বাবাকে নিয়ে …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

(মন্ট্রিয়েল থেকে): ঠিক এক বছর আগে বাবা ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মনে পড়ে, মন্ট্রিয়েলের সেদিনের সন্ধ্যাটা আমার জন্য ছিলো একটু অন্যরকমই ।মাস পহেলা ডাউনটাউনে নিজের নতুন বাসায় উঠবো বলে অ্যাক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো। বিকেলে ডলারামা হতে ব্যাচেলার সংসারের জন্য কত কিছু যে কিনেছি, এখন কিছুই মনে নেই! নতুন অ্যাপার্টমেন্টের আসবাবপত্র গুছিয়ে ক্লান্ত হয়ে এভিনিউ কার্বসের বাসায় ফেরার পথে ট্যাবে দেখছি দেশ হতে পাঠানো অনেকের ম্যাসেজ। একটা মেসেজ ছিল বড়ভাইয়ের। ‘বাবা হাসপাতালে ভর্তি’ মেসেজ পড়ে মুহুর্তেই ভীষন মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।সে সময় নানান দু:শ্চিন্তা ভর করতেই আমার প্রেশার লো হয়ে যায়। এর আগে দুইদিন দেশে ফোন দিতে পারিনি।
জানি না এ অবস্থায় পার্ক এক্সটেনশন কিভাবে এসেছি।ড্রাইভ করতে করতে জুয়েল ভাই লক্ষ্য করছিলেন আমি কেমন ঘেমে উঠেছি।
– ভাই, একটা গরম কফি খাবেন টিম হর্টনে? ভাল লাগবে।
আমি চুপচাপ। ইশারায় জানিয়ে দেই এখন কিছু ভাল লাগবে না।বরং আমাকে বাসায় নামিয়ে দিন।
বাসায় ফিরে দেশে যোগাযোগ হলে জানতে পারি বাবাকে কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, সোমবার রাতে।দু’বছর আগে ব্রেন স্টোক হবার পর হতেই চোখের সামনেই আমার বাবা কেমন বদলে গিয়েছিলেন। যে মানুষটি সামাজিক কর্মকান্ডে সারাক্ষন ব্যস্ত থাকতেন, খেলাধুলা পাগল মানুষ ছিলেন, সেই মানুষটি রাতারাতি চলৎশক্তিহীন হয়ে গৃহবন্ধি হয়ে পড়লেন। চিকিৎসা ও মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সেবা শুশ্মাষায় কিছুটা সুস্থ হলেও দিন দিন বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন।
বাবা বাসায় কারো কথা গুরুত্ব না দিলেও আমার কথা শুনতেন।এসময় আটাত্তর বছর বয়সে বাবা যেন অনেকটাই শিশুদের মতন আচরন করা শুরু করলো! প্রায় সময় খাওয়া দাওয়া অনিয়ম করলে খাওয়াতে না পেরে মা রাগ করতেন।তখন মা আমার কথা বলে খাওয়ান।কখনো বলেন, রনি ফোন করে জিগেস করছে আব্বা খেয়েছে কিনা। তুমি না খেলে ও আর ফোন করবে না বলেছে।এ কথা শুনে নাকি বাবা খাবার খেয়ে নিতেন।
জানি না বাবা কি সত্যি বিশ্বাস করতেন আমি ফোন করবো না?
কার্বসের বাসায় পুরো সন্ধ্যাটা শুয়ে বারবার মনে মনে বলেছি, ‘ বাবা তুমি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে এসো।আমি ফোন করে কথা বলবো।অনেক কথা জমে আছে।’
সে সময় বাবার অসুস্থতায় তার পাশে থাকতে না পারায় অনাবাসী একজন সন্তানের কষ্ট সহজে কেউ বুঝবে না।
বাবা ঠিকই এক সাপ্তাহ পর বাসায় ফিরেছিলেন। আরো দুর্বল হয়ে। তার পাচমাস পর চলেও গেলেন না ফেরার দেশে। তখনও শেষ দেখাটা দেখতে না পারার কষ্ট আমাকে বাকী জীবনটুকু বয়ে বেড়াতে হবে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]