বাঙালীর উৎসব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

রিনি বিশ্বাস

এই তো সেদিন, মহালয়ার সুন্দর সকাল;(বয়স যতই বাড়ুক, মন তো এখনও বহু আগেই আটকে, তাই মহালয়ার দিন মানে পুজো এসেই গেল!) মন যারপরনাই ফুরফুরে! কিন্তু তা আর কতক্ষণ!!! কোন কাকভোর থেকে আসা শুরু হয়েছে ‘শুভ মহালয়া’র অজস্র বার্তা! জনে জনে শুভেচ্ছা পাঠিয়ে চলেছেন! ব্যক্তিগত মেসেজ‌ই শুধু নয়, গ্রুপে গ্রুপে‌ও চলছে হুড়মুড়িয়ে মেসেজ আসা!
নয় নয় করে বেশ ক’খান ‘হোয়াটস‌অ্যাপ’ গ্রুপ হয়েছে অধমের! কাজের ফাঁকে সেখানে ইতিউতি ঘোরাফেরা করতে মন্দ লাগে না! কিন্তু এমন বিশেষ বিশেষ দিনে, মনে হয় সব ছেড়ে পালাই! গ্রুপে যদি ষাটজন থেকে থাকেন, তো প্রত্যেকে মোটামুটি ওই একই মেসেজ (বয়ান এবং ছবি কিছু ক্ষেত্রে আলাদা যদিও!) পাঠাতে থাকবেন!! ফোনের গ্যালারিতে তখন পাহাড়প্রমাণ নতুন নতুন ছবি! আর ফোন বাবাজী ‘হ্যাঙ্গিং’, ‘ক্র্যাশ’ করছি করবো অবস্থায়!!!

আসলে ব্যক্তিগতভাবে আমি ‘শুভ মহালয়া’ বলার বিপক্ষে! যতদূর জানি মহালয়া চলে যাওয়া পূর্বসূরীদের মনে করার দিন! যাঁরা চলে গেছেন, যাঁদের আর কখন‌ই দেখতে পাবো না, ছুঁতে পারবো না, একবারও কথা বলতে পারবো না, তাঁদের মনে করার সঙ্গে ‘বিষাদ’ জড়িয়ে থাকে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে! তাই এইদিনে ‘শুভেচ্ছা’ জানানোতে, মন সায় দেয় না! জানি অনেকেই বলবেন, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি তর্পণের দিন তো শুভ‌ই! কেউ হয়ত বলবেন, শুভেচ্ছা জানাতে চাইলে যেকোন দিন‌ই তা জানানো যায়! মহালয়াতে তো অবশ্যই জানানো যেতে পারে! কেউ কেউ আবার সকালে শোনা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সঙ্গে পুজোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক টেনে এনে মহালয়ার ‘শুভ’ হবার প্রমাণ দেবেন!!!
আর আমার মত এক আধজন যদি মহালয়ার সঙ্গে কর্ণের গল্প কিভাবে জড়িয়ে আছে, কিভাবে পূর্বপুরুষদের ‘জল’ দেওয়ার প্রচলন শুরু হলো, মহালয়ার সঙ্গে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র পারতপক্ষে যে কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই, দুর্গা পুজো আসলে যত না শাস্ত্রীয়, তার চেয়ে বেশি লৌকিক, ইত্যাদি প্রভৃতি বলে নিজের কথার স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে, তাদের নানা রকম মন্তব্য শুনতে হবে!

একটা গ্রুপে, ধরা যাক দশজন আছেন! প্রত্যেকে সুশিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত! এঁরা মনে প্রাণে ‘শুভ মহালয়া’র পক্ষে! ওই গ্রুপের‌ই কোন একজন, যে উল্টো কথা বলতে চাইছে , তার পোস্ট করা যেকোন লেখাকে বাকি ন’জন অবলীলায় নস্যাৎ করেন! ভুরি ভুরি যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন এসব আসলে অন্যের মত মানতে না চাওয়া এবং আসলে ‘ট্রোল’!!!

অবাক করা কান্ড ঘটতে তখন‌ও কিঞ্চিৎ বাকি !!! ওই গ্রুপের‌ই আরেকজন(আগের চাপান‌উতোর সে পরে পড়েছে!!) পরদিন রীতিমত শাস্ত্রের উদাহরণ দিয়ে যখন বিপক্ষের সেই সংখ্যালঘু ব্যক্তিকেই ‘ঠিক’ বলে জানায়, তখন কেউ একজন প্রশ্ন তুললেন ‘আত্মা’র অস্তিত্ব না মানলে, দুর্গা পুজোকে নেহাতই লৌকিক বললে, তার তো এতে ‘পার্টিসিপেট’ই করা উচিৎ নয়! সে কেন পুজোয় হ‌ইহুল্লোড় করবে; কেন ফেসবুকে পুজোর দিন ছবি পোস্ট করবে, কেন‌ই বা সিঁদুর খেলবে!! মোদ্দা কথা সে কেন এই আনন্দের ভাগীদার হবে!!!
সত্যিই, এ তো ভেবে দেখার মত‌ই বিষয়!!!
যদিও এর কোনখানে কিসের অসুবিধে, তা সেভাবে স্পষ্ট নয়! আচ্ছা, দুর্গাপুজোকে আমরা উৎসব মনে করতে পারিনা?? তা যদি সকলের উৎসব হয়, ভাষা, ধর্ম সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সবাই মিলে তাহলে আনন্দ আরেকটু বেশি হয় না কী??

রিনুকে তার মা বাবাই সব উৎসবেই আনন্দ করতে শিখিয়েছেন! পুজো, ঈদ, ক্রিসমাস! পুজোর আনন্দ একটু বেশিই, কারণ চার চারটে দিন যে!ছোট থেকে রিনু কোনদিন পুজোয় অঞ্জলি দেয়নি; কোনদিন বিসর্জনের আগে ঠাকুর প্রণাম করতেও যায়নি! কিন্তু এতে তার কোথাও কোন অসুবিধে হয়নি! যাঁরা মন থেকে এগুলো করেন, রিনু তাঁদের কখনও অসম্মান করেনি, করতে শেখেনি! বিয়ের পর প্রথম বছর যখন শাশুড়ি মা ঠাকুরবরণ করতে নিয়ে গেলেন, তখন সে ‘না, যাবো না’ও বলেনি! বরং শাশুড়ি মায়ের বলে দেওয়া এই ‘আচার’ (তিনি এই আচার বাদে আর কিছুই কোনদিন করতে বলেননি!) মেনে চলতে তার কোন সমস্যাও হয়নি! বিশ্বাস বড় ব্যক্তিগত বিষয়! তবে রিনু বিশ্বাস করে, অন্ধ বিশ্বাস কখনও কখনও আমাদের ক্ষতি করে! তাই একটু সচেতন হ‌ওয়া প্রয়োজন!

পুজো এসেই গেল! যে যার মত করে যেন আনন্দ করতে পারে; উৎসব যে আসলে সবার, এটুকু মনে রাখলেই সবটা সুন্দর হতে পারে; এটুকুই যেন মনে রাখতে পারি;
সকলের জন্য ‘শারদীয়ার শুভেচ্ছা’…

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]