বারবিজন হোটেলের মেয়েরা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিলভিয়া প্লাথ

হোটেলটি তৈরি হয়েছিলো ১৯২৮ সালে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের ৬৩ নম্বর রাস্তায় ১৪০ নম্বর বাড়িটি ছিলো হোটেলের ঠিকানা। বিশাল উঁচু ভবনের তেইশ তলায় ২৭০টি কক্ষ। কে থাকেননি সেই হোটেলে, হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী গ্রেস কেলী, কবি সিলভিয়া প্লাথ, সাংবাদিক ও লেখক জোয়ান দিদিয়ন! তবে বারবিজন হোটেলওয়ালাদের শর্ত ছিলো একটাই, হোটেলের সব অতিথিকে অবশ্যই নারী হতে হবে, পুরুষের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কলেজ পালানো ধনী পরিবারের কন্যা, লেখক হতে চাওয়া কোনো নারী, নিউইয়র্ক শহরে কাজ খুঁজছেন এমন কেউ অথবা অভিনয় করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে আসা মেয়েদের ভিড় লেগে থাকতো একদা এই হোটেলে। গ্রেস কেলী অভিনেত্রী হওয়ার আগে বহুদিন কাটিয়েছেন এই হোটেলের ঘরে। শোনা যায়, একবার তিনি অর্ধনগ্ন হয়ে এই হোটেলের হল ঘরে নেচেছিলেন। বারবিজন হোটেলে তিনি ঘর নিয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে। নিউইয়র্কের ‘মাদমোয়াজেল’ পত্রিকায় অতিথি সম্পাদক হিসেবে কাজ করার জন্য স্কলাশিপ পেয়েছিলেন এই কবি। সেই হোটেলবাসের সময়েই  তিনি  আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘বেলজার’-এর একটি অংশ লিখেছিলেন।

গ্রেস কেলী নিউইয়র্কে এসেছিলেন ‘আমেরিকান একাডেমী অফ ড্রামাটিক আর্টস’-এ অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করতে। তার এক চাচা তখন ওই শহরে নাটকের চিত্রনাট্য লিখতেন।

হোটেলে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও তখন আশপাশের কফিশপে তাদের কফির কাপ সামনে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যেতো।তাদের উদ্দেশ্যই ছিলো হোটেল থেকে বের হয়ে আসা সুন্দরী নারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। বিখ্যাত নাট্যকার উউজিন ও’নিলের কন্যা ওনা ও’নিল একদা এই হোটেলের বসিন্দা ছিলেন। তার প্রেমিক তখনকার সময়ে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক জে.ডে স্লিংগারকেও ওই হোটেলের উল্টোদিকে কফির দোকানে দেখা যেতো।

এই হোটেলের গল্প নিয়ে পলিনা বেরেন নামে মার্কিন লেখিকা ‘দ্য বারবিজন: দ্য হোটেল সেটস ওম্যান ফ্রি’ নামে একটি বই লিখেছেন। একটি সময়ে আমেরিকার সমাজে একা এবং স্বতন্ত্র নারীদের জীবনের বিচিত্র এক অধ্যায় এই বইতে নিঃশ্বাস ফেলেছে।

গ্রেস কেলী

সিলভিয়া প্লাথের নিউইয়র্ক বসবাসের সময়টা খুব আনন্দময় ছিলো না। তাঁর কাছে হোটেলটা ছিলো মেয়েদের হোস্টেলের মতো। বেরিভাগ সময় খাবারের কারণে পেটের পীড়ায় ভুগতেন তখন প্লাথ। হোটেলের থাকার সময়টাকে তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আখ্যা দিয়েছেন যন্ত্রণা, পার্টি আর কাজের সময় হিসেবে। পরে ভাইকে চিঠিতে নিউইয়র্ক শহরে বসবাসের ইতিকথা লিখতে গিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহননের পথ বেছে নেয়া এই কবি লিখেছেন , বারবিজন হোটেলে থাকার সময়ে পৃথিবীর আরেকটি রূপ তার সামনে উন্মোচিত হয়েছিলো। আর তার মনে হয়েছিলো অনুভূতির চোখ তরমুজের মতো ফেটে যাচ্ছে।

হোটেল থেকে এই নারীদের বের হওয়া এবং ঢোকার সময় খাতায় সই করে যাওয়ার নিয়ম ছিলো। পুরুষের প্রবেশ নিষেধ জানাতে লবিতে সবসময় উপস্থিত থাকতো বিশালদেহী পাহারাদার অস্কার। হোটেলে আবাসিক অতিথিদের জন্য ছিলো জিমনেশিয়াম, হলরুম আর স্টুডিও।ছিলো না মদ্যপানের কোনো আলাদা জায়গা। কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ বিনা পয়সায় তার আবাসিক অতিথিদের চা খাওয়াতো। তখনকার দিনে হোটেলের রুম ভাড়া ছিলো সপ্তাহে ১৮ ডলার। মডেলিংয়ে আগ্রহী বহু নারী তখন হোটেলে ঘর নিয়ে দিনের পর দিন থাকতো। গত শতাব্দীতে আমেরিকায় নারীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর জীবন যাপনের নানান ছবি ফুটে উঠেছে এই বইতে।

এই হোটেলটি উঠে গিয়ে এখন ওখানে কয়েকটি আধুনিক জিমনেশিয়াম ঠাঁই করে নিয়েছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ নিউ ইয়র্ক টাইমস, লিটারেরি ম্যানহাটন

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box