বাতাসে পূজার গন্ধ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

(কানাডা থেকে): ক’দিন বাদে শারদীয় দূর্গাপূজা। পূজা আসছে।চারিদিকে তার গন্ধ, কেমন উৎসব উৎসব আমেজ। মনে পড়ে, ছেলেবেলায় পূজায় আমাদের কত আনন্দ ছিলো। ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে উৎসব আনন্দে মেতে উঠতাম। হিন্দু মুসলিম কোন ভেদাভেদ ছিলো না। উৎসবটা ছিলো সবার, ঈদ পূজার আনন্দটা ভাগাভাগি করে নিতাম আমরা।এখনো আমাদের বন্ধুদের মাঝে সেই সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রয়েছে।

পূজা এলেই আমাদের ছোট শহর নারায়নগঞ্জের পাড়া মহল্লায়, মন্দিরে মন্দিরে সাজ সাজ রব পড়ে যেতো। প্রতিবেশী বাড়িতে বাড়িতে দজভুজা দেবীর আরাধনার প্রস্তুতি চলতো। মন্দিরে মন্দিরে হতো প্রতিমা তৈরির কাজ। আমরা ছোটরা আগ্রহ নিয়ে দলবেধে মন্ডপে দেখতে যেতাম যে, কাদের তৈরী প্রতিমা সবচেয়ে ভাল হচ্ছে। এখন জানি না,সেই আগ্রহ কারো মাঝে আছে কি না।

 খুব ভোরে সুভাষ,বাবুল,মলয়ের সঙ্গে শিউলীফুল কুড়াতে যেতাম। আমরা কোন গাছতলায় যাবার আগেই দেখতাম পাড়ার অর্চনাদি, রত্নাদি, কাকীমা,মাসিমারা পৌছে গেছেন। তাদের কারনে সুভাষ,মলয়রা মন খারাপ করে অল্পকিছু ফুল কুড়িয়ে নিতো। দূর্গাপূজার শুরুটা হতো পূজার ষষ্ঠীতে। প্রতিমা তৈরীর পর বলা হয়, ষষ্ঠীতেই দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। এদিন মন্ডপগুলোর চুড়ান্ত সাজসজ্জা, আলোক বিন্যাস করা হতো। বিকেল হলেই আমার সনাতনধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সঙ্গে দলবেধে ছুটতাম আমলাপাড়া, উকিলপাড়া,পুরান পালপাড়া,নন্দীপাড়া, দেওভোগ, নয়ামাটি, টানবাজার সার্বজনীন শারদীয় দূর্গাপূজার মন্ডপগুলো ঘুরতে।কখনো সখনো নদীর ওপাড়ে বন্দরও যাওয়া হতো। তবে ষষ্ঠী পূজা, অর্থাৎ বোধনের দিন থেকেই পূজা শুরু হলেও পূজার আসল আমেজ মানে ভিড় শুরু হতো সপ্তমী থেকে। সেই সময় স্কুল ছুটি থাকায় বাড়িতে পড়ার চাপ থাকতো না বলে উৎসব আনন্দে মেতে থাকার জন্য আমাদের ছিলো অবারিত স্বাধীনতা।

বাড়িতে কখনোই হিন্দুদের পূজা শব্দটি শুনিনি। সামাজিক উৎসব হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।বাড়ির অন্দরমহলে বড়ভাইয়ের বন্ধু রিপন‘দা, গুপি‘দা,মাধবদা’দের ছিলো অবাধ আনাগোনা।আমার বন্ধুরাও অনেকেই আমাদের ঈদ উৎসবেও আসতো। একসঙ্গে বসে ঈদের সেমাই, পোলাও, মাংস খাওয়া হতো। তেমনি আমিও লিটনদের বাসায় কিংবা তরুন,বিকাশ,সুকেশ,বলাই,নির্মল‘দা,অনিল‘দা, পরিতোষ‘দের সঙ্গে তাদের বাসায় পুজার তিনদিন ভরপেট খেতাম। লক্ষীপুজার মুড়ি ও চিড়ার মোয়া, নারকেলের নাড়ু, গুড়ের সন্দেশ, মিস্টি কত কিছু যে বন্ধুর মা’, আমাদের মাসীমা, কাকীমারা থালা ভরে সাজিয়ে পাঠাতেন।সেইসব খাবারের মধ্যে আমার মা আমিত্তি, গুড়ের সন্দেশটা খুব পছন্দ করতেন। আমার চিড়ের মোয়া, গুড়ের সন্দেশ ছিলো প্রিয়।

 সপ্তমীর দিন খুব একটা ঘোরাঘুরি না হলেও অস্টমীর দিন থেকে সাত সন্ধ্যায় নতুন কাপড় পড়ে বাবুল, রিপন,সুমনদের সঙ্গে মন্ডপে মন্ডপে লাইটিং,তোরন, প্রতিমা দেখতে বের হতাম। হাটতে হাটতে আমাদের পা ব্যথা হলেও ঘোরার আনন্দের কমতি ছিলো না। বাসায় ফেরার পথে প্রায়ই সোনাই ঘোষের পরোটা, ভাজি, মিস্টি খেয়ে ফিরতাম।

মহাষ্টমীর দিন কুমারী পূজা দেখার জন্য সকাল থেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে জড়ো হতাম। আহা আমাদের কি সব দিন ছিলো! চারদিনের পূজা শেষে দশমীতে হতো দেবীর বিসর্জন। দশমীর সকাল থেকেই বন্ধুদের দেখতাম কেমন মন খারাপ করা বিষাদ ও আনন্দের অনুভূতি নিয়ে চুপচাপ থাকতো । একটুবেলা হলে মন্ডপগুলোতে আমরা যেতাম ঢাকঢোলের তালে সিঁদুর খেলা দেখতে।,কখনো কখনো সিদুরের লাল রঙ মেখে কিম্ভুত কিমাকার হতাম। সেই রঙ তুলতে জান যাবার জোগাড় হতো। দুপুরে খেয়ে দেয়ে শীতলক্ষ্যা নদীরপাড়ে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে অপেক্ষায় থাকতাম দেবী বিসর্জন দেখার জন্য। আমার বন্ধুরা শীতলক্ষ্যানদীর পাঁচ নাম্বার ঘাটে আসদো ট্রাকে ঢাকঢোল বাঁজিয়ে প্রতিমা নিয়ে। ঢাকের বাজনা ও আরতির মূর্চ্ছনায় দেবী বিসর্জন দেয়া শেষে আমরা একসঙ্গে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন বন্ধুদের ভারাক্রান্ত মন আমাকেও ছুয়েঁ যেতো। জানি না এখনকার সময়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এরকম আত্মীক সম্পর্ক, সম্প্রীতির বন্ধন কতটুকু।

 যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ সম্প্রীতির সৌহার্দ্য আমাদের সময়কে, আমাদের সমাজকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বন্ধনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]