ়, বিগতযৌবনা সব ধরনের দর্শকের কল্পলোকের সঙ্গে সেলুলয়েডের যোগ স্থাপন করতে গেলে যে রসায়ন চাই, তার সবটাই আয়ত্ত করেছিলেন উত্তম। পোশাক নির্বাচনেও ছিলেন পূর্ণমাত্রায় সচেতন। যত দিন স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শ আর বিপ্লবীয়ানা বাঙালির মনে বেঁচে ছিল, ততো দিন তাঁর ‘পেটেন্ট পোশাক’ ছিল ধুতি-পাঞ্জাবি। বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন যতই পশ্চিমমুখী হয়েছে, ততোই উত্তমের শরীরে উঠে এসেছে আধুনিক ফ্যাশনের শার্ট-ট্রাউজার্স। ধুতি পরিহিত উত্তমের পাশাপাশি সমান জনপ্রিয় হয়েছেন বিদেশি পোশাকের উত্তম। শিক্ষিত বাঙালি যুবক উত্তমের অনুকরণে ভুল উচ্চারণে হলেও ইংরেজি বলা শুরু করলো প্রেমিকার সামনে। দেখতে দেখতে উত্তম হয়ে উঠলেন বাঙালির ‘স্টাইল আইকন’।

‘বসন্ত বিলাপ’-এর সেই অমর হয়ে যাওয়া দৃশ্য মনে আছে নিশ্চয়ই। পুকুর পাড়ে প্রেমিক চিন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় বসেছেন প্রেমিকা জুঁই বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। একটু হাতে হাত, একটু চোখে চোখ রেখে গদগদ চিন্ময় হঠাৎ জুঁইকে বলে ওঠেন, ‘তুমি আমায় একবার উত্তমকুমার বলো!’

চার সাড়ে চার দশক আগে থেকেই নিজেকে উত্তমকুমার ভাবতে থাকা বাঙালির অস্তিত্ব আজও বিলীন হয়নি। পেশির আস্ফালন বা সিক্স প্যাক মানেই তো আর পৌরুষ নয়, বরং ব্যক্তিত্ব আর রসবোধের সংমিশ্রণ আজও বাঙালি নারীকে টানে। আর এখানেই বাঙালির অবচেতনে কাজ করে ‘উত্তম ফ্যাক্টর’। বাঙালি রোম্যান্সে আজও তাই উত্তম অপরাজেয়, কালজয়ী।

ছবি : গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]