বাবা-মা-আমি আর একখানা বই

তপতী বসু

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

একাত্তরের আগে ১৯৬৯বা’৭০৷

নভেম্বর বা ডিসেম্বরও হতে পারে,তবে স্কুলে যে তখন ভর্তি হইনি এটা নিশ্চিত৷অঘ্রানে শীত এসে গেছে আমাদের উঠোনে৷সেইসঙ্গে বাঁশ আর কচা গাছের বেড়ার গা বেয়ে অজস্র জার্মানি লতার সাদা সাদা ফুল।যেনো ফুলকপি—আমাদের খেলাঘরের রান্নার৷বাবার আসতে মাঝে মাঝে বেলা গড়িয়ে যেতো৷ আমগাছের ছায়া ছোটো দিন আরো তাড়াতাড়ি ছোটো করে দিতো৷এমন একদিন সাইকেল থেকে নেমে বাবা হাতে দিয়েছিলেন একখানা বই ‘সবুজ সাথী-প্রথম ভাগ’৷ স্কুলে যাবার সময় হয়ে এসেছে যে!সঙ্গে সবুজ রঙএর ফ্লানেলের ফুল হাতা ফ্রক৷শীতের বেলাও তো এসে গেছে৷আদর্শলিপি,বর্নপরিচয় প্রথমভাগ,দ্বিতীয়ভাগ …সব কিছু আগের থেকে পড়া ,তাই সাদা পাতার লাল-সবুজে ছবি আর লেখায় ছাপানো বইটি মুখস্থ করতে কখনও কারো সাহায্য লাগলো না৷প্রথম থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত এতবার পড়েছিলাম যে,আজও অনেক কিছু মুখস্থ-যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বালিকা বয়সের অবুঝ আনন্দ৷

জুলেখা বাদশার মেয়ে….পড়বার সময় রাজা বা বাদশা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিলোনা!ভাবতাম জুলেখা আমার মতন একটি মেয়ে আর তার বাবার নাম বাদশা!১থেকে১০পর্যন্ত সংখ্যা শেখানোর জন্যে ছিলো পিঁপড়ে! পিঁপড়া কয়টি ডিম…৷বাড়িতে অজস্র কাঠ পিঁপড়ে,লাল-কালো,চিনির কৌটার গন্ধ পিঁপড়ে,গাছের লাইসো পিঁপড়ের ছড়াছড়ি…৷মিলিয়ে পড়তাম,অবাক হতাম একে শূন্য দশটি বউ এর বেলায়৷পিঁপড়েদের দশটি বউ!!!!

প্রতিটা গল্প আর কবিতা আজও মুখস্থ৷পঁচিশ বছর আগে ছোটো শিশু পুত্রকে ঘুম পাড়ানোর সময় বলতাম ‘মাঠ ভরা সোনার ধান,ধান খেতের ভিতর সারস পাখির বাসা’র গল্পটি৷আমার কাছে ঐ পৃষ্ঠাটি আজও অবাক করে৷কী অসাধারণ উপদেশময় ইঙ্গিত…!নিজের কাজ নিজে না দেখে অন্যের উপর নির্ভর করা উচিৎ নয়…যা কখনও জীবনের সঙ্গে মিলে যায়৷

যখন পড়তাম,তখনতো এসব বুঝতাম না—তবু আজও মনের কোণে ঐ বইখানার ছবি খুব স্পষ্ট৷কিছু দিন পরেই একাত্তরের যুদ্ধ শুরু হয়৷কোনো কিছুই আর আগের মতন থাকেনা৷

বাবার পক্ষ থেকে ঐ বই আর জামা ছিলো আমার জন্যে প্রথম এবং শেষ উপহার ৷ একাত্তরে বাবা মারা যাবার পরে মা অনেক দিন যত্ন করে রেখেছিলেন জামাটা৷ চৈত্র মাসে রোদে দিতেন-আস্তে আস্তে ছোটো হয়ে গেলো৷বই এর শেষ তাকে ‘সুবুজ সাথী’অন্য বই এর ভিড়ে ক্রমাগত পিছনে সরে যেতে যেতে হারিয়ে গেলো৷মাও চলে গেছেন৷

‘সবুজ সাথী’ শব্দ মনে আসলে আমার সেই বিকেলের স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাবা-মা-আমি আর একখানা বই!

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box