বাড়ছে সৌখিন হ্যাকার!

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা দ্রুত বেড়ে চলেছে, সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধপ্রবণতাও। সাম্প্রতিককালে হ্যাকারদের উৎপাতে ইন্টারনেট ব্যবহারে সবারই ভীতি বেড়েছে। ঘটেছে বেশ কিছু ছোট বড় হ্যাকিং এর ঘটনা। কিছুদিন আগে হ্যাকড হয়েছে  সোনালি ব্যাংক, ইয়াহুর এক বিলিয়ন অ্যাকাউন্ট, গুগলের ১০ লাখ জিমেইল  অ্যাকাউন্ট এবং গুগল কম বিডি। সাইবার ক্রাইমের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি  অফিস, সেলিব্রিটি, যে কেউই সাইবার হ্যাকিং-এর শিকার হচ্ছেন। সাধারণত পাঁচটি দেশে এই ধরনের পেশাদার সাইবার দুর্বৃত্তদের কার্যক্রম বেশি দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে চীন, আইভরি কোস্ট, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এছাড়া সৌখিন হ্যাকার হিসাবে ভারত, পাকিস্তানি, বাংলাদেশের নাম বেশ পরিচিত। সৌখিন হ্যাকারদের হ্যাকিং শুরুটা হয় ফেসবুক, ইয়াহু অথবা জিমেইল একাউন্ট হ্যাকিং দিয়ে। তবে ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করা আজ কাল বেশ কঠিন হয়ে গেছে ফেসবুক পরিচালকদের তৎপরতায়। তারা প্রতিনিয়ত এন্টি হ্যাকিং স্ক্রিপ্ট আপডেট করছে। তবুও বসে নেই হ্যাকাররা! আছে আরো নানান পথ। আর এভাবে একজন সৌখিন হ্যাকার সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠে প্রোফেসনাল হ্যাকার। আমাদের দেশে আর একটি প্রচলিত কথা কম খরচে ওয়েবসাইট তৈরি করা যার,কিন্তু  নিরাপত্তা নামক শব্দটি নিয়া চিন্তা নাই। এবং আর একটি বড় কথা আমরা প্রায় সবাই বিভিন্ন সাইটের অনিরাপদ লগইন করি আর একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করি। ফ্রি এবং ফেক মোবাইল আ্যাপও হ্যাকিং এর কাজে আসছে। এগুলো ফোনের কনফিডেনটিয়াল ইনফরমেশন হ্যাক করে । তাছাড়াও ফোনের সিকিউরিটি সেটিংস বাইপাস করে হ্যাকিং এর দিকে নিয়ে যেতে পারে। যেমন – কোনো গেম এর ফ্রি ভার্সন খেলার জন্য সবকিছুতে “yes” দিয়ে নিজের গোপন ইনফো গুলো তাদের হাতে তুলে দিচ্ছো।তাই,ওয়েবসাইট থেকে  আ্যাপ ডাউনলোড করা যাবে না। PlayStore বা Apple’s app store ব্যবহার করতে হবে। যে সকল রাউটার এখনও WEP (Wired Equivalent Privacy) এনক্রিপশনের উপর নির্ভর করে সেগুলো খুব সহজেই হ্যাক করা যায় এক ধরনের সফটওয়্যার প্রোগ্রাম দিয়ে যা যে কেউ ডাউনলোড করতে পারে।  এতে হ্যাকারদের কাজ আরও সহজ হয়ে যায়। ওয়াইফাই সারাদিন অন করে ডিভাইস গুলো কানেক্ট করে রাখা এখন সবার অভ্যাস। কিন্তু,বাসা থেকে বের হলে ডিভাইস গুলোর হটস্পট অফ করে বের হতে হবে। অন্যথায় সেগুলো হ্যাকারদের সেট আপ করা নেটওয়ার্ক এ কানেক্ট করে গোপন ইনফো গুলো হ্যাকড করবে। বিভিন্ন ফেক সাইট রয়েছে যাদের URL সামান্য ভিন্ন, যেমন -facebo0k.com এগুলি আসলে ডিজাইন করাই হয় ডেটা হ্যাক বা malware install করার জন্য। সাইট এর address সবসময় recheck করতে হবে log in এর আগে। বিশেষ করে যখন home page অন্যরকম দেখায়। তাছাড়া ক্রেডিট কার্ড ইনফো দেবার আগে http address চেক করতে হবে। এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগের সাইট গুলো নয় ওয়াইফাই , স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, এটিএম বুথ,  বিমানবন্দর বা রেলস্টেশন, এমনকি, গ্যাস স্টেশনেও নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় ওয়েবক্যাম অথবা মোবাইলের সেলফি ক্যামেরাও। hackers-type
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি সূত্রে জানা যায়, আইসিটি আইন সংশোধন হওয়ার পর ২০১৩ সালে ৩৫টি, ২০১৪ সালে ৬৫টি এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১০০টির বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আইসিটি আইনে ৬২টি এবং পর্নোগ্রাফি আইনে ৩১টি মামলা করা হয়। এ পর্যন্ত ৪২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে ‘সাইবার নিরাপদ হেলপ ডেস্ক’ চালুর পর ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত ১৩ মাসে ১০ হাজার ২৬১টি অপরাধের ঘটনায় তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছে ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে ফেসবুক অপরাধ ৪০ শতাংশ, অনলাইন ৭ শতাংশ, পর্নোগ্রাফি ৫ শতাংশ, ক্রেডিট কার্ড ৫ শতাংশ, রাজনৈতিক ৪ শতাংশ, মোবাইল ব্যাংকিং ৫ শতাংশ এবং ই-মেইলসংক্রান্ত অপরাধ ১০ শতাংশ (১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫, দৈনিক আমাদের সময়)। এ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অপরাধের মাত্রা কিছুটা অনুমান করা গেলেও বিভিন্ন কারণে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত হয় না। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো অনেকেই অপরাধের শিকার হয়েও মানমর্যাদার ভয়ে তা গোপন রাখছে। অভিযোগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত সাইবার ক্রাইম ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আইনের ব্যবহারের উদ্যোগ থাকলেও দেশের কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আপডেট পরিসংখ্যান নেই। অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষিত-দক্ষ জনবল ও সচেতনতার অভাবেই সাইবার ক্রাইমের প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বিচার না হওয়া, আইনের সীমাবদ্ধতা, আইন ও অপরাধ সম্পর্কে অজ্ঞতাও সাইবার ক্রাইমের মূল কারণ বলে মনে হয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, সরকারের ‘সাইবার সিকিউরিটি ফোর্স’ নামে একটি বিভাগ রয়েছে। সেখানে যে কেউ সাইবার অপরাধসংক্রান্ত আভিযোগ করতে পারবে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। প্রকৃতপক্ষেই এ অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, এ কথাটি না বললেই নয় যে সাইবার ক্রাইম আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় এ অপরাধী চক্র প্রতিনিয়ত নানা ভয়ংকর অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যথেষ্ট ধারণা না থাকায় এ অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে সাইবার অপরাধীদের যথাযথভাবে জানা থাকলে তারাও এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠার সাহস পেত না। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও অধিকতর উদ্যোগ গ্রহণ করে সাইবার নিরাপত্তা আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগে অপরাধীদের শাস্তি প্রদান ও গণমাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করলে এ-সংক্রান্ত অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব।

নিমো ব্লু
তথ্য ও ছবিঃ ইন্টারনেট