বাঙালী ভদ্রতা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

বাসে উঠতে হয় হরহামেশা, নিজের যেহেতু গাড়ি নেই। বাসে চড়ে যাতায়াত করতে আমার ভালোই লাগে। আশা একটাই, প্রচন্ড ভীড়ের চাপে আমার ভূড়িটা যদি একটু কমে! কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার চাপটা বেশি খাই পায়ের উপর। পায়ের উপর পা দিয়ে মাড়িয়ে যাওয়া এমন স্বাভাবিক ঘটনা যে এই নিয়ে কিছু বলতে গেলে উল্টো আমাকে কথা শুনতে হয়। বাঙালী  রীতিনীতির বাইরে তো আমি যেতে পারিনা। রাস্তায় চলতে গেলে অবশ্যই আপনাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে, যেমন লোকাল বাসে উঠে ভাড়া নিয়ে ক্যাচাল। ঢাকা শহরের এমন কোন লোকাল বাস পাওয়া যাবেনা যেটায় ভাড়া দেয়া নিয়ে গোলমাল না হয়। আমি একবার উত্তরার দিকে যাচ্ছিলাম। তো যা হয় আর কি, মাত্র এক টাকার জন্য বাসের কন্ডাক্টরের সাথে এক যাত্রীর তুমুল ঝগড়া বেধে গেল। কথায় কথায় যাত্রী শেষমেশ বলেই বসল সেই বহুবার শোনা কথা, ‘ঐ ব্যাটা, তুই আমারে চিনস?’ কন্ডাক্টর বিন্দুমাত্র বিচলিত  না হয়ে ঠান্ডা মাথায় জবাব দিল,’আপনে যদি চিননের মত মানুষ হইবেন তাইলে তো প্রাইভেট কার-এ পতাকা লাগাইয়া ঘুরতেন, লোকাল বাসে মরতে আইসেন কের ল্যাইগগা?? উচিৎ জবাব, এর পরে আর কথা চলেনা। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাসে মূলত নির্দিষ্ট কয়েক রকম মানুষের যাতায়াত বেশি। এক. প্রতিবাদী  হিরো- বাস কোথাও দাড়ালেই সবার আগে গর্জে উঠবে এই লোক। যদিও তার কথায় ড্রাইভার  সামান্যতম পাত্তা দেয়না, কিন্তু তাতে কি? প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর তার গর্জন শোনা যাবে। দুই. চাইনিজ মোবাইল  ফোনের মালিক- এরা বাসে উঠেই সবার আগে যে কাজটা করে তা হলো জোরে জোরে গান বাজানো। প্রচন্ড জ্যামের মধ্যে গরমে দরদর করে ঘামতে থাকা মানুষজনকে আনন্দ(?) দেয়ার মহান উদ্দেশ্য দেয়াই এদের প্রধান কাজ। আর যদি কেউ ফোন করেই বসে, তো এত জোরে জোরে কথা বলে যে আশে পাশের বাস থেকেও শোনা যায়। তিন. প্রেমিক হৃদয়- এরা কোন সুন্দরী তরুণী দেখলেই সাথে সাথে সীট ছেড়ে ঠিক সীটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু অন্য কোন বয়স্ক বা অসুস্থ লোক থাকলেও সীট ছেড়ে দেয়া দূরে থাক, পাশে দাঁড়ালেই  বিরক্ত হয়। চার. বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ – পেশায় যে যেরকম কাজই করুক না কেন,বাসে বা ট্রেনে 0615pod04উঠার সাথে সাথে এদের মূল পরিচয় হয়ে যায় একেকজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। সরকারের কি করা উচিৎ আর কি উচিৎ না, সেটা সরকারের চেয়ে এরাই ভালো বোঝে। মাঝে মাঝে তর্ক বিতর্কের মাত্রা ঝগড়ায় পরিনত হয়, কিন্তু তাতে কি এসে যায়? তবে বাসে পরিবেশ রক্ষায় নারীদের অবদান কোন অংশে কম নয়। প্রায়ই জানালার পাশের সীটগুলোতে বমির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। একদিন দেখলাম একটা বাইশ তেইশ বছরের ছেলে ভীড় বাসে বসে মনের সুখে লিচু খাচ্ছে আর খোসাগুলো ফেলছে পায়ের সামনেই। সোজা কথা আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন পাবলিক বাসে। এই সব নিয়মের বাইরে যে যাবে তার বাসে ওঠারই যোগ্যতা নেই। অবশ্য যোগ্যতার প্রশ্ন যখন উঠলোই তখন এটাও জানিয়ে রাখা ভালো, আপনি রাস্তায় মার্সিডিজ গাড়ি চালান অথবা টাটা ন্যানো, বাসের কন্ডাক্টরের কাছে ঐ গাড়ি সব সময়ই ‘প্লাস্টিক’!!! ‘ওস্তাদ, ডাইনে প্লাস্টিক!!! তবে এখন লোকজন আমাকে চেনে জানে তাই বাস ছেড়ে প্লেনে ওঠার সৌভাগ্যও হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি প্লেনে চড়েও আমি কনফিউজড  হয়ে যাই আদৌ কি প্লেনে যাচ্ছি না বাসে? একবার দেশে ফিরছিলাম সকালের প্লেনে। কলকাতা থেকে ঢাকা আসতে আধঘন্টার মত লাগে। এই অল্প সময়ে কিইবা আর খেতে দেবে? হাল্কা একটু নাশতা! কিন্তু না, খাবারের প্যাকেট পুরোপুরি খোলা হয়নি তার আগেই পেছনের দিক থেকে আওয়াজ এলো, ‘ম্যাডাম, সকালে হোটেল থেকে সরাসরি এয়ারপোর্টে চইল্যা আইসি তো, ঠিকমত খাইতে পারি নাই।আপনেগো খাওনডা কি আরেকটু বাড়াইয়া দেওন যায়?? টাকা পয়সা লাগলে বইলেন’……এই কথা শোনার পরে আমার গলায় আটকে যাওয়া খাবার যখন পেটে নামার মত অবস্থা হলো, ততক্ষনে আমি ঢাকার আকাশে পৌছে গেছি। মনটা হঠাৎ করেই উদাসী হয়ে গেল, ভাবলাম কিছুক্ষণ পর তো বাড়িতে যেয়েই খেতে পারব। প্যাকেটের বাকী খাবারগুলো আর খাওয়া হলো না। এদিকে একেবারে পেছনের দিকে কতগুলো ছেলে প্লেনের দেয়াল আর সীটকে তবলা বানিয়ে জোরে জোরে গান গাইছে। ওরাও মনে হয়ে প্লেনটাকে বাস ভেবে ভূল করছিল।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]